পৃথিবীর সব দেশের গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজিস্টরা আমার নাম জানেন

জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান
জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি। অক্সফোর্ডের ডিফিল। বারডেমকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন যারা, তিনি তাদের অন্যতম। তার সঙ্গে কথা বলেছেন ওমর শাহেদ, মুমিতুল মিম্মা ও আখলাকুজ্জামান অনিক। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
আপনার জন্ম কবে?
আমার জন্ম বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণকাঠি গ্রামে ১৯৪১ সালের ২ মে। বাবা ফজলুর রহমান খান আর মা ফখরুন্নেসা খাতুন। তারা তো আর বেঁচে নেই। আমার জন্মের সময় তিন বোন বেঁচে ছিলেন। সব বোনের পর আমার জন্ম। তারপর আরও দুই ভাই জন্মেছে। আমরা ছয় ভাইবোন।
ছোটবেলা কেমন কেটেছে?
আমরা তো একেবারে অজপাড়াগাঁওয়ের মানুষ। যত দূর মনে পড়ে, গ্রামে ইটের তৈরি ঘর ছিল না। সবই কাঠের আর কাদামাটির ফ্লোর। আমার পূর্বপুরুষরা আফগানিস্তান থেকে এসেছিলেন ওখানে। আমি তো ওই অর্থে ঠিক ধনী ঘরের সন্তান নই। আবার অর্ধাহার-অনাহারে থেকেছি তাও নয়। বাবা খুবই সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কেউ কোনোরকম জটিলতায় পড়লে তার কাছে বুদ্ধি নিতে আসত। আমার জন্মের সময় পরিবার কিছুটা আর্থিক অসুবিধায় পড়েছিল। কারণ দাদা সব সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে গেছেন। কিছু ছোট জমি রেখেছিলেন। ওনার ছোট তালুকদারির মতো ছিল, আমাদের প্রজা ছিল। তার থেকে কিছু অর্থ আসত, এটা মনে আছে। বাবা খাজনা তুলতে যেতেন, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তিন মেয়ের পর আমার জন্ম। সুতরাং খুব আদরেই বড় হয়েছি। কিন্তু ওই যে প্রজাস্বত্ব আইন হয়ে গেল, ফলে ভালো হয়েছে কিন্তু অসুবিধা হয়েছে আমাদের মতো পরিবারগুলোর। কারণ খাজনা আর থাকল না। আমাদের নিজস্ব জমি ছিল, তাতে যে ধান হতো তা দিয়েই চলে যেত। সরিষার তেলও নিজের ক্ষেতের সরিষা দিয়েই হয়ে যেত। শাকসবজি ও মাছ নিজেদের পুকুর, জলাশয় থেকে হতো। হাঁস-মুরগি যা ছিল তা দিয়েই চলত। তবে বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি এলে একটা ছাগল বা খাসি জবাই করে খাওয়া-দাওয়া হতো।
পড়াশোনায় কেমন ছিলেন?
গ্রামের পাশের পাদ্রি শিবপুরের সেন্ট আলফ্রেড স্কুল থেকে সবোর্চ্চ নাম্বার নিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছি। রোমান ক্যাথলিক মিশন। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ধর্মের প্রচার। সুতরাং খ্রিস্টান হলেই মাস্টার হয়ে যেতে পারত। সেজন্য ওই রকম উঁচু দরের মাস্টার ছিল না। কিন্তু নিয়মকানুন খুব কড়া ছিল। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই ১৯৫৮ সালে, তখন ডিস্ট্রিক হেডকোয়ার্টারে স্কুলের সিট পড়ত। আমাদের স্কুলের সুনাম ছিল, এরা খুব ডিসিপ্লিন। স্কুলে ফেল করলেও রাখত। কিন্তু নকল করলে আর তাকে রাখত না। আমি ক্লাস টুতে ভর্তি হয়েছিলাম। প্রাইমারি, হাইস্কুল— সবটাই ওখানে করেছি।
ইন্টারমিডিয়েটে কোথায় পড়েছেন?
ঢাকা কলেজে। আমরা ১৯৫৮ সালে ভর্তি হলাম। ঢাকা কলেজ তখন আগে তো ঢাকার সিদ্দিক বাজারে খুব জীর্ণ অবস্থায় ছিল। বর্তমান অবস্থানে ওই বছরই শিফট হয়ে আসছে। যেহেতু মিশন স্কুল থেকে এসেছি, সেজন্য বাড়ি থেকে মোটামুটি ঠিকঠাক করা ছিল যে, নটর ডেম কলেজে ভর্তি হব। তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন ফাদার মার্টিন। কিন্তু ওখানে মুসলমান ছেলেদের কোনো হোস্টেল নেই। খ্রিস্টান ছেলেদের আছে। আমি গ্রাম থেকে এসেছি। ঢাকা শহরে আত্মীয়স্বজন নেই যে থাকব। একটা বাসা ভাড়া করে থাকা, এটা তো ফাইন্যান্সিয়ালি সম্ভব হবে না। সুতরাং ওটা বাদ দিয়ে ঢাকা কলেজে পড়তে এলাম। আজকে বলছি, এই কলেজে যে ভর্তি হলাম দ্যাট ওয়াজ এ ওয়াইজ ডিসিশন। ঢাকা কলেজের টিচার স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে নটর ডেমের টিচার স্ট্যান্ডার্ডের কম্পারিজনই হবে না। কোনো কোনো টিচার ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকেও বেটার ছিল। যেমন আমাদের বাংলা পড়াতেন মৈমনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক মো. মনসুর উদ্দিন আহমদ। ইংরেজি পড়াতেন বিখ্যাত লেখক আবু রুশ্দ। তিনি ছিলেন ইংরেজির হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট। সুতরাং ঢাকা কলেজে যে ভর্তি হলাম, আমি মনে করি ঘটনাক্রমে এটা ভালো হয়েছে।
ঢাকা কলেজে হোস্টেল ছিল দুটি— নর্থ এবং সাউথ হোস্টেল। নতুন হয়েছে। তখনো পুরোপুরি গুছিয়ে ওঠেনি। অর্গানাইজ করেনি। কলেজ ছিল ৯টা-৫টা। দুই বেলা খাওয়া হতো। একবেলা ৯টার আগে, মানে আমরা সাড়ে ৮টা-পৌনে ৯টায় খেয়ে যেতাম। আবার সন্ধ্যা ৭টা-সাড়ে ৭টায় খেতাম। আমরা যারা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে মাত্র ১৯ জন প্রথম বিভাগ পেয়েছে। আমি তাদের একজন। আমাদের মধ্যে বিখ্যাত লোকও ছিল। বিখ্যাত নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুন, অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান আমার সহপাঠী। নায়ক বুলবুল আহমেদ কমার্সে পড়ত।
ডাক্তারিতে ভর্তি হলেন কেন স্যার?
এটা খুবই সংগত প্রশ্ন। ছোটবেলায় মানুষের অ্যাম্বিশন থাকে না? থাকে। ছোটবেলায় এত মানুষ চিকিৎসার অবহেলায় মারা যেতে দেখেছি, যেমন আমার নিজের বোন কলেরায় মারা গেছে। তখন কলেরায় তো অনেক মানুষ মারা যেত। সুতরাং তখন মনে হতো, ডাক্তার হলে মানুষের জন্য কাজ করতে পারব। তখন লক্ষ্য ছিল ডাক্তার হয়ে গ্রামে চলে যাব। গ্রামের মানুষকে চিকিৎসা দেব।
আপনি ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র?
হ্যাঁ, তখন তো মেডিকেল কলেজ ছিল তিনটি। রাজশাহী আর চট্টগ্রাম নতুন শুরু হয়েছে। তিনটিকেই একই স্ট্যান্ডার্ড ধরা হতো। যে যেখানকার লোক, সে সেখানে ভর্তি হতো। প্রথম দিকে ফ্রাস্টেশনে ছিলাম, ভুল চয়েস করলাম কি না? কারণ মেডিকেলের পড়া খুব মনে রাখতে হয়, মেমোরির ভূমিকা খুব বেশি; কিন্তু আমি মনে রাখতে পারি না। তো সেজন্য মনে হতো, এখানে তো আমি মিসফিট। কিন্তু পরে যখন অক্সফোর্ডে গেছি দেন আই রিয়েলাইজড, মেমোরির অত ইম্পর্ট্যান্স নেই। আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইজ মোর ইম্পর্ট্যান্ট দ্যান মেমোরি। এখন তো মেমোরি লাগেই না। বিকজ ইওর মোবাইল ক্যান বি ইওর মেমোরি। ইউ হ্যাভ টু নো হোয়্যার দি ইনফরমেশন ইজ। তাই না? আমার ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো ছিল না। যখন ভর্তি হলাম তখন ফার্স্ট গ্রেড স্কলারশিপ পেয়েছি আইএসসির বেসিসে। তাতে বৃত্তি পাই দুই বছর। তখন মেডিকেল কলেজের পরীক্ষায় ফার্স্ট হলে ৩০ টাকা পাওয়া যায়। বেতন দিতে হতো না। দ্যাট ওয়াজ এ বিগ হেল্প। যারা একটু মোটামুটি ধনী ঘরের, তাদের জন্য এটা কোনো অ্যামাউন্ট নয়। আমার জন্য অনেক।
আপনার অক্সফোর্ডের জীবনটা একটু বলেন।
১৯৭২ সালে কমনওয়েলথ ফেলোশিপে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করার জন্য গেলাম। পিজিতে চাকরি করি তখন। অক্সফোর্ডের জীবনটা খুবই আনন্দদায়ক, খুবই প্রোডাকটিভ ছিল। সেখানে যে সায়েন্টিফিক কাজ করেছি, সেটি এখনো ওয়াইডলি কোটেড। আমি যে ওষুধ আবিষ্কার করেছি, সেটির পেটেন্ট করিনি। যাতে মানুষ সস্তায় ওষুধটি পেতে পারে। যে অসুখের ওষুধটা আবিষ্কার করছি, সেটি এখনো প্রধান ওষুধ। সেজন্য পৃথিবীর সব দেশের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টরা আমার নামটি জানেন। জানেন যে, আজাদ খান এটি আবিষ্কার করেছেন।
কীসের ওষুধ?
inflammatory bowel disease-এর ওষুধ। ডায়রিয়ার সঙ্গে রক্ত পড়ার এ ওষুধ আমি আবিষ্কার করেছি। Five ASA baised drug, five SA. এখন বিভিন্ন নামে পাওয়া যায় Asacol, Mesacol.
অক্সফোর্ড কেমন লেগেছে?
বেসিক্যালি অক্সফোর্ড আমাকে খুব স্যুট করেছিল। কারণ অক্সফোর্ডে যেটা হয় ওই মেমোরিটা এত ইম্পর্ট্যান্ট নয়। আন্ডারস্ট্যান্ডিং হলো ইম্পর্ট্যান্ট। আর লাগে টু বি অ্যাবল টু থিঙ্ক অরিজিনালি। এটিই আসল। বেসিক্যালি যারা নিজেরা সেলফ এডুকেটেড হতে পারে না, তারা অক্সফোর্ডের জন্য স্যুটেবল নয়। ইউ মাস্ট বি অ্যাবল টু বি সেলফ এডুকেটেড। তোমার যে টিউটর আছে, সে তোমারে গাইড করবে। এডুকেট হতে হবে তোমাকে নিজে নিজেই। ফর্মাল লেকচার দিয়ে এডুকেট করা যায় না। ফর্মাল লেকচার নেই তো।
ছোটবেলায় এত মানুষ চিকিৎসার অবহেলায় মারা যেতে দেখছি, যেমন আমার নিজের বোন কলেরায় মারা গেছে। তখন কলেরায় তো অনেক মানুষ মারা যেত। সুতরাং তখন মনে হতো, ডাক্তার হলে মানুষের জন্য কাজ করতে পারব। তখন লক্ষ্য ছিল ডাক্তার হয়ে গ্রামে চলে যাব
ওষুধটি পেটেন্ট না করার কথাটি কেন মাথায় এলো?
প্রথম কথা, পেটেন্ট করা হয় তো বাণিজ্যিক কারণে। মাথায় এলো, আমি পেটেন্ট করলে ওষুধের দামটা বেড়ে যাবে। তাই না? তখন অক্সফোর্ডে বলা হবে— আমি টাকার পেছনে ছুটছি। এখন অনেকেই পেটেন্ট করে। এখন সবাই আমেরিকান ইনফ্লুয়েন্সে টাকার পেছনে ছুটছে।
আপনার এই ওষুধ কীভাবে মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে?
আলসারোটিভ কলাইটিস রেমিশনে রাখার জন্য এইটাই ওষুধ। আর কোনো ওষুধ নেই। লাখ লাখ মানুষের জীবনে উপকার হয়।
অক্সফোর্ডে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব ছিল?
গিয়েছিলাম এক বছরের জন্য, কিন্তু আমি আলসারোটিভ কোলাইটিস নিয়ে রিসার্চ শুরু করার কিছুদিন পর তারাই অনুরোধ করছে, তুমি থেকে যাও। যে কাজ শুরু করছ তুমি, ইট হ্যাজ বিকাম সো এক্সাইটিং, তুমি থেকে যাও। আমার সুপারভাইজারের নামটাও সুন্দর সিডনি চার্লস ট্রুলাভ, সবাই ডাকত এসসি ট্রুলাভ, সে মানুষও ছিল ট্রু লাভ— ওই রকম, হি ওয়াজ লাইক মাই ফ্রেন্ড, লাইক মাই ফাদার, লাইক মাই ব্রাদার। আমার মনে হয় না তার ছেলেমেয়েরাও আমার চেয়ে ক্লোজ ছিল তার কাছে। সে বলল, তুমি থেকে যাও। বললাম, থেকে যেতে চাইলে সরকার এটা ভালোভাবে নেবে না। তুমি থাকতে বলছ তো, তুমি লেখো আমার সরকারকে। বলল, কাকে লিখতে হবে? বললাম, সেক্রেটারিকে লেখো। ও-ই কপি দেবে মন্ত্রীকে। তো লিখল। একসময় উত্তর এলো, আবেদন করতে হবে। আমি চলে আসি ১৯৭৭ সালে, তখনো তারা রাখার খুবই চেষ্টা করছে আমাকে। বললাম, না, আমি তো একটা কাজে এসেছি। সুতরাং আমার কখনো মনে হয়নি, থেকে যাব। অফার তো অনেক তখন। তখন আমি ওষুধটা আবিষ্কার করেছি, অক্সফোর্ডে ডক্টরেট করেছি। আমেরিকা বলো, সুইডেন বলো— বহু জায়গা থেকে অফার আসছিল েথকে যাওয়ার।
পিজি হাসপাতালের জীবন?
চাকরি শুরুই করছি পিজি হাসপাতাল থেকে, মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে। তখন সাব-স্পেশালিটি হয়নি। কার্ডিওলজি ছাড়া কোনো বিভাগ চালু হয়নি। পরে নিউরোলজি হয়। তখন এই দেশে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি শুরুই করেছি এবং এই বিভাগের প্রথম সহকারী অধ্যাপক আমিই। এই বিভাগের প্রথম সহযোগী অধ্যাপক, প্রথম পূর্ণ অধ্যাপক। সেজন্য আমার বদলিও হয়নি অন্য কোথাও। পিজি হাসপাতালে ২৫ বছর ছিলাম। এর মধ্যে তো সাড়ে পাঁচ বছর অক্সফোর্ডে। পিজি হাসপাতালে আমি প্রথম তো হাউজম্যান ছিলাম। তারপর রেজিস্ট্রার। আমার প্রথম নিয়োগ হয়েছিল রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। এই পদও আর কোথাও ছিল না। তারপর তো রেজিস্ট্রার থাকাকালে এফসিপিএস করে ফেললাম। ১৯৭০ সালে রেজিস্ট্রার হয়েছি। তারপর সহকারী অধ্যাপক হলাম। এখানে জীবনটা গতানুগতিক, কিন্তু ভালোই ছিল। তখন তো পিজি ছোট ছিল। পুরো ১৯৭১ সাল পিজিতে ছিলাম।
১৯৯২ সালে বারডেমে আসেন। এখানে কীভাবে কাজ করেন?
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি চালায় যারা, কাউন্সিল মেম্বার, তারা তো বেতন নেয় না। তারা কোনো প্রাইভেট হেলথকেয়ারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে না। ভলান্টারি ওয়ার্ক করতে হয়। কিছু কিছু প্রাইভেট রোগী দেখি। সেগুনবাগিচায় বসি। আমরা কখনো কোনো ক্লিনিকে বসি না। আমি মনে করি, ডাক্তারদের প্রাইভেট ক্লিনিকে বসা এথিকাল নয়। এটা বিশ্বাস করি এবং করি না এরকম।
বারডেমে আপনি অনেক কাজ করেছেন।
সেটি তো মানুষ বিচার করবে। প্রথম এসেছিলাম এখানে গবেষণা কাজের উন্নতি করার জন্য। তখন ডাক্তার ইব্রাহিম আমাকে ইনভলভ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অত ইনভলভড হইনি তখন। সেটা আমার জাজমেন্টের ফেইলিওর ছিল। বিশেষ করে ওনার মৃত্যুর পর এমপ্লয়িজ ট্রাবল হলে দেখলাম, ওউন করার লোক নেই। তখন আস্তে আস্তে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে গেলাম। ডায়াবেটিস রোগীদের হার্টের অসুখ বেশি হয় বলে আমার সময়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট হয়েছে। সবাই মিলেই করেছি। তারপর জনবল তৈরি করে মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ করেছি। খালি ডাক্তার তৈরি করলেই তো হবে না। চিকিৎসাক্ষেত্রে অনেক কিছু করতে হয়। সেজন্য বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স করেছি।
ছোট একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বারডেম কীভাবে এত বড় হলো?
মানুষের ডিমান্ড, মানুষের হেলফ, সরকারের সাহায্য— সব মিলিয়েই বড় হয়েছে। এই যে বারডেম এখানে আছে, শাহবাগে, এর মেইন লিমিটেশন তো জায়গা। সেজন্য ওই ইউনিভার্সিটি (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস) হলো, ওই জায়গাটা তো খালেদা জিয়াই দিয়েছেন। তার সময় দেওয়া। ওটা তো এর তিন গুণ বড়। প্রায় ছয় একর জমি।
ধর্মীয় নেতা, বিশেষ করে কাজি ও ইমামদের দিয়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার কাজ করেছেন।
এটা আমি মনে করি খুবই ফান্ডামেন্টাল কন্ট্রিবিউশন। ডায়াবেটিস তো লার্জলি প্রিভেন্টেবল। লাইফস্টাইল চেঞ্জ করলে প্রিভেন্ট হয়ে যাবে অনেকখানি। হান্ড্রেড পার্সেন্ট প্রিভেন্টেবল নয়। ইফ জেনেটিক ফ্যাক্টরস আর ভেরি স্ট্রং, তাহলে কিছু লোকের হবেই। কিন্তু সেভেন্টি, এইটটি পার্সেন্ট প্রিভেন্টেবল। বিগ ওয়েতে প্রিভেন্টেবল। তাহলে প্রিভেনশন কেন হচ্ছে না? ডাক্তার মানে মেডিকেল পার্সোনেল যারা এ লাইনে আছে তাদের বক্তব্য হলো, আমরা তো বলেই যাচ্ছি, মানুষ শোনে না। তখন মনে হলো, কী ভাষায় বললে শুনবে— এটা আমরা জানি না। চিন্তা করলাম, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ট্রাই করে দেখি। তো দেখি, ইসলাম ধর্মের মধ্যে কিন্তু খুব স্ট্রং মেসেজ আছে। ভেরি ভেরি স্ট্রং মেসেজ অ্যাবাউট মেইনটেইনিং গুড হেলথ। তখন আমরা মনে করলাম, যদি খুতবায় বলানো যায়, তাহলে ইফেক্ট হয় কি না? শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক আমাকে ছেলের মতো স্নেহ করতেন। তার বড় ছেলে মাহাবুব বলতে গেলে ঈর্ষাও করত যে, আরে ওর চেয়ে আমাকে বেশি স্নেহ করে। আল্লামা আজিজুল হক সাহেব খুব আলেম লোক ছিলেন। আমি তাকে ধরলাম, আপনি এখানকার যারা রিয়ালি পড়াশোনা জানে, এই ইমামদের দিয়ে আমাকে একটা সম্মেলন করিয়ে দেন। সেখানে বললাম, আপনাদের খুতবায় ডায়াবেটিক প্রতিরোধ সম্পর্কে বলতে হবে। তারা রাজি হয়ে গেলেন। আল্লামা আজিজুল হক তাদের দিয়ে একটা খুতবা তৈরি করিয়ে দিলেন। তখন এটি আল-আজহারে পাঠালাম, কায়রোয়। তারা জানালেন, একদম ঠিক আছে। তারপর সরকারকে ধরলাম। কারণ ইমামরা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সরকার রাজি হলো, এটি ১০ লাখ কপি ছাপিয়ে দেবে। এরপর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কথা বললাম। তারাও ইমামদের সঙ্গে কাজ করে। তারা রাজি। শায়খুল হাদিসের ছেলে মাহবুবকে বললাম, এবার মক্কায় পবিত্র কাবার ইমামদের দেখিয়ে আনুন। সেটি করা হলো। এরপর আমরা ফান্ড জোগাড় করলাম এবং ইমামদের প্রশিক্ষণ দিলাম। তাদের আরও বললাম, এমনভাবে খুৎবা দেবেন যেন মানুষের মনে প্রভাব পড়ে। এরপর দেখা গেল, ৪০-৪৫ শতাংশ রোগী কমে গেল।
ডা. ইব্রাহিমের সঙ্গে পরিচয় কীভাবে?
পরিচয় তার বড় মেয়ের মাধ্যমে, ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. হাজেরা মাহতাব। তিনি আর আমি একসঙ্গে এফসিপিএস করেছি। যদিও তিনি মেডিকেল কলেজে আমার এক বছরের সিনিয়র। তার সঙ্গে আমার ভাইবোনের মতো সম্পর্ক। তার ছেলেমেয়েরা আমাকে খালু ডাকে না, মামা বলে ডাকে। তার ৯ বছরের ছোট বোনের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ১৯৭০ সালে।
(২২ এপ্রিল ২০২৬, বারডেম, শাহবাগ, ঢাকা)




