বহু বিষয়ে আমাকে দক্ষতা অর্জন করতে হয়েছে

বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ ড. আইনুন নিশাত। ছবি : সাজ্জাদ হোসেন
ড. আইনুন নিশাত নিজ কর্মেই খ্যাতিমান। নদী বিশেষজ্ঞ, আইইউসিএনের সাবেক দেশীয় প্রতিনিধি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। তার সঙ্গে কথা বলেছেন ওমর শাহেদ ও আখলাকুজ্জামান অনিক। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
বয়স কত হলো আপনার?
৭৯-তে পা দিয়েছি। কিন্তু এখনো মনে হয় আমার বয়স ৩০ থেকে ৪০-এর মধ্যে। এখনো লাফালাফি করি। মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াই। এই ঘুরে বেড়ানোটাই পেশাগত কােজ সাহায্য করে।
এই অফিসে এখন কী কাজ করছেন?
অভিবাসন, সুপেয় খাবার পানি নিয়ে কাজ করছি। পরিবেশ পরিবর্তন, পরিবেশ রক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের গবেষণা প্রকল্প আছে আমাদের। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভারমেন্টাল রিসার্চ’-এর মাধ্যমে কাজগুলো করি। ব্র্যাকের এ-সংক্রান্ত কোনো গবেষণার প্রয়োজন হলে আমাদের কাজ দেয়।
ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলেন কি নিজের ইচ্ছায়?
হ্যাঁ। আমার মরহুম পিতৃদেব (গাজী শামছুর রহমান, বিখ্যাত আইনবিদ) ডাক্তারি পড়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি দেখলাম, ডাক্তারদের জীবন অত্যন্ত ঝামেলার। রাত ৩টার সময় রোগী ডাকছে। আজকে যেমন স্পেশালিস্ট ডাক্তার আছেন, চেম্বারে গিয়ে দেখাতে হয়; পঞ্চাশ-ষাটের দশকে তো তা ছিল না। ডাক্তার মানে সব কাজের ডাক্তার। কল দিলে তাকে রোগীর বাড়িতে যেতে হয়। আমার কাছে এটি একটি অবাস্তব অবস্থা বলে মনে হলো। অন্যদিকে ইঞ্জিনিয়ার যারা ছিলেন, তাদের জীবনটা খুব নিয়ন্ত্রিত-গোছানো। ৯টায় অফিসে যাচ্ছেন, ৫টায় আসছেন, জিপ চালাচ্ছেন। তাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আকৃষ্ট হলাম। ফলে পিতৃদেবের নিষেধ সত্ত্বেও বুয়েটে ভর্তি হলাম।
ভর্তি হলেন কীভাবে?
এখন খুব কষ্ট করে বুয়েটে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু ১৯৬৫ সালে ভর্তি পরীক্ষায় ৭০০ নম্বর আসত এইচএসসি থেকে। বাকি ৩০০ ভর্তি পরীক্ষা থেকে। এই ১০০০-এর মধ্যে ৫০০ পেলেই ভর্তি হওয়া যেত। আমার এইচএসসির নম্বর ৫০০-এর অনেক ওপরে ছিল। কাজেই বলতে গেলে প্রায় সরাসরি ভর্তি হলাম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বেছে নিলাম। চার বছর পড়ালেখা করেছি।
আপনার মেয়েরাও তো বুয়েটে পড়েছে।
আমার তিন মেয়েই বুয়েটে পড়েছে। বড় মেয়ে বুশরা নিশাত ইঞ্জিনিয়ার। আমার মতো পানি নিয়ে মাস্টার্স করেছে। এ মুহূর্তে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ, ঢাকায় থাকে। পরেরজন উজমা নিশাত, ইঞ্জিনিয়ারিং পাস। ওয়াটার ম্যানেজমেন্টে আমার মতোই পিএইচডি। কানাডায় থাকে, ওখানে একটা কনসাল্টিং কোম্পানিতে কাজ করে। ছোটজন সাজিয়া নিশাত পাস করেছে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স। আমেরিকায় কোম্পানিতে কাজ করে। আমার স্ত্রী ড. সামিনা সুলতানা, ইতিহাসের পিএইচডি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক হিসেবে অবসর নিয়েছেন। আমাদের বিয়ে ১৯৭১ সালে।
সাইক্লোন শেল্টার নিয়ে কাজ করার সময় ভোলার একেবারে দক্ষিণের চরফ্যাসন থানায় যেতাম। সেখানে ৮/৯ দিন থাকতাম। তখন গ্রামের লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি দেখেছি, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারলে, তাদের মতামত নিলে বহু কারিগরি সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়
চাকরিজীবনের শুরুটা কীভাবে?
বুয়েটে ভালো রেজাল্ট ছিল। শিক্ষক হতে পারতাম। কিন্তু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কী কারণে যেন শিক্ষক নির্বাচন পিছিয়ে গেল। তখন একটা প্রাইভেট ফার্মে যোগ দিলাম। আমার কাজ ছিল একটি বিরাট জুট মিল হবে, সেটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করা। কংক্রিটের যত কলাম-বিম ইত্যাদি আছে, সেগুলোর ডিজাইন করা ছাড়াও মাঠের কাজ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেবল বেরিয়েছি, মাঠের কোনো অভিজ্ঞতা নেই; কিন্তু তত্ত্বাবধান করতে হবে। কাজেই মনোযোগের সঙ্গে কাজ শিখেছি, যেটি পরবর্তী জীবনে আমাকে সুপারভিশনাল কাজ করতে সাহায্য করেছে।
এরপর তো পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করেছেন।
ছয় মাস পরে এটি ছেড়ে দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগ দিলাম। ১৯৭০ সালের জুন থেকে ১৯৭২-এর জুন পর্যন্ত ছিলাম। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ধীরস্থিরভাবে কাজ হয়। পানিবিজ্ঞানের সঙ্গে এখানে আমার পরিচয় ঘটে এবং পানির কাজে যে একজন প্রকৌশলীর নিজস্ব চিন্তা করার সুযোগ আছে, এটি এখানেই আমি প্রথম লক্ষ করি।
বুয়েটে যোগ দিলেন কবে?
১৯৭২ সালের জুন মাসে আমি প্রভাষক হিসেবে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (পুরকৌশল) বিভাগে চলে আসি। পরে পুরকৌশল ভাগ হয়ে পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ সৃষ্টি হয়। সম্ভবত ১৯৭৬ সালে আমাকে পানিবিজ্ঞান বা পানিসম্পদ কৌশল বিভাগে বদলি করা হয়। তখন থেকে নদী, নদীর পাড় ভাঙা, নদীর রক্ষণাবেক্ষণের কাজে আমি আগ্রহী হই। আমি এমএস করেছি পুরকৌশলে। স্ত্রী তখন ঢাকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের প্রভাষক। বুয়েটে বোর্ড অফিসের উল্টোদিকে ২১ নম্বর বিল্ডিংয়ের নিচতলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা পাই। আমার স্ত্রীরও সুবিধা হয়, কলেজ কাছেই। আমার কর্মক্ষেত্রও ওখানেই।
আপনি তো কমনওয়েলথ স্কলারশিপও পেয়েছেন।
শিক্ষক হলে পিএইচডি করতে হবে, এটাই নিয়ম। ‘কমনওয়েলথ স্কলারশিপ’-এর জন্য আবেদন করেছিলাম। কারণ এর সুবিধা হলো, পরিবারকে পাশে পাওয়া যায়। ১৯৭৭ সালে এই স্কলারশিপ পেলাম। তখন আমার দুটি কন্যাসন্তান। ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা চারজন ব্রিটেন চলে যাই। কমনওয়েলথ কমিশন আমাকে প্লেস করে গ্লাসগোতে স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটিতে। স্টাথক্লাইড মানে হলো ক্লাইড নদীর পাড়। বিশ্ববিদ্যালয়টি সত্যিই ক্লাইড নদীর কাছে। সেখানে ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নদীবিজ্ঞানে পিএইচডি কমপ্লিট করলাম।
নদী নিয়ে কাজের শুরু কীভাবে হলো?
বিদেশে যাওয়ার আগেই ১৯৭৬-৭৭ সালে আমাকে গবেষণার সুপারভাইজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। সে সময় ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশে কী ক্ষতি হতে পারে— এই মর্মে একটা সেমিনারে বলেছিলাম, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদী না থাকলে এই দেশ থাকবে না। এরপর ১৯৮২ সালে হঠাৎ করে ‘যৌথ নদী কমিশন’-এর সদস্য হওয়ার সুযোগ চলে আসে। এই সময়ে ভারতের সঙ্গে ১৯৮২, ১৯৮৫ ও ১৯৯৬-এর ‘পানিচুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। তিনটি চুক্তিতেই আমার কিছু ভূমিকা ছিল।
এত অল্প বয়সে?
হ্যাঁ। কেবল বিদেশ থেকে পিএইচডি করে এসেছি। কিন্তু সরকার বোধ হয় একজনকে খুঁজছিল, যিনি বাংলাদেশের পক্ষে জোর গলায় কথা বলতে পারবেন। আমাকে নির্বাচনের কারণটি ছিল আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারতাম। ছাত্র অবস্থায় বিতর্ক করতাম। যে চার বছর বুয়েটে পড়েছি, প্রতিবছর সাহিত্য সপ্তাহ, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছি। এগুলো গুছিয়ে কথা বলার জন্য আমাকে প্রস্তুত করেছিল। যুক্তির মাধ্যমে কীভাবে তথ্যকে স্থাপিত করতে হয় কিংবা অন্যের যুক্তিকে খণ্ডন করতে হয়, তার প্রশিক্ষণ নিজের অজান্তেই বুয়েটের শিক্ষাঙ্গনে পেয়েছি।
যৌথ নদী কমিশনে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?
এ ব্যাপারে দু-একটা কথা বলতে চাই। প্রথমত, যেকোনো সন্ধি আলোচনায় প্রতিপক্ষ কী বলতে চায়, তার যুক্তিটা কী— এটি অনুধাবন না করলে তাদের সঙ্গে তো আলোচনা করা যাবে না। কাজেই বুঝতে হবে তাদের অবস্থানটা কী? তারা কী বিষয়ে যুক্তি দেবেন? যুক্তিটার ভিত্তি কী? সেটি মোকাবিলা করতে হবে। আমি জোর গলায় দাবি করব, ভারতের সঙ্গে সন্ধি স্থাপনের আলোচনায় কারিগরি তথ্য কিংবা কারিগরি বিতর্কে ভারত কোনো সময়ই আমাদের কাবু করতে পারেনি। কারিগরি দিকটি আমি দেখেছি। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক শক্তিমত্তা অনেক। সামনে গঙ্গার পানি নিয়ে চুক্তির কথা আছে। চুক্তির আলোচনার বিষয়টি আগামী দু-এক মাসের মধ্যেই চালু হবে। মনে রাখতে হবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হচ্ছে কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে কারিগরি বিষয়টি যেন জোরালোভাবে আমরা উপস্থাপন করতে পারি, সে বিষয়ে দক্ষতা থাকতে হবে এবং সে বিষয়ে হোমওয়ার্ক করে এগোতে হবে।
আইইউসিএনে কীভাবে যুক্ত হলেন এবং কী কী কাজ করেছেন?
১৯৯৮ সালে বুয়েট থেকে বেরিয়ে আসি। তখন একটা নতুন ধরনের কাজ করার সুযোগ পাই। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পৃথিবীর অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার)’, সদস্যদের নিয়ে সে কাজ করে। বাংলাদেশের সদস্যদের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার হচ্ছে প্রথম সদস্য। কাজেই সরকারের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, প্রকৃতি সংরক্ষণ, জলাভূমি সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করার বিরাট সুযোগ পাওয়া যাবে। আমিও নতুন কিছু খুঁজছিলাম। আইইউসিএনে চলে এলাম। ১২ বছর ছিলাম। শেষ দুই বছর ছিলাম আইইউসিএনের এশিয়ায় অবস্থিত দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি জোরদার করার কাজে। তার আগের ১০ বছর ছিলাম দেশীয় প্রতিনিধি বা কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ। এই সময়ে অনেক কাজ করেছি। জলাভূমি সংরক্ষণ, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওরসহ বিভিন্ন জায়গা নিয়ে; সুন্দরবন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য জাতীয় পরিকল্পনা, মরুকরণ মোকাবিলার জন্য জাতীয় পরিকল্পনা, জলাভূমি সংরক্ষণের নীতিমালা, উপকূলীয় এলাকার একটা প্ল্যান করা যে তার ব্যবস্থাপনা কী হবে— এসব নীতিমালা ও কর্মকৌশল তৈরি করেছি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কী কাজ করেছেন?
১৯৮৭-৮৮ সালের বন্যার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক কাজ করি। বুয়েটে যখন শিক্ষক ছিলাম, তখন একটি বিরাট কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হই— ‘ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান’। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পানি ব্যবস্থাপনার মূল নির্দেশাবলি এ সময়ে তৈরি হয়। বাংলাদেশে প্রথম পানিসম্পদের মহাপরিকল্পনা তৈরি হয় ১৯৬৪ সালে, পরে ১৯৭২ সালে। এর পরই এই ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান বা বন্যা কর্মপরিকল্পনা তৈরি হয়েছে বর্ষার বন্যা বা শীতের খরা— দুটির ব্যবস্থাপনারই দিকনির্দেশনা তৈরি করে।
সাইক্লোন শেল্টার নিয়েও তো আপনি কাজ করেছেন?
এটিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ। ১৯৯১ সালের সাইক্লোনের পর শেল্টারের একটা মহাপরিকল্পনার কাজ বিশ্বব্যাংক বুয়েটকে দেয়। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে কাজটি করা হয়। আমি মূল পরিকল্পনা অংশটি তত্ত্বাবধান করতাম। এ সময় উপকূলের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ডিজাইনের দিকনির্দেশনা তৈরি করতে ভোলার একেবারে দক্ষিণের চরফ্যাসন থানায় যেতাম। সেখানে ৮/৯ দিন থাকতাম। তখন গ্রামের লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি দেখেছি, স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারলে, তাদের মতামত নিলে বহু কারিগরি সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়।
আমরা বাংলাদেশের উপকূল এলাকায় সাইক্লোন শেল্টারের ডিজাইন কী হওয়া উচিত, কোথায় কোথায় বসালে সবচেয়ে ভালো হবে, কীভাবে পরিচালনা করতে হবে— এসব বিষয়ে পরামর্শ দিই। আমরা হিসাব করে দেখলাম, বছরে দু-তিনবার সাইক্লোন হয়। তাতে একবার পাঁচ দিন ধরলে মোট ১৫ দিন শেল্টার দরকার। কাজেই আমি আলাদা শেল্টার বানিয়ে রাখলে ১৫ দিন ব্যবহার হলো, বাকি ৩৫৫ দিন ব্যবহার হলো না, এর দরকার নেই। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে যদি শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ডিজাইন করি, তাহলে ভালো। স্ট্রাকচারাল ডিজাইনটি ছিল ওরকম, যাতে মানুষ সহজে উঠতে পারে। ব্যবস্থাপনায় থাকবে স্কুল কমিটি, তারা দেখাশোনা করবে। আমরা যে পরামর্শ দিয়েছিলাম, মোটামুটি সেটি ধরেই এখনো কাজ হচ্ছে।
যমুনা ও পদ্মা সেতু তৈরির অভিজ্ঞতা কেমন?
আমি বুয়েটে থাকার সময় যমুনার সেতুর কর্মকাণ্ড শুরু হয়। সাতজন বিদেশি, সাতজন দেশি বিশেষজ্ঞ ঠিক করা হয়েছিল প্রথমে। বিদেশিরা নামকরা অধ্যাপক। কিন্তু প্রায়ই দেখা যেত, তাদের সঙ্গে আমাদের মতের মিল হচ্ছে না। কারণটা হচ্ছে, বাংলাদেশের নদীকে তো আমরা বুঝি। টেমস নদীর পাড়ের বিশেষজ্ঞ তো আমার নদীকে বোঝে না। তাই না? ফলে যখন দ্বন্দ্ব শুরু হয়, তখন বিশ্বব্যাংক সরকারের সঙ্গে বসে একটা পাঁচ সদস্যের প্যানেল অব এক্সপার্ট তৈরি করে। তাতে বাংলাদেশ থেকে ছিলাম আমি আর অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এবং একজন করে আমেরিকান, জাপানিজ ও নেদারল্যান্ডসের এক্সপার্ট। আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত সরকার তথা বিশ্বব্যাংক মেনে নিত। তখন আমি এর মনিটরিং, ডিজাইন চেক করার কাজে জড়িত হই। তাতে আমারও জ্ঞানের পরিধি বাড়ে। পরে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্যও প্যানেল অব এক্সপার্ট গঠন করা হয়েছিল। তখনো ইন্টারন্যাশনাল প্যােনলের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিলে জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে আমরা ছয়-সাতজন মিলে পুরো প্রকল্পটা সুপারভাইজ করেছি।
এখন কী করছেন?
এখন সরকার যেসব মেগা প্রকল্প করছে, তার সঙ্গে নদীর সম্পর্ক থাকলে আমি জড়িত হচ্ছি। জলাভূমি, নদী নিয়ে কাজ করছি। বুয়েট কিংবা পিএইচডি করার সময় গ্লাসগো থেকে যা যা বিষয় পড়েছি, তার বাইরে বহু বিষয়ে আমাকে দক্ষতা অর্জন করতে হয়েছে। নতুন বিষয় আমাকে সবসময় আকর্ষণ করে।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ছিলেন। এখন ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে আছেন। কেমন লাগছে এই জীবন?
২০১০ সালে আইইউসিএন থেকে অবসর নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি। আমার আগে ছিলেন শ্রদ্ধেয় জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনিও আমার বুয়েটের শিক্ষক। একসঙ্গে অধ্যাপনাও করেছি। আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। বুয়েট যেভাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলে, সেই কাঠামোতে ফেলেই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তুলেছিলেন। ওই নিয়মাবলিই সামনে রেখে, ওই পদ্ধতিগুলো ভিত্তি করেই ব্র্যাকের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমি শক্তিশালী করি। ২০১৪ সালে আমার কার্যকাল শেষ হয়। আমি বিশ্বাস করি, এখানে নিয়মগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। আমি যখন চলে আসি, তখন ছাত্র ছিল হাজার তিনেক। এখন ১৭ থেকে ১৮ হাজার। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা, শিক্ষক নির্বাচন, পরীক্ষা, ফলাফলে আমার তৈরি নিয়ম এখনো চলছে।
মা-বাবার কথা মনে পড়ে?
আমার মা জামাল আরা রহমান বাবার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগ পর্যন্ত তখনকার দিনের নামকরা ছাত্রী ছিলেন। চল্লিশের দশকে ম্যাট্রিক পাস করেন; গণিতে দুটি মেডেল পান। লেডি ব্র্যাবোর্নে বিএসসি পড়তেন। মা মারা যাওয়ার পর তার বিভিন্ন ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ভাইবোনরা নিয়ে গেছে। আমি শুধু তার মেডেল দুিট রেখেছি।
আমার লেখাপড়া যতটুকু হয়েছে, মায়ের জন্য হয়েছে। মা-ই অঙ্ক, ইংরেজি শেখাতেন। বাবা এমএতে ইংরেজি ও আইন— দুটিতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। অত্যন্ত পরিশ্রমী ও জ্ঞানী। অনেক বই লিখেছেন। তার যে গুণাবলি ছিল, তার কিছু পেলে আমি আরও বিখ্যাত হতে পারতাম। মা-বাবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে কথা শেষ করছি।
(১৭ জুন, ২০০৭, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা)





