রূপলাল হাউজ

ছবি: লেখক
মুঘল রাজধানী ঢাকার বয়স ৪০০ বছর। অষ্টাদশ শতকে পৃথিবীর সেরা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বাদশ। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ঢাকার প্রাচীন নাম ছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর’। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জাতির মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এ শহরে ছুটে এসেছিলেন। তবে নানা কারণে সবার ভাগ্য পরিবর্তিত হয়নি; যার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ঢাকাসহ এ উপমহাদেশের বৈরী আবহাওয়া। কম বয়সেই এখানে অনেকে মারা যেতেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ফিরে যেতেন নিজ দেশে।
তা সত্ত্বেও অনেকে এখানে বসবাসের জন্য বিলাসবহুল অট্টালিকা ও বিপুল বিত্ত গড়ে তুলেছিলেন। আঠারো শতকে নির্মিত তেমনই একটি অট্টালিকা হলো ‘রূপলাল হাউজ’। অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি এ ভবনটি আজ ধ্বংসের মুখে। সনাতন দাস, রূপলাল দাস ও রঘুনাথ ছিলেন ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এবং জমিদার। এ তিন ভাই পৃথক হয়ে যাওয়ার পর রূপলাল ও রঘুনাথ ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরে নিজেদের বাড়িতে চলে যান। রঘুনাথের বাড়ির পাশেই ছিল ‘রূপলাল হাউজ’। তবে এ মূল বাড়িটি ছিল ঢাকার বিখ্যাত আর্মেনীয় জমিদার ও ব্যবসায়ী আরাতুনের।
রূপলাল আরাতুনের কাছ থেকে বাড়িটি কিনে নেন এবং কলকাতার বিখ্যাত ‘মার্টিন অ্যান্ড বার্ন কোম্পানি’কে (মার্টিন কোম্পানি) দিয়ে পুনর্নির্মাণ করান। এ বাড়ির দুটি বিশেষত্ব ছিল। প্রথমত, গ্রিক স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত এর বিশাল ডরিক কলাম— ঢাকার অন্য কোনো এলাকায় এমন ডরিক কলামসংবলিত ভবন সচরাচর দেখা যায় না। দ্বিতীয়ত, ভবনের ওপরের মাঝখানে একটি বিশাল ঘড়ি ছিল, যা বুড়িগঙ্গা নদীতে চলাচলকারী সব নৌযান থেকে স্পষ্ট দেখা যেত এবং এর সাহায্যে সময় জানা যেত। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ভবনের চূড়াটি ভেঙে পড়ে এবং ঘড়িটিও নষ্ট হয়ে যায়।
রূপলাল হাউজের একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল ১৮৮৮ সালে, যখন ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন সরকারি সফরে ঢাকায় এসেছিলেন। সেই সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ঢাকায় পদার্পণ করেন। লর্ড ডাফরিনকে আপ্যায়ন করার জন্য ইংরেজরা একটি
ডাফরিনের বলনাচের জন্য ইংরেজরা রূপলাল হাউজ দুদিনের জন্য দুইশ টাকায় ভাড়া নিয়েছিল
বলনাচের (Ball dance) আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়। নাচ ও আপ্যায়নের সুদৃশ্য স্থান নির্বাচনের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয় তৎকালীন আহসান মঞ্জিল ও রূপলাল হাউজের মধ্যে। ভোটের মাধ্যমে রূপলাল হাউজ নির্বাচিত হয়। ডাফরিনের বলনাচের জন্য ইংরেজরা রূপলাল হাউজ দুদিনের জন্য দুইশ টাকায় ভাড়া নিয়েছিল। তবে লর্ড ডাফরিনকে অভ্যর্থনা জানাতে ভবনটি সাজাতেই তৎকালীন সময়ে মালিকদের খরচ হয়েছিল প্রায় ৪৫ হাজার টাকা!
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রূপলালের উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি বিনিময় করে কলকাতায় চলে যান। এরপর থেকেই ভবনটির জৌলুশ কমতে থাকে। রূপলাল হাউজ বর্তমানে সরকারি সম্পত্তি। অথচ ঢাকার বুকে এমন চমৎকার ও ঐতিহ্যবাহী একটি দেখার মতো অট্টালিকা অবহেলা এবং ভূমিদস্যুদের দখলের কারণে মসলার গুদামে পরিণত হয়ে আজ ধ্বংসের পথে। যতবারই ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে এই দৃশ্য দেখেছি, ততবারই ঐতিহাসিক এ নিদর্শনের করুণ দশায় মন বিষাদে ভরে উঠেছে।




