ঢাকার হারিয়ে যাওয়া পেশা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
৪০০ বছর আগে সুবেদার ইসলাম খানের হাত ধরে রাজধানী হওয়া ঢাকা আজকের রূপ পেতে অসংখ্য মানুষের শ্রম ও ঘাম চুকিয়েছে। কালের গর্ভে রাজপথের মোটরযান, ঘরের বিদ্যুৎ কিংবা পাইপলাইনের পানি থাকলেও হারিয়ে গেছে কোচোয়ান, ভিস্তিওয়ালা, মশালচি বা ডাকহরকরার মতো অসংখ্য বিচিত্র পেশা। ইতিহাসের পাতা থেকে ঢাকা শহরের হারিয়ে যাওয়া সেসব পেশাজীবীর জীবন ও অবদানের গল্প তুলে ধরেছেন সাজিদ রহমান
রোম একদিনে তৈরি হয়নি, আজকের ঢাকাও নয়। আগে ঢাকা ছিল সুলতানি শাসকদের একটি স্থাপনা। ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। এটা সেই সময়ের গল্প যখন কোনো শিল্পবিপ্লব ঘটেনি। ঢাকার রাজপথে রেলপথের বিস্তার হয়নি। তখনো মোটরযান রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ানো শুরু করেনি, ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলেনি। পাইপলাইনে পানি সরবরাহ কিংবা রান্নার গ্যাস তখনো কল্পনারও অধিক। কল্পনায় যদি চারশ বছর পেছনে যাই, আমরা দেখতে পাব সেই সময়ের ঢাকার। সাক্ষাৎ মিলবে অনেক পেশার মানুষের সঙ্গে, যারা সময়ের অতলে হারিয়ে গেছে।
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। বুড়িগঙ্গার ওপর হালকা কুয়াশা। সদরঘাটে ভিড়ছে একটি বড় পালতোলা নৌকা। দূর গ্রামের মানুষ, কাঠের গুঁড়ি, পিতলের পাত, সরিষার বস্তা, মাটির দলা, শঙ্খের বোঝা, সুগন্ধি কাঠ— সব একসঙ্গে এসে থামে ঢাকার বুকে। মানুষের মাঝে আনন্দের শেষ নেই। ততদিনে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে ঢাকা পেয়েছে রাজধানীর মর্যাদা। ঘাটে অপেক্ষায় থাকে কুলি আর গাড়োয়ান। মালপত্র নামিয়ে কেউ কাঁধে তুলে নেয়, কেউ আবার ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে দেয়। কোচোয়ান উঠে বসে টমটমে, ঘোড়াকে ইশারা করতেই চলা শুরু করে। ফজরের আজানে আধজাগা শহর ঘোড়ার টগবগ শব্দে পুরোপুরি জেগে ওঠে। সদরঘাট থেকে ইসলামপুর, লক্ষ্মীবাজার, শাঁখারীবাজার, চকবাজার— একেকটি রাস্তা ধরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে হরেকরকম রসদ। লক্ষ্মীবাজারের এক সরু গলিতে কাঁসারির ভাটিতে আগুন জ্বলে উঠেছে। সদ্য আসা পিতলের পাত গলিয়ে তিনি বানাবেন থালা, বাটি, কলস আর প্রদীপ। একটু দূরে কামারের হাতুড়ির ছন্দে তৈরি হচ্ছে বঁটি, ছুরি আর লাঙলের ফলা। সেই ছুরিই পরে ধার দেবে ভ্রাম্যমাণ ছুরি-ধার কারিগর, যে কয়েক দিন পরপর অলিগলি ঘুরে ডাক দেবে— ‘লাগে ছুরি-কাঁচি ধার... লাগে...।’
শাঁখারীবাজারে পৌঁছেছে সমুদ্রপাড় থেকে আসা শঙ্খ। কারিগর শঙ্খ কেটে, ঘষে, পালিশ করে তৈরি করছেন শাঁখা। বধূর হাতে হাতে তা শোভা পাবে, পূজার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে মিশে যাবে তার সুর। মাটির গাড়ি চলে গেছে কুমোরপাড়ায়। সেই মাটি থেকে তৈরি হবে কলস, হাঁড়ি, প্রদীপ। তৈরি হবে হরেকরকমের রঙিন পুতুল। সরিষার বস্তা পৌঁছেছে তেলওয়ালার ঘানিতে। বলদ ঘুরছে, ঘুরছে ঘানি, বেরিয়ে আসছে সরিষার তেল। সেই তেল যাবে রান্নাঘরে, আবার সেই তেলেই সন্ধ্যায় জ্বলবে প্রদীপ। ঘুটঘুটে অন্ধকার শহরে যে আলোর দরকার, সেই আলোও যেন জন্ম নিচ্ছে এ ঘানির ভেতরেই। সকালের রোদ চড়তেই ভিস্তিওয়ালা চামড়ার মশক কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তখনো কোনো বাড়িতে পানির কল নেই। সে ঘাট থেকে পানি তুলে এনে পৌঁছে দিচ্ছে বাড়ি, দোকান আর সরাইখানায়। এ পানিতে ঠান্ডা হয় কারিগরের ভাটি, এ পানিতে মেটে পথিকের তৃষ্ণাও। এদিকে ডাকহরকরা ছুটে চলেছে এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লায়। তার থলিতে জমিদারের চিঠি, বেপারির হালখাতার দাওয়াত, জজ কোর্টের নোটিস, দূর গ্রামের খবর। তিনি জানেন না চিঠিতে কী লেখা আছে, কিন্তু তার পথচলাতে শহরের সম্পর্কগুলো বেঁচে থাকে। দুপুরের পর আরমানিটোলার বণিক-বাড়ি থেকে বের হয় পালকি। চারজন বেহারা কাঁধে তুলে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। গ্র্যান্ড এরিয়া থেকে হয়তো কোচোয়ানের টমটম ছুটছে কুমারটুলী, আলীনেকি দেউড়ি কিংবা বেগমবাজারের দিকে।
বিকালের দিকে জমে উঠেছে প্রতিদিনের বাজার। আতরের দোকান থেকে ভেসে আসছে গোলাপ আর খাসের সুগন্ধ। কাঁসার দোকানে নতুন বাসনের ঝনঝন শব্দ। তাঁতির বোনা কাপড়ের দরদাম করছে দূর গাঁও থেকে আসা খুচরা বেপারি। কুমোরের প্রদীপ কিনে নিচ্ছে কেউ, কেউ আবার শাঁখারির দোকানে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা করছে। অবশেষে সন্ধ্যা নেমে আসে। মশালচি একে একে জ্বালিয়ে দিচ্ছে রাস্তার বাতি। প্রদীপের আলো পড়ে কাঁসার থালায়, টমটমের চাকার পাতে পড়ে চকচক করে। সেই আলোকপ্রভা পালকির ফাঁক গলে পৌঁছায় অন্দরের নারীর কপোলে। দিন-মাস পেরিয়ে আসে পৌষের শেষ দিন। সদরঘাটে ভিড়ে নৌকা। এবার তার বোঝায় রঙিন কাগজ, বাঁশের কঞ্চি আর সুতা। সেখান থেকে পৌঁছে যায় ঘুড়ি নির্মাতাদের হাতে। দিন-রাত পরিশ্রম করে তারা বানায় শত শত ঘুড়ি। শিশু, কিশোর, যুবক কিংবা অশীতিপর বৃদ্ধ, সারা বছর ধরে অপেক্ষায় থাকে এ সময়টার জন্য। সাকরাইনের সকালে ঢাকার ছাদে ছাদে আকাশ জুড়ে রঙিন ঘুড়ি ওড়ে। আকাশটা হয়ে ওঠে যেন ফ্রাঁসোয়া বালতাজার সলভিন্সের আঁকা চিত্র।
আজকের এই ঢাকা কোনো একক মানুষের সৃষ্টি নয়। এটি গড়ে উঠেছে কোচোয়ান, শঙ্খশিল্পী, কাঁসারি, ভিস্তিওয়ালা, মশালচি, বেহারা, তেলওয়ালা, ডাকহরকরা, সূত্রধরসহ অসংখ্য হাতের স্পর্শে, অসংখ্য পেশার পরস্পর নির্ভরশীল শ্রমে। আজ তারা নেই, নেই তাদের স্মৃতিচিহ্নও।




