তিন কারণে আমি খুব সন্তুষ্ট

সিরাজুল ইসলাম। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অনেক পরিচয়। শিক্ষক, লেখক, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মী। তার এই জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ ও আখলাকুজ্জামান অনিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে ভর্তি হলেন কেন?
সাহিত্য পড়ব— এতে আমার আগ্রহ ছিল শুরু থেকেই। অল্পসল্প লিখতাম। তাই ’৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই এই অনুভূতি হচ্ছিল, সাহিত্য নিয়ে পড়ব। কিন্তু বাবা চেয়েছিলেন, অর্থনীতি পড়ি। পড়াশোনার তখন মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল চাকরি পাওয়া। এখনো তাই। চাকরির জন্য তখন সিএসএস পরীক্ষা দিতে হতো। এ পরীক্ষার জন্য অর্থনীতি পড়লে সুবিধা হবে। কাজেই বাবা মনে করলেন, আমি অর্থনীতি পড়ি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আকর্ষণ অর্থনীতি। যারা এ বিষয়ে ভর্তি হবে, তারা অঙ্কে পারদর্শী। পরিসংখ্যান, গণিত তাদের জন্য সমস্যা হবে না। কিন্তু আমি তো পারব না। আব্বাকে বললাম, অর্থনীতি পড়ব না। বাবার সঙ্গে আমার ওই প্রথম দ্বন্দ্ব। তিনি বললেন, তাহলে তুমি কী পড়বে? বললাম, সাহিত্য পড়ব। বলতে পারলাম না, বাংলা সাহিত্য পড়ব। কেননা তাহলে বলতেন, বাংলা তো তুমি ঘরেই পড়ে নিতে পারো। বললেন, ঠিক আছে, তাহলে তুমি ইংরেজি পড়ো। ইংরেজি সম্পর্কে তার ধারণা, এটা সিএসএসের জন্য ভালো। সাবসিডিয়ারি পলিটিকস আর ইকোনমিকস পড়তে বলতেন। ওই একই উদ্দেশে, এগুলো পড়লে সিএসএস পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত হতে পারবে। বন্ধুরা যারা একসঙ্গে পাস করে ইউনিভার্সিটিতে চাকরি নিয়েছি পরে, তারা অধিকাংশই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জীবনকে একটা প্রস্তুতির সময় মনে করত। তারা প্রস্তুত হতো সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার জন্য এবং অধিকাংশই পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করে চলে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বছর। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল। ডাকসুর প্রতিটি হলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতো। এগুলোর বার্ষিক নির্বাচন হতো। ছাত্র সংসদগুলো সংস্কৃতি-সাহিত্যচর্চার জন্য, রাজনীতির জন্য খুব বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন হলো সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। আমি ওর মধ্যে ঢুকে গেছি। নিয়ম ছিল, ফার্স্ট ইয়ারে যারা আসবে, তারা হবে সদস্য। ভিপি, জিএস হবেন আরও ওপরের ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা। যুক্তফ্রন্ট হলো মুসলিম লীগবিরোধী। ছাত্রলীগ আছে আর ছাত্র ইউনিয়ন তখন সবেমাত্র গঠিত হয়েছে। ছাত্রলীগ পুরনো প্রতিষ্ঠান। আরেকটি নিয়ম ছিল, ভালো রেজাল্ট না করলে নির্বাচিত হতে পারবে না। আমি ভালো রেজাল্ট করে এসেছিলাম। আইএ পরীক্ষাতে নবম হয়েছিলাম। কাজেই একজন ভালো ছাত্র হিসেবে গণ্য হলাম। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে সলিমুল্লাহ হলের সদস্য হলাম।
ছাত্রজীবন কেমন কেটেছে?
খুবই মজার কেটেছে। আমরা যে হল ছাত্র সংসদে ঢুকলাম, সেখান থেকে বার্ষিকী বেরোত। সেটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছি। রেডিও অফিস ছিল পাশেই, নাজিমুদ্দিন রোডে। রেডিওতে প্রোগ্রাম করি। পড়াশোনা করি। লাইব্রেরিটি খুব অসাধারণ। লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করা শুরু করি। খুব আনন্দের সময় কেটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করলেন কীভাবে?
আমি যে চাকরিটি পেলাম, আগে সেখানে ছিলেন কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তখন কিন্তু ইংরেজি বিভাগে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া খুব কঠিন ছিল। তিনি প্রথম শ্রেণি পাননি, অনার্সেও নেই; কিন্তু খুবই মেরিটোরিয়াস। লেকচারার হলেন। তিনি থাকবেন। কিন্তু এ ঘটনাটা খুব কৌতূহলপূর্ণ এবং করুণও, তিনি যে মহিলাকে বিয়ে করবেন, তারা শর্ত দিলো— টিচারের সঙ্গে পোষাবে না। তারা ধনী লোক, ব্যবসায়ী। তাকে সিএসএস হতে হবে। তিনি সিএসএস পরীক্ষা দিয়ে বোধ হয় সেকেন্ড হলেন। চলে গেলেন। জায়গাটি খালি হলো। ওখানে আমি চাকরি পেলাম। আগে কিন্তু এই ইউনিভার্সিটিতে কেউ অবসর না নিলে বা মারা না গেলে পদ শূন্য হতো না এবং পদ শূন্য না হলে নতুন পদও তৈরি হতো না। এমএ পরীক্ষা দিয়েই চাকরি নিয়েছিলাম হরগঙ্গা কলেজে। আমার আগে মুহিত ভাই— আবুল মাল আবদুল মুহিত, তিনি ইংরেজির প্রভাষক ছিলেন হরগঙ্গায়। তিনি চলে যাওয়াতে ঢুকলাম। আবার হরগঙ্গা কলেজ থেকে জগন্নাথ কলেজে এলাম এমএ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পরে। সাত মাস ছিলাম। ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে জগন্নাথ কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডহকে এলাম, যখন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান সিভিল সার্ভিসে চলে গেলেন। পরে রেগুলারাইজ করা হলো।
দীর্ঘকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। শিক্ষকতা জীবন কেমন কেটেছে?
১৯৫৭ সালে যে ঢুকলাম, এখন পর্যন্ত আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যাইনি। এমনকি উপাচার্য হওয়ারও একাধিকবার সুযোগ হয়েছিল। আমি উপাচার্য হতে চাইনি। আমার চাহিদা ছিল পড়াশোনা করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেয়ে মনে হলো, আমি আমার জীবনের পথ খুঁজে পেয়েছি। তিন কারণে— প্রথম কারণ হচ্ছে চাকরিতে কোনো বদলি নেই। এখানেই সারা জীবন থাকতে পারব। দুই নম্বর— এই যে বিরাট গ্রন্থাগার, এটি আমার জন্য উন্মুক্ত হলো। আগে তো বাইরে থেকে স্বাদ নিতাম, ভেতরে ঢুকতে পারিনি। তিন নম্বর— যারা শিক্ষক ছিলেন, তাদের সঙ্গে মেলামেশা করা সম্ভব হবে এবং সেই মেলামেশার মধ্য দিয়ে নিজেকে বিকশিত করতে পারব। এই তিন কারণে আমি খুব সন্তুষ্ট এবং আর অন্য কোনো চাকরিতে যাওয়া বা অন্য কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব, যেমন— বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, এমনকি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য— সেগুলোও আমাকে আকর্ষণ করেনি।
পড়িয়ে আনন্দ পেতেন? ছাত্ররা পছন্দ করত?
মনোযোগ দিয়ে পড়াতাম এবং আনন্দ পেতাম। আমাদের সাহিত্যের শিক্ষকরা দুই ধরনের হন। এক ধরনের শিক্ষক খুব ব্যাখ্যা করেন। ব্যাকরণ তুলে ধরেন। উপমার পরিপ্রেক্ষিত, তার পেছনের ইতিহাস— এগুলো বলেন। আরেক ধরনের শিক্ষক নিজের পাঠের আনন্দকে ছাত্রদের মধ্যে সংক্রমিত করার চেষ্টা করেন। এই ধরনের দুজন শিক্ষক আমরা পেয়েছি। দুজনেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। একজন মুনীর চৌধুরী, আরেকজন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। মুনীর চৌধুরী বেশিদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন না। বাংলা বিভাগে চলে গেলেন। আমরা তাকে মুনীর ভাই-ই বলতাম। ভাইয়ের মতো সম্পর্ক ছিল। সাহিত্য পাঠে আমার নিজের যে আনন্দ, সেটিকে ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম, অর্থাৎ আমি দ্বিতীয় ধারার শিক্ষক হওয়ার চেষ্টা করেছি। সে জন্যই ছাত্ররা আমাকে পছন্দ করছে মনে হয়।
লেখালেখির জীবন?
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় ফুটবল খেলতে গিয়ে পা ভেঙে গেল। শয্যাশায়ী হয়ে গেলাম। তখন তো উন্নত চিকিৎসা ছিল না। প্লাস্টার করে শুয়ে থাকতে হলো দেড় মাসের মতো। তখনই পত্রিকা পড়ার ঝোঁক তৈরি হলো। আজাদ পত্রিকা ছিল। সেখানে মুকুলের মাহফিল থাকত। মোহাম্মদী পত্রিকা থাকত। আমরা রাজশাহীতে থাকতাম। মুসলিম ইনস্টিটিউট ছিল, বাবা তার সদস্য ছিলেন। কিশোরদের উপযোগী বই এনে দিতেন। এই খেলা থেকে বই পড়া আমার বিনোদনের বিষয় হলো। দ্বিতীয়ত, তখন থেকে ভাবতাম, মুকুলের মাহফিলে আমার বয়সের ছেলেমেয়েরা লিখে, আমিও লিখতে পারব। ওখান থেকে লেখার অভ্যাস করলাম। হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করেছি। তারপরে আমরা ঢাকায় আজিমপুর কলোনিতে এলাম ১৯৫০ সালে। কলোনির আমরা প্রথম দিকের বাসিন্দা। এখানে এসে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ পেলাম। পাশেই মোহাম্মদী পত্রিকার অফিস, ওখানে লেখা পাঠিয়েছি ছাপার জন্য। তমদ্দুন মজলিসও ছিল আমাদের বাড়ির পাশেই। আমার এক বন্ধু তমদ্দুন মজলিসের সদস্য ছিল। তার মাধ্যমে সাপ্তাহিক সৈনিকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। ‘দ্যুতি’ নামে একটা মাসিক পত্রিকা ছিল, তার সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়েছি। এভাবে লেখার কাজটি চলতে থাকল।
আপনি তো প্রচুর বই লিখেছেন। প্রবন্ধ সাহিত্যে আপনি বাংলাদেশের অন্যতম বড় লেখক।
লেখা শুরু করেছিলাম গল্প দিয়ে। কিন্তু গল্পকার বা কথাসাহিত্যিক হওয়া আমার হয়নি দুই কারণে। একটা হচ্ছে, আমি দেখলাম, কথাসাহিত্যিক হওয়ার জন্য যে নিবেদিত চিত্ত লাগে, মানে যে আত্মত্যাগ করতে হয়, সেটি আমার নেই। আমার বন্ধু, যেমন— সৈয়দ শামসুল হক আর আমি একসঙ্গে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলাম পাশাপাশি বসে। ও এসেছে কলেজিয়েট স্কুল থেকে। আমি এসেছি সেন্ট গ্রেগরি থেকে। ও সাহিত্যিক হবে। সে জন্য সে সেন্ট গ্রেগরিতে ভর্তি হয়নি। চলে গেছে বোম্বেতে এবং তারপরে এসে ইংলিশে ভর্তি হয়েছিল আমার দুই বছর পর। সেখানেও পড়াশোনা না করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে ফুলটাইম লেখক হওয়ার জন্য। ওটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি তো সংকীর্ণ মধ্যবিত্ত পরিবেশে সাহিত্যচর্চা করব একটা অতিরিক্ত দিক হিসেবে। ওই যে নিবেদিত চিত্তটা, সেটি প্রবন্ধ লিখতে দরকার হয় না; সেটি কথাসাহিত্যিকদের অভিজ্ঞতা। মধ্যবিত্ত বৃত্তের মধ্যে আমি গল্প লিখেছি। আমার গল্পের বইও আছে। উপন্যাস লেখারও চেষ্টা করেছি। কিন্তু মধ্যবিত্তের বাইরে যাওয়া আমার সম্ভব হয় না। বাইরে না গেলে কথাসাহিত্য হয় না। দ্বিতীয়ত, আমি যেহেতু সাহিত্যের অধ্যাপনা শুরু করলাম, শিক্ষকতা শুরু করলাম, আমার মনে হলো, সাহিত্যের শাখা কথাসাহিত্য এমন উচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে যে আমি যতই চেষ্টা করি, ওই পর্যায়ে যেতে পারব না। তার চাইতে সহজ প্রবন্ধ লেখা। প্রবন্ধে আমার বক্তব্য আছে, আমার নিজস্বতা তুলে ধরতে পারি। আমার অভিজ্ঞতা— আমার চিন্তার অভিজ্ঞতা, বই পাঠের অভিজ্ঞতা। কাজেই আমি প্রবন্ধেই চলে এলাম। কিছু অনুবাদও করেছি।
কলাম লেখার জীবন?
খুব আনন্দে বেনামিতে কলাম লিখতাম। বেনামিতে লেখার দুটো সুবিধা। একটা হচ্ছে, লোকে হয়তো জেনে ফেলবে লেখাটা কার; কিন্তু আমাকে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারছে না যে আমি লিখছি এটি। অনেক সময় দেখতাম, আমার পাশে বসেই বাসে যাচ্ছে একজন, সংবাদে লিখতাম আমি ‘গাছপাথর’ নামে, ১৪ বছর লিখেছি, আমার পাশে বসে পড়ছে; কিন্তু জানে না আমি লিখি। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, এই যে একটা স্বাধীনতা পাওয়া যায় বেনামিতে লিখলে, সেটি স্বনামে লিখলে পাওয়া যায় না। সে জন্য আমি তিনটে কলাম বেনামিতে লিখতে শুরু করি। আমার বন্ধু মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ‘পূবালী’ নামে একটি পত্রিকা বের করত। সেখানে কলাম লেখা আরম্ভ করলাম ‘ঢাকায় থাকি’। আমার ছদ্মনাম ‘নাগরিক’। ওইটাও বেশ জনপ্রিয় ছিল। তারপরে দৈনিক পাকিস্তান বের হলো। দৈনিক পাকিস্তানেও আমি ‘মৃতভাষী’ নামে একটা কলাম লিখতাম। তারপর ইংল্যান্ডে চলে গেলাম। ফেরত এসে অনেক বছর পর, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আবুল হাসনাতের মাধ্যমে সংবাদে যুক্ত হয়ে ‘গাছপাথর’ নামে ‘সময় বহিয়া যায়’ কলামটা লিখতাম। তার আগে অবশ্য সাদাত চৌধুরীর বিচিত্রায় একটা কলাম লিখতাম ‘উপর কাঠামোর ভেতরে’। সেখানে অবশ্য আমার নিজের নামেই লিখতাম।
খবরের কাগজে লেখাটা আমার জন্য উপভোগ্য ছিল। এ জন্য যে, আমি হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনা করেছি, দেয়াল পত্রিকা সম্পাদনা করেছি, অনেক পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। এমনকি সাপ্তাহিক পত্রিকারও সম্পাদনা করেছি ‘সময়’ নামে। আমরা দুবার সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেছি। একটা দেড় বছর টিকে ছিল। আরেকটাও দেড় বছর। একটা ছিল ‘সচিত্র সময়’, আরেকটা সাপ্তাহিক ‘পত্রিকা’। এখন নতুন দিগন্ত সম্পাদনা করছি ২৪ বছর ধরে। এ জন্য সাংবাদিকতার দিকেও আমার, মানে সাংবাদিকতা মানে রিপোর্টিং না, সম্পাদকীয়, এডিটোরিয়াল— ওই দিকটি আমার ভালো লাগছে। ওটা আবার প্রবন্ধ লেখার সঙ্গে যুক্ত হয়।
বিয়ে করেছিলেন কবে?
আমি বিয়ে করেছি ১৯৬২ সালের ডিসেম্বর মাসে। আমার স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরী বাংলায় এমএ পাস করেছিল। তারপরে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে লেকচারার ছিল। বিয়ের পরে ইংল্যান্ডে পিএইচডি করতে গিয়েছি, ও আমার সঙ্গেই গেছে। কিন্তু যেহেতু আমরা লন্ডনের বাইরে ছিলাম, লন্ডনে থাকলে হয়তো সে ওরিয়েন্টাল স্কুলে একটি ডিগ্রির জন্য পড়তে পারত; কিন্তু সে আর পড়তে পারেনি। আমি লেস্টারে ছিলাম। পরে আমার স্ত্রী পিএইচডি করেছে। ওর পিএইচডির সাবমিশনটিও বেশ একটু অভিনব ছিল— বাংলা উপন্যাস ও রাজনীতি। আহমদ শরীফ স্যারের তত্ত্বাবধানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ করেছে। আবার কলকাতা থেকেও বই প্রকাশ করেছে। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেছে। বাংলা পড়াত। ক্যান্সারে ১৯৮৯ সালে মারা গেল।
আপনি এত লেখেন, রহস্য কী?
রহস্য নেই কোনো। আমার অন্য কোনো কাজ নেই। আমি সৌভাগ্যবান এই দিক থেকে যে স্ত্রী যখন জীবিত ছিলেন, তখন সাংসারিক সব কাজ তিনি করতেন। আমাকে বাজার-টাজারও করতে হতো না। বড়জোর বলত, এই রুটি কিনে আনো। তার মৃত্যুর পরে আমার বড় মেয়ে এই সাংসারিক দায়িত্ব নিল। আমার দুই মেয়ে আছে। আমার তো সাংসারিক কোনো দায়িত্ব নেই। পড়াই আমার বিনোদন। লেখাও আমার বিনোদন। তবে আমি আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারি না। এটি আমার দুঃখ।
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন করেছেন। কীভাবে শুরু হলো বামপন্থার সঙ্গে যোগাযোগ?
ছোটবেলায় আমরা যখন রাজশাহীতে থাকতাম, তখন কমিউনিস্ট পার্টির কাজ করতাম। তারপরে এখানে এসে কমিউনিস্ট পার্টি সম্বন্ধে আরও জানলাম। কিন্তু আমার বড় পরিবর্তনটি হয়েছে ইংল্যান্ডে গিয়ে। ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ড গিয়েছিলাম। আমাদের ঢাকা তো গ্রাম্য শহর ছিল। আমরা মার্ক্সিস্ট সাহিত্য নিয়ে চর্চা করতে পারতাম না। এগুলো নিষিদ্ধ ছিল। গোপনে সরবরাহ হতো, রাখা অপরাধ ছিল। ইংল্যান্ডে লিডসে গিয়েছিলাম। লিডস বামপন্থীদের একটা কেন্দ্র ছিল। ওই ষাটের দশকে ইউরোপ জুড়ে ছাত্র আন্দোলনের ঝড় চলছিল। ওটার প্রভাব পড়ল। আমার কিন্তু ধারণাই ছিল, এই ব্যক্তিমালিকানায় চলবে না, সামাজিক মালিকানা হতে হবে। ইংল্যান্ডে গিয়ে আরও কনফার্ম হলো। আমাদের বন্ধুরা যারা ইংল্যান্ডে আগে গেছে, স্থায়ী হয়ে গেছে পড়াশোনা করে, তারা সবাই বামপন্থী আন্দোলনে ছিল। কাজেই বন্ধুদের প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল। দেশে এসে আরও বেশি করে পড়লাম এবং ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেখলাম, একটা সমাজতান্ত্রিক শক্তি বিকশিত হচ্ছে। আমার আবার মওলানা ভাসানীকে খুব পছন্দ হতো। তিনি সমাজ পরিবর্তনের জন্য, সামাজিক বিপ্লবের জন্য কাজ করেছেন। এভাবে পরিচয় ও যোগাযোগ এবং কাজ করা হয়েছে।
আপনি কী রকম বিশ্বের স্বপ্ন দেখছিলেন? আপনার স্বপ্নটা কী?
আমি মনে করি, পৃথিবী যেভাবে চলছে, যেভাবে উন্নয়ন হচ্ছে, সেটি পৃথিবীর জন্য বিপদ ডেকে আনছে। এখানে মনুষ্যত্ব বিপন্ন হচ্ছে। এখানে ব্যক্তিমালিকানার বদলে সামাজিক মালিকানার ব্যবস্থা হোক। এর কোনো বিকল্প আমি দেখতে পাই না।
তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬
স্থান: উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


