ভিড়ভাট্টা না থাকলে ঢাকা আরও সুন্দর হইত

ঢাকার বিখ্যাত সুব্রত আলী বাবুর্চিখানায় রান্নার কাজে ব্যস্ত কাজল বাবুর্চি । ছবি: লেখক
বিশাল সাইজের ডেকচিতে রান্না হচ্ছে বিরিয়ানি, সাদা পোলাও অথবা চিকেন রোস্ট। নানা ধরনের বাটা মসলার পাহাড় জমে উঠেছে বড় বড় ডালায়। ডালায় স্তূপ হয়ে আছে কাটা পেঁয়াজ, রসুন। রান্নার সুঘ্রাণ আর কাঠ-কয়লার আগুনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে পুরো জায়গাটা। বিশাল এক বাবুর্চিখানায় রান্না হচ্ছে বিয়েবাড়ির সুস্বাদু খাবার আর পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করেন কাজল বাবুর্চি। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকার বিখ্যাত সুব্রত আলী বাবুর্চির রান্নাঘরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোহাম্মদ জসিম ওরফে কাজল। বিয়েবাড়ির রান্নায় এক বিখ্যাত নাম সুব্রত আলী বাবুর্চি। এই শহরে তার রান্নার ব্যাপক সুখ্যাতি। মানুষটি প্রয়াত হয়েছেন আরও কয়েক বছর আগে। তার রসুইখানা অথবা ক্যাটারিং সার্ভিসের সেনাপতির দায়িত্ব হাতবদল হয়ে কাজল বাবুর্চির কাছে পৌঁছেছে।
কাজল ঢাকায় এসেছিলেন ২২ বছর আগে। গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায়। রান্নায় কাজলের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। হাতেকলমে রান্নার কাজ শিখেছেন। এক বন্ধু তাকে এই বাবুর্চিখানায় কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল রান্নাঘরের সহকারী হিসেবে। সেখান থেকে একটু একটু করে অগ্রসর হয়েছেন কাজল।
কত হাজার বিয়েবাড়ির রান্না করেছেন নিজের হাতে কাজল বাবুর্চির মনে করে বলতে পারেন না। এ শহরের উত্তরা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন তিনি। স্ত্রী আছে, দুটি সন্তান আছে। ২২ বছর ধরে ব্যক্তিগত শহরবাসের গল্প কখনোই খারাপ লাগেনি কাজলের।
‘ঢাকা শহর আমারে জায়গা দিসে, এখানেই কাজ শিখসি। এই শহরটারে আমার খারাপ লাগে না। অনেকের কাছে ঢাকা ভালো লাগে না। তারা চইলা যাইতে চায় এখান থেইকা। যারা গেরামে ফিরা যাইতে চায় তাদের কাজের সুযোগ আছে, আয়-ইনকামের জায়গা আছে। আমি এই কাজটাই মন দিয়া শিখছি; মানুষের জন্য রান্না করা, তাগো খাওয়াইতে আমার ভালো লাগে।’
বিয়েবাড়ির রান্নার কাজটা উপভোগ করেন কাজল। তার দিনরাতের বেশিরভাগ সময় এ ক্যাটারিং সার্ভিসের রান্নাঘরেই কেটে যায়। তার ভাষায়, যারা এ ধরনের রান্নার কাজ করে তাদের বাইরে কোথাও যাওয়া অথবা ঘোরাঘুরি করার সুযোগ থাকে না। কারণ এ ধরনের রান্নার কাজ একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে জড়িত না করলে রান্না ভালো হবে না।
‘আপনার অবসর সময় কাটে কীভাবে?’ জানতে চেয়েছিলাম কাজলের কাছে।
কাজল তার মতো খুব সহজ কথায় বললেন, ‘আসলে এই ধরনের কাজ যারা করে তাদের কোথাও যাওয়া বা অবসর বইলা কোনো আলাদা টাইম থাকে না। সারা দিন ধইরা কিছু না কিছু কাজ থাকে। ব্যস্ততার জন্য চাইলেও অনেক কিছু করা হয়ে ওঠে না।’
তবে কাজলের অভিযোগও আছে ঢাকা শহর নিয়ে। এখানে অনেক ভিড়, অনেক মানুষ। মানুষের এত ভিড় না থাকলে শহরটা আরও সুন্দর হতে পারত। যখন প্রথম এই শহরে পা রেখেছিলেন, তখন ঢাকা অনেক ছিমছাম একটা শহর ছিল।
তাহলে কি ঢাকার চাইতে কম ভিড়ের সুন্দর কোনো জায়গায় চলে যেতে চান তিনি? প্রশ্নটা শুনে হেসে জানালেন, ঢাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কথাও তিনি ভাবেন না। সবকিছু মিলে ঢাকাই তার কাছে প্রিয় শহর।




