আমার জীবনে গন্তব্য একটাই— আনন্দ

অধ্যাপক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তার জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন মুনির রানা ও দন্ত্যস রওশন। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
ছোটবেলার কথা মনে পড়ে?
সব কি আর মনে আছে। প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার কথা মনে করতে পারি। জীবনের শুরুর দিক তখন। পৃথিবীকে সবে আবছাভাবে বুঝতে শুরু করেছি। আমরা থাকতাম টাঙ্গাইলের করটিয়াতে। আব্বা (আযীমউদ্দিন আহমদ) তখন সা’দত কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক। ওখানকার জমিদার চাঁদ মিঞা করটিয়ায় বাংলার আলিগড় গড়ে তোলার স্বপ্নে বিভোর। শুধু কলেজ নয়; ওখানে মাদ্রাসা, মেয়েদের স্কুল, ছেলেদের স্কুল, এমনি একটা কমপ্লেক্স গড়ে তুলছেন তিনি। এসবের জন্য নিজের ৩৮ একর জমি ওয়াক্ফ করে দিয়েছেন। এই স্বপ্ন সফল করার জন্য শিক্ষাবিদ ইবরাহীম খাঁকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে। ইবরাহীম খাঁ আবার আব্বাকে নিয়ে আসেন ওই কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে। আমার ওই বয়স তো একটা অবোধ-বিস্ময়ের। যার দিকে তাকাই, সবকিছুই পৃথিবীর মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়। এখনো ওখানকার কোনো কিছু বাস্তব বলে মনে হয় না। মনে হয় যেন স্বপ্নে দেখা কোন পৃথিবী।
কত সাল পর্যন্ত থাকলেন?
১৯৪৬ সাল পর্যন্ত।
আসলে বই পড়ার দিকে আমার তখন কোনো আগ্রহই ছিল না। আমার আগ্রহ ছিল স্বাস্থ্যচর্চায়। জিমনেশিয়াম, খেলার মাঠ, পুকুরে অফুরন্ত সাঁতার ছিল আমার ধ্যান-জ্ঞান। ক্রিকেট খেলতাম। ফুটবল খেলতাম
কতজন ভাইবোন আপনারা?
আমরা ১১ ভাইবোন। সেকালে এটা কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে এমন কোনো ব্যাপার ছিল না! একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই— আমার দাদারা ছিলেন ১৮ ভাই ও ১৪ বোন। তিন মায়ের সন্তান এরা। আমার সেই দাদাদের বাবা যখন হাটে যেতেন, তখন লোকেরা সশ্রদ্ধভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলত— ‘পুরুষ যায় একখানা।’ তখন মানুষ জানত, সন্তান হয় পুরুষের বিক্রমে। নারীর যে কোনো ভূমিকা আছে, এটা অজানা ছিল। পাঁচ ভাইবোন ছিলাম আমরা। আমাদের মা যখন মারা যান, তখন আমার বয়স সাড়ে পাঁচ কি ছয়। এর পরেই আব্বা করটিয়া ছেড়ে চলে যান জামালপুর আশেক মাহমুদ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে। করটিয়া ছাড়ার আগেই তিনি অবশ্য দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। এই পক্ষে আমার ভাইবোনের সংখ্যা ৬।
সেখানকার জীবন?
আশেক মাহমুদ কলেজে তখন টিনের কলেজ, রোদের আলোয় চিকচিক করে। আমাদের বাসাও ছিল টিনের। তাতে গরমকালে আমাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে যেত। কলেজের পাশ দিয়ে রেললাইন। সেখানে ঘুণ্টিঘর। একজন মাত্র লোক থাকে সেখানে। সে সবুজ পতাকা নাড়ে। তাতে ট্রেন চলে যায়। রেললাইনটার সবকিছু যেন রহস্যে ঘেরা।
কোন ক্লাসে তখন?
তখন ক্লাস থ্রিতে উঠে গেছি। বিকাল হলেই আমরা রেললাইনের স্লিপারগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে ওই দূর গ্রাম পেরিয়ে যেখানে বাঁক নিয়েছে ট্রেনলাইন, তার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে যাই।
একা একা?
না। হয়তো কেউ কেউ থাকে। এত বড় রাস্তায় একা একা হাঁটা বড় কষ্টের, ভয়ও আছে। মনে আছে কয়েক বছর পর একটা কবিতা পড়েছিলাম, ‘গাড়ি আসে গাড়ি যায়/ রেললাইন সমান্তরাল/ কারও চোখে মিশে গেছি, তবু মিশি নাই/ তবু পাশাপাশি/ ঐ রেললাইনের মতো।’
আপনার প্রথম পড়া বই কোনটা, মনে আছে?
এলোমেলোভাবে এটা-সেটা পড়েছি। হয়তো কোনোটা রূপকথা, কোনোটা অন্য বই। আসলে বই পড়ার দিকে আমার তখন কোনো আগ্রহই ছিল না। আমার আগ্রহ ছিল স্বাস্থ্যচর্চায়। জিমনেশিয়াম, খেলার মাঠ, পুকুরে অফুরন্ত সাঁতার ছিল আমার ধ্যান-জ্ঞান।
একসময় বলতেন, জ্ঞান আন্দোলন না করে স্বাস্থ্য আন্দোলন করতে পারলে দেশের বেশি উপকার করতে পারতেন।
এখনো তাই মনে হয়। বাঙালির জ্ঞান তবু কিছু আছে। কিন্তু স্বাস্থ্য যে একেবারেই নেই। স্বাস্থ্যের জন্যই তো আমরা প্রতিটি জায়গায় হেরে যাই।
আমার জন্ম কলকাতায়। আমার নানাবাড়িও ছিল কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। মাঝেমধ্যেই ওখানে যাওয়া হতো। সেখানে পার্ক সার্কাস মাঠে শিল্পী কামরুল হাসান আমাদের শরীরচর্চার পাশাপাশি ব্রতচারী নাচ শেখাতেন। ‘আমরা বাঙালি, সবাই বাংলারই সন্তান/ বাংলাদেশের মাটির হাওয়ায় তৈরি মোদের প্রাণ’ আর লাঠি দিয়ে পেটাপেটি। পার্ক সার্কাস মাঠের কিছু স্মৃতি আজও মনে আছে।
টাকার প্রতি আমার একটা অসীম অনীহা আছে। তো, সেই টাকা গুনতে গুনতে আমার জীবন যাবে
ছোটবেলার কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?
জামালপুর থেকে ট্রেনে উঠেছি। পাবনা যাব। রাত দেড়টা বা ২টার দিকে কে যেন ঘুম থেকে তুলে আমাকে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে দিল। নামিয়ে দিতেই দেখি, আশপাশে সে নেই। কিন্তু আমি তার সঙ্গে যেমন হাঁটছিলাম, তেমনি হাঁটতে লাগলাম। ঘুমের ঘোরে হেঁটে চললাম। হাঁটতে হাঁটতে একসময় রেলস্টেশন ছেড়ে অনেক দূর চলে গেলাম। হঠাৎ দেখি, আমার পাশ দিয়ে আরেকজন কে যেন হাঁটছেন। তাকিয়ে দেখলাম, রেলের একজন কর্মচারী। উনি বললেন, ‘খোকা, তুমি কী করো? তোমার নাম কী? আব্বার নাম কী? কী করেন?’ বললাম, ‘আমার আব্বা এডওয়ার্ড কলেজে প্রিন্সিপাল হয়ে এসেছেন।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আমার বাসায় রাত্রে থেকে যাও। সকালে আমি তোমাকে স্টেশনে দিয়ে আসব।’ বাসায় গিয়ে দেখলাম, তার একটা ছেলে ও একটা মেয়ে। মেয়েটা খুব সুন্দর; দেখতে বাদামি চুল, সোনালি চোখ। আমার জীবনে ওই প্রথম আমি মেয়েদের রূপে সৌন্দর্যাহত হই। এখনো মেয়েটাকে মনে পড়ে।
কোন ক্লাসে পড়তেন তখন?
তখন তো সবে ক্লাস ফোর। তো, রাতে থাকলাম ওই বাড়িতে। ওই দুই-ভাইবোনের সঙ্গে গল্প করে কাটিয়ে দিলাম। ওরা বাংলা-উর্দু মেশানো ভাষায় কথা বলছিল। ভদ্রলোকের স্ত্রী আমাকে দেখে প্রথমেই বলেছিলেন, ‘লাড়কা কা নসিব বহুত আচ্ছা হ্যায়।’ কেন? সেদিন বাসায় ফিরনি রান্না হয়েছিল। ভদ্রলোক হয়তো খুব সাধারণ কর্মচারী। সকালে উঠেই আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে গেলেন। গিয়ে দেখি তোলপাড় কাণ্ড। কলকাতায় লোক পাঠানো হয়েছে। জামালপুরে লোক গেছে। লোক পাঠানো হয়েছে— ট্রেনলাইন যেসব দিকে গিয়েছে, সবদিকে। আমাকে দেখে স্টেশন মাস্টার বললেন, ‘ও তুমি! সেই ছেলে।’ খবর পেয়ে বাসার লোকজন ছুটে এলেন। তাদের সঙ্গে ফিরে এলাম বাসায়।
কলেজে কবে গেলেন?
১৯৫০ সালে। তখন আবার আব্বা চলে গেছেন বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে। বাগেরহাট আমার জীবনে একটা গভীর দাগ কেটে আছে। পাবনা জিলা স্কুলে বন্ধুদের বিরাট দল ছিল। বন্ধু কাকে বলে, আমি সেটি অনুভব করি সেখানেই। আমার এক বন্ধু ছিল। এতই তাকে ভালোবাসতাম যে আমাদের বাসা থেকে এক মাইল দূরে জিলা স্কুল, সেইখানে সারাদিন তো ওর সঙ্গে কথা বলতামই; বাসায় ফিরে এসে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার চলে যেতাম ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য স্কুলের পাশে ওদের বাসায়। ও জানালায় এসে দাঁড়াত, আমি বাইরে খানিকটা নিচুতে দাঁড়িয়ে মধ্যযুগীয় প্রেমিকদের মতো ওর সঙ্গে কথা বলতাম। ওর নাম ছিল খায়রুল আনাম সিদ্দিকী। আমাদের ফার্স্ট বয় ছিল ও।
আপনি তো অনেক জায়গায় ঘুরেছেন।
আমি সেদিক থেকে সৌভাগ্যবান। একালের শহরের ছেলেমেয়েদের মতো ঘরের এক কোণে বসে বিমর্ষ জীবন আমার কাম্য ছিল না। আমি সবসময় বেড়িয়ে পরতে চেয়েছি, সুফলও কমবেশি পেয়েছি। দেশের ভেতরে-বাইরে বহু জায়গা দেখার সুযোগ হয়েছে আমার।
ছাত্র কেমন ছিলেন?
ভালো ছিলাম না। এই ফিফথ, সিক্সথ হতাম আর কি। পরীক্ষার মাসখানেক আগে বই নিয়ে বসতাম। তাতে যা হওয়ার হতো। বলেছি তো, আমার উৎসাহ ছিল ব্যায়াম, জিমনেশিয়ামে; ক্রিকেট-ফুটবলও খেলতাম। পাগলের মতো সুইমিং করতাম, একেক দিন পাঁচ ঘণ্টা।
সাঁতার কখন শিখলেন?
খুব ছোটবেলায়, করটিয়ায় থাকতে। আমার মা ছিলেন খুব ভালো সাঁতারু। তাদের বাড়ি ছিল পদ্মার ধারেই। তিনি পদ্মায় নিয়মিত সাঁতার কাটতেন। হঠাৎ একদিন বললেন, ‘সাঁতার শিখবি?’ আমার বয়স তখন সাড়ে চার। লাফিয়ে উঠে বললাম, ‘শিখব।’ আমাদের বাসার সামনে ছোট্ট একটা স্রোতস্বিনী। তাতে টলটলে পানি। তখন চৈত্র মাস। পানি নেমে গেছে নিচে। মা আমাকে সেই নদীর পাশে নিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে পাশের বাসার একজন ভদ্রমহিলা। তারা গল্প করছেন, হাসাহাসি করছেন। নদীর কাছে গিয়ে মা আমাকে চমকে দিয়ে এক আজব কাণ্ড করলেন। হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলেন। কী ভয়ংকর ব্যপার! আমি খাবি খাচ্ছি তো খাচ্ছিই। মনে হচ্ছে, এখনই মরে যাব। প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করছি। সেই পানির ভেতর থেকে দেখি যে মা নির্বিকারভাবে সেই মহিলার সঙ্গে গল্প করে চলেছেন। আমার তখন বলতে ইচ্ছা করছিল, ‘মা, এত নিষ্ঠুর তুমি! আমি মরে যাচ্ছি, তুমি তাকিয়েও দেখছ না।’ আসলে মা তো পাকা সাঁতারু, তিনি জানতেন, আমাকে কখন তুলতে হবে। মা যখন আমাকে তুলতে এলেন, ততক্ষণে আমি নিজেই প্রায় ভেসে উঠেছি, অর্থাৎ খাবি খেতে খেতে আমার সাঁতার শেখা হয়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়েছে, জীবনে বেশি ট্রেনিং-ফ্রেনিং না দিয়ে একদম বিপদের মধ্যে সোজা ফেলে দেওয়া মানুষকে যোগ্য করার একটা ভালো পদ্ধতি। বিপদের মধ্য থেকে মানুষের শক্তি বা দক্ষতাগুলো অনেক দ্রুত ডেভেলপ করে।
কলেজ লাইফটা কেমন কাটল?
কলেজ কাটল বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে। প্রফুল্ল চন্দ্র নিজে কলেজটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আব্বা ছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজের প্রথম বছরের ছাত্র। প্রফুল্ল চন্দ্রের প্রিয় ছাত্র হওয়ায় প্রায়ই তার সঙ্গে আব্বা ঘুরে বেড়াতেন। আব্বার মধ্যে একটা আদর্শবাদ আমি ছোটবেলা থেকেই দেখেছি। তিনি টাকা-পয়সা চিনতেন না। লেখাপড়া, নাটক লেখা, নাটক করা, কলেজ চালানো— এসব নিয়েই সারাদিন মেতে থাকতেন। আব্বা কলেজের অধ্যক্ষ; দিনরাত পড়াশোনা করতেন, অথচ আমাদের কোনোদিন পড়তে বলতেন না। আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া পর্যন্ত জানতাম না যে পড়ার সঙ্গে টাকার কোনো যোগাযোগ আছে। আমার ধারণা ছিল যে যেমন খেতে হয়, খেলতে হয়, তেমনি পরীক্ষার আগে পড়তে হয়। কিন্তু কোনোদিন আমাদের পড়তে না বললে কী হবে; যেহেতু আব্বা নিজে পড়তেন, তাই পড়ার ব্যপারে আমাদের মধ্যে একটা নিঃশব্দ শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া আমাদের বাসার কাছেই একটা লাইব্রেরি ছিল। সে লাইব্রেরি থেকে আমি বিশ-পঁচিশটা বই পড়েছিলাম তখন। যেমন— রবিনহুড, টম কাকার কুটির (আঙ্কেল টমস কেবিন)।
ছেলেমেয়েদের বই পড়তে দিতে হবে। এগুলো শুরু করতে হবে একদম ক্লাস ওয়ান থেকে। আমি সম্প্রতি সরকারের কাছে প্রস্তাব রেখেছি, যেন ইংলিশ মিডিয়ামে এভাবে বাংলা বই পড়ানো হয়। না হলে হৃদয়ের দিক থেকে তারা ধীরে ধীরে বিদেশি হয়ে যাবে
আমাদের গার্জিয়ানরা তো অন্যরকম করেন।
না, না। আমাদের বাসায় পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। একটা উদাহরণ দিই। বিয়ে করার আগে আমার স্ত্রীকে আমি দেখিনি পর্যন্ত। আমার মনে হয়েছিল, মানুষ প্রেম করে বিয়ে করেও অসুখী হয়, প্রেম না করে বিয়ে করলেও তাই। কাজেই এসব চিন্তা করে লাভ নেই। তখন আমার বয়স ছাব্বিশ বছর। আব্বা কিন্তু এতে আপত্তি করেননি। আমাদের বাসায় পুরোপুরি গণতন্ত্র ছিল। কেউ কারও কাজে হস্তক্ষেপ করত না। বিয়ের পরে আমার সামনে যখন একটা বড়সড় আয়না ধরা হলো, তখন আমি প্রথম আমার স্ত্রীর চেহারা দেখতে পেলাম। আশপাশ থেকে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করল, ‘কী দেখছ?’ বললাম, ‘চাঁদ দেখছি।’
আপনাকে প্রভাবিত করেছেন কারা?
আমার ওপর প্রভাব জিনিসটা কম। আমি কোনোদিন কারও কথা শুনিনি। আমি আজও আমার পরিবারের ভেতর খুবই অজনপ্রিয়। কারণ, আমি কারও কথা শুনি না। কিন্তু এখন সবাই সেটি মেনে নিয়েছে। মেনেছে এ জন্য যে, তাদের কথা না শুনে আমি আজও তাদের কোনো বিপর্যয় ঘটাইনি, কারও কোনো ক্ষতি করিনি। যেখানে আমার আনন্দ নেই, সেখানে আমি নেই; আমার জীবনের কোনো গন্তব্য নেই। আমার জীবনের যদি কোনো গন্তব্য থাকে, তবে তা একটাই— আনন্দ।
আপনি শিক্ষকতা করেও আনন্দ পেয়েছেন।
অবশ্যই। শিক্ষকতা আমার অন্যতম প্রধান আনন্দের জিনিস, হয়তো সবেচেয়ে।
শিক্ষকতায় এলেন কেন?
আমার আব্বা ছিলেন খ্যাতিমান শিক্ষক। ছোটবেলায় দেখতাম, আব্বার সম্পর্কে যখন ছাত্ররা কথা বলত, মনে হতো কোনো দেবতা-টেবতা নিয়ে কথা বলছে। আমার তখন মনে হতো, জীবনে কিছু যদি হতে হয়, তা হচ্ছে শিক্ষক। পরে আস্তে আস্তে টের পেয়েছি যে পৃথিবীর বড় মানুষরা তো সবাই শিক্ষক। গৌতম বুদ্ধ শিক্ষক। অ্যারিস্টটল শিক্ষক। প্লেটো শিক্ষক। মানবজাতির মধ্যে যারা স্মরণীয়, তারা অধিকাংশই শিক্ষক।
কলেজে পড়েছেন কোন বিষয়ে?
কলেজে আমি প্রথমে কমার্সে ভর্তি হয়েছিলাম। পরে দেখলাম, বিষয়টা একেবারেই আমার স্বভাববিরুদ্ধ। বাঁচার জন্য টাকার দরকার আছে। সে জন্য কিছু কাজও করতে হয়। কিন্তু টাকার প্রতি আমার একটা অসীম অনীহা আছে। তো, সেই টাকা গুনতে গুনতে আমার জীবন যাবে, আমি মানতে পারতাম না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার পছন্দের শিক্ষক?
প্রিয় শিক্ষক মুনীর চৌধুরী। কিন্তু আমাদের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও অনেক ভালো শিক্ষক ছিলেন। রাজ্জাক সাহেব তীক্ষ্ণ মেধার লার্নেড মানুষ, এ বি এম হাবীবুল্লাহ, গোবিন্দ চন্দ্র দেব— এমন আরও অনেক ভালো শিক্ষক ছিলেন আমাদের।
মুনীর চৌধুরীর কোনো প্রভাব আপনার ওপর পড়েছে?
তার বাচনভঙ্গির প্রভাব আমার ওপর পড়েছিল। মুনীর স্যার ছিলেন খুবই আলাদা একজন মানুষ। তার ভাষাও ছিল আলাদা শানিত, রমণীয় ও গভীর। চমৎকার প্রমিত উচ্চারণে তিনি কথা বলতেন। তিনি আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে বক্তৃতা করতেন। আমি বক্তৃতা দিই প্রস্তুতি ছাড়া। প্রস্তুতি নিতে গেলে মনে হয় আটকে যাব।
একটা আদর্শ স্কুল কেমন হওয়া উচিত?
প্রথম কথা, সেখানে ভালো শিক্ষক থাকতে হবে। মানে ভালো পড়াতে হবে। ভালো শিক্ষক না পেলে ভালো ছাত্র হওয়া কঠিন। শিক্ষককে ছাত্রের বিশ্বদৃষ্টি খুলে দিতে হয়। আমি যখন ক্লাসে পড়াতাম, তখন একটা লেখার তিন লাইন পড়াতে পড়াতেই দেখতাম বছর শেষ হয়ে গেছে। এখনো কোনো কোনো ছাত্র দেখা হলেই বলে— স্যার, ওই যে আমাদের রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তী পড়াতে শুরু করছিলেন, সেটা তো শেষ করতে পারেননি। আমি বলি, কী করে শেষ হবে। আমি তো তোমাদের হৈমন্তী পড়াতাম না, আমি তো রবীন্দ্রনাথ পড়াতাম; আমি রবীন্দ্রনাথও পড়াতাম না, আমি তো বাংলা ভাষা সাহিত্য পড়াতাম; বিশ্বসাহিত্য ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। একজন শিক্ষকের কাজ হচ্ছে ছাত্রের হৃদয়টাকে জাগিয়ে দেওয়া, তার চেতনার উজ্জীবন ঘটানো।
পাবনা জিলা স্কুলে বন্ধুদের বিরাট দল ছিল। বন্ধু কাকে বলে, আমি সেটি অনুভব করি
এখন তো স্কুলে এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস খুব কম।
এটাই থাকা উচিত ৫০ ভাগ। আমাদের ছোটবেলায় সাংস্কৃতিক সপ্তাহ হতো। এখন তো এগুলো প্রায় কিছুই নেই। ছেলেমেয়েদের বই পড়তে দিতে হবে। এগুলো শুরু করতে হবে একদম ক্লাস ওয়ান থেকে। আমি সম্প্রতি সরকারের কাছে প্রস্তাব রেখেছি, যেন ইংলিশ মিডিয়ামে এভাবে বাংলা বই পড়ানো হয়। না হলে হৃদয়ের দিক থেকে তারা ধীরে ধীরে বিদেশি হয়ে যাবে। তারা এই দেশকে চিনবে না; এই দেশের মাটিকে, মানুষকে, ঐতিহ্যকে, সংস্কৃতিকে চিনবে না। তাদের সঙ্গে দেশের একাত্মতা ঘটবে না। ইংরেজি মাধ্যমে স্কুলগুলোতেও বাংলা বই পড়াতে হবে। মাদ্রাসায়ও তাই, সর্বক্ষেত্রে।
একটা বই পড়া মানুষ আর বই পড়াবিহীন মানুষ— পার্থক্যটা কী রকম?
বই পড়লে যেটা হয়, মানুষের চাহনিটা বড় হয়, তার দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ বড় হয়। সে দূরকে দেখতে পায়।
তারিখ : ৬ মে, ২০২৬; স্থান : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা।





