নীলক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ

ছবি: শামীম-উস-সালেহীন
ব্যস্ত শহরের গিজগিজে ভিড় আর ডিজিটাল স্ক্রিনের আসক্তিতে যখন মানুষের মন আজ দিশাহারা, তখন পুরনো বইয়ের গন্ধমাখা নীলক্ষেত আজও ধরে রেখেছে আমাদের চিন্তার জগৎ ও শিকড়ের টান। গাড়ির হর্ন আর কোলাহল পেরিয়ে বইয়ের পাতার আড়ালে রবীন্দ্রনাথময় কৈশোর, নীলক্ষেতের বিচিত্র ইতিহাস, নস্টালজিয়া এবং বদলে যাওয়া সময়ে দাঁড়িয়ে এক অন্যরকম নীলক্ষেতকে খুঁজে ফেরার না বলা কথা লিখেছেন আশরাফুল হক রাজীব
মকবুল মিয়া ডাকলেন। কানের কাছে মুখ আনতেই নাকে এলো বিড়ির আঁশটে গন্ধ। গন্ধটা হজম করার আগেই ফিসফিস করে বললেন— ‘রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে আছেন কোনায়। পাশেই নজরুল। যাও, দেখো।’
ঘোরের মতো মনে হলো। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কোথায়? কী আবোল-তাবোল কথা! তবে সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা জীবনী ছিল। আবছা মনে পড়ে, তা ছিল প্রশান্তকুমার পালের লেখা। তার পাশেই নজরুল রচনাবলি। আরও অনেক পুরনো বইয়ের ভিড়ে বই দুটি পাশাপাশি দাঁড় করানো ছিল।
পরে বুঝেছিলাম, মকবুল মিয়া আসলে কী বলেছিলেন। লেখক বইয়ের পাতায় থাকেন। তার ভাবনা, স্বপ্ন— সব মিশে থাকে অক্ষরে অক্ষরে। সেদিন নীলক্ষেতের সেই ছোট্ট বইয়ের দোকানে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে আমি দেখতে পাইনি। দেখেছিলাম তাদের বই। বইয়ের আড়ালে দুজনকেই দেখেছিলেন মকবুল মিয়া। রবীন্দ্রনাথ এখনো দাঁড়িয়ে আছেন নীলক্ষেতে।
মকবুল নীলক্ষেতের বই বিক্রেতা ছিলেন। আমাকে বই পড়তে দিতেন। বই পড়তে দেওয়া মানে শুধু বই হাতে তুলে দেওয়া নয়। তিনি আসলে আমাকে চিন্তার জগতে ঠেলে দিতেন। তিনি বই বিক্রি করতেন ঠিকই, কিন্তু নিজেও ছিলেন একটা বই।
মকবুল মিয়ার সঙ্গে এ ঘটনা ১৯৮৬ সালের। সেবার মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল। রাতে খেলা দেখে দুপুরে চলে যেতাম নীলক্ষেত। তখনো ফুটপাত হয়নি। চট বিছিয়ে পুরনো বই বিক্রি হতো। উল্টেপাল্টে দেখা দোষের কিছু ছিল না। কাঙ্ক্ষিত বইটি পেতে খানিক অপেক্ষা। এরপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পড়া। গাড়ির হর্ন, বাসের গর্জন— সমস্যা কী? স্ট্রিটলাইটের আলোই যথেষ্ট। যেন ‘শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।’
অদৃশ্য এক সুতোর টান। অদ্ভুত এক নেশার নাম নীলক্ষেত। রুটিন জীবনের ফাঁকে নীলক্ষেতে নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া। হইচই নাগরিক ব্যস্ততায়ও নিমেষহীন বই পড়া। মধ্যদিনের পাঠক। টিপটিপ দিনভর বৃষ্টি। শীতের সন্ধের মিয়ানো আলোয়ও অক্ষর খোঁজা। তপ্ত রোদেও ভ্রুক্ষেপ নেই। মনের ওঠানামা বইয়ের পাতায়।
নতুন বই দেখে বিস্ময়ের সীমা নেই। বই দেখেও প্রসন্ন হওয়া যায়। নীলক্ষেত সেই আনন্দের ঠিকানা।
উসকানোর লোকের অভাব ছিল না। লটবহরসুদ্ধ হাজির। নিমেষে ভ্যানিশ মানিব্যাগের মানহীন পুঁজি। ছোট দুটি ডালপুরি— ইতালিক হোটেলের বেঁচে যাওয়া ঝোলে চুিবয়ে খাওয়ার স্বাদ এখনো চোয়ালে। সঙ্গীদের পটিয়ে হয়তো ঝুটত ঝালমুড়ি। বোম্বাই মরিচ আর এলাচি লেবুর মাতাল করা গন্ধ মেশানো ওই মুড়িটুকুন খাওয়া চলত তুমুল হুল্লোড়ে। তখনো শুরু হয়নি তীব্র কৃত্রিম গন্ধের তেহারি বিক্রি।
চারপাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বুয়েট, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল— হাল আমলে আরও যুক্ত হয়েছে। নীলক্ষেত গড়ে উঠেছে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনেই। একটা জায়গাতেই মনীষা কেন্দ্রীভূত। সেই হিসেবে বনেদিপাড়া। যা শুধু বাজার নয়, সাহিত্য শিক্ষা সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র।



