গল্পের ধাঁধা
গোল্ডেন বল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আপনি ফুটবলও খেলতেন নাকি?
নাবিহা এবার চমকালো না। গত তিন দিনে এতবার এই প্রশ্ন শুনেছে যে এখন কারও সঙ্গে দেখা হলে নিজেরই আগ বাড়িয়ে বলতে ইচ্ছা করে— জি, আমি ফুটবল খেলেছি।
ফিরে তাকিয়ে প্রশ্নকর্তাকে চিনতে পারল নাবিহা। ঢাকার এক পত্রিকার বিনোদন সাংবাদিক তুহিন আরশাদী। আগে নাকি টুকটাক টিভি ফিকশনও বানিয়েছে। এখন সিনেমা নিয়ে লেখালেখি করে। ফুটবল নিয়ে একটা তথ্যচিত্রের শুটিংয়ে তার কী কাজ, সেটি ঠিক বুঝতে পারছে না নাবিহা। অবশ্য নাবিহার মতো ক্রিকেট কোচেরও তো এখানে থাকার কথা ছিল না।
মেয়েদের প্রিমিয়ার লিগ শেষ। দল এবার খুব একটা ভালো করেনি। পরের টুর্নামেন্টের আগে মাসখানেকের ব্রেক আছে। ভেবেছিল, লিগের ব্যর্থতা ভুলতে বাসায় কিছুদিন ঝিম মেরে পড়ে থাকবে। বই-টই পড়বে, কাছে-পিঠে কোথাও থেকে ঘুরে আসা যায়। এর মধ্যে ক্রিকেট বোর্ডের নারী উইং পরিচালকের ফোন। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে ডকুমেন্টারি বানাচ্ছেন এক নির্মাতা। শুটিং হবে ঢাকার বাইরে। ওদের এমন একজনকে দরকার, যে খেলাটা ভালো বোঝে। ডকুমেন্টারির বাজেট ভালোই। দিন পনেরো কাজ করলে হাজার পঞ্চাশেক টাকা পাওয়া যাবে। নাবিহার অনেক দিনের ইচ্ছা অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকে যাওয়ার। কিন্তু আজকাল যা খরচ বেড়েছে! হঠাৎ পাওয়া সুযোগটা তাই হাতছাড়া করতে চাইল না সে।
ফুটবল-ক্রিকেট দুটোই খেলত নাবিহা। পরে অবশ্য ক্রিকেটটাকেই সিরিয়াসলি নেয়। শুরুটাও ছিল দুর্দান্ত। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের ভবিষ্যতের অলরাউন্ডার ধরা হচ্ছিল তাকে। কিন্তু মাত্র ১৭ ওয়ানডে আর ১৩ টি-টোয়েন্টিতেই শেষ নাবিহার ক্যারিয়ার। টানা হ্যামস্ট্রিং চোট তাকে চিরদিনের জন্য খেলার ক্যারিয়ারে ইতি টানতে বাধ্য করেছে। খেলা ছাড়ার মাস দুই পরেই লেভেল টু কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে যায়। লেভেল ওয়ান আগেই করা ছিল। কোচিংয়ের প্রথম বছরই অখ্যাত ‘আমরা পারব’ ক্লাবকে প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন করে নাবিহা। বেশ নামডাকও হয়েছে।
কোচিংয়ের বাইরে প্রিয় কাজ ঘোরাঘুরি, বই আর সিনেমা। আরেকটা ঠিক প্রিয় কাজ না, কিন্তু নিয়তির ফেরে নিয়মিতই সেটির সঙ্গে জড়াতে হয়ে তাকে। রহস্যভেদ।
নাবিহা যেখানেই যায়, কীভাবে যেন সেখানেও একটা রহস্য এসে হাজির হয়। তবে নাবিহা এবার নিশ্চিত, সিনেমার শুটিংয়ে তেমন কিছু ঘটবে না। প্রথম দুদিন তাই হচ্ছিল। একেবারেই নিরুত্তাপ।
শুটিং চলছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী একটা গ্রামে। একটা স্কুলমাঠে ক্যাম্প। পাশেই বিশাল মাঠ। এরপর জঙ্গল, সীমানা পড়েছে এই জঙ্গলের মধ্যেই। মাঠে আর গ্রামের নানা জায়গায় হচ্ছে শুটিং। নাবিহা খেলার টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে পরামর্শ দিচ্ছে।
আগ বাড়িয়ে আলাপ করতে আসা এই বিনোদন সাংবাদিক তার ভূয়সী প্রশংসা করেই যাচ্ছে। অসহ্য লাগছিল। এমন সময়ই ইউনিটে শুরু হলো হট্টগোল, ‘বল কই গেল?’
শুটিং ইউনিটের জিনিসপত্র হারানো আশ্চর্য কোনো ঘটনা নয়। তবে ফুটবল নিয়ে শুটিংয়ে পরপর দুদিনে পাঁচটা বল হারানো রীতিমতো অস্বাভাবিক। বলের অভাব নেই। কয়েক ডজন বল আছে। কিন্তু বলগুলো যাবে কোথায়? এগুলো তো আর গোল্ডেন বল না, সাধারণ ফুটবল।
নাবিহা আর বেশি ভাবতে পারল না, কারণ আরশাদী আবার আলাপ শুরু করল।
‘আপনি যে রহস্য নিয়ে মাথা ঘামান, সেটি কিন্তু আমি জানি। সিনেমার কারবার হলেও খেলার খবরও ভালো রাখি। বল রহস্য সমাধান করবেন নাকি?’ এখন তার মনে হচ্ছে, ছেলেটাকে যতটা বিরক্তিকর ভেবেছিল, সে আসলে ততটা বিরক্তিকর নাও হতে পারে। এটি নাবিহাকে করা প্রশংসার জন্য নাকি দূষণহীন বাতাসের প্রভাব বলা মুশকিল।
চলেন, ‘জঙ্গলের দিকটা ঘুরে আসি’, প্রস্তাবটা দিল নাবিহাই।
‘তা যাওয়া যায়, সীমান্ত এখন শান্ত।’ খুশিমনে বলল আরশাদী।
হাঁটতে হাঁটতে নাবিহা বলল, ‘একটা বিষয় খেয়াল করেছেন, শুটিংয়ের সময় ফ্রি কিকের অনেক বলই জঙ্গলে এসে পড়েছে। একটাও পরে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
‘ও, এই তাহলে আপনার জঙ্গলে আসার কারণ? এটা আমিও ভেবেছি কাল রাত্রে। পরে মনে হলো এটি স্বাভাবিক, মাঠটা এত ছোট যে একটু জোরে কিক করলেই জঙ্গলে চলে যায়। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এখানে রেগুলার যারা খেলে, তাদের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটে।’
‘সেটি আমিও বুঝেছি। কিন্তু বল খুঁজে পাওয়া যাবে না কেন?’ বলল নাবিহা।
আরশাদীর উত্তরও তৈরি ছিল, ‘পাওয়া যাবে না কেন। সেভাবে তো খোঁজাই হয় না। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সীমান্ত। একটা সময়ে এই জঙ্গল চোরাকারবারিদের আস্তানা ছিল। ভয়ে আসলে জঙ্গলটা এড়িয়ে চলে স্থানীয় মানুষ। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, জঙ্গলের মধ্যে কেউ বল মারলে তাকে পরের তিন ম্যাচে টিমে নেওয়া হবে না— এমন নিয়ম ছিল একসময়।’
নাবিহা বলল, ‘সবই বুঝলাম, কিন্তু বল গায়েব।’
‘মানে? অবাক হয়ে প্রশ্ন করল আরশাদী।’
‘আমি ভোরবেলা জঙ্গলে ঢুকেছিলাম। মাঠের পশ্চিম পাশ থেকে ফ্রি কিক নিলে সম্ভাব্য যেসব জায়গায় বল যাবে, সব জায়গা খুঁজে দেখেছি। নেই। বরং পুরনো বল দেখেছি কয়েকটা।’
‘বলেন কি! এই জঙ্গলে আপনি ভোরবেলা একা একা এসেছিলেন’— আরশাদীর বিস্ময় কাটছেই না।
ততক্ষণে বেলা পড়ে আসছে। হঠাৎ নাবিহা তাড়া দিল, ‘চলুন তো, একটা বিষয় চেক করতে হবে।’ আরশাদী অবাক হলেও প্রশ্ন করল না, পিছু পিছু হাঁটতে থাকল।
নাবিহা গিয়েই পরিচালককে অনুরোধ করল গত দুদিনের শুটিংয়ের ফুটেজ দেখাতে, বিশেষ করে যেসব ফ্রি কিকের পর বল জঙ্গলে গেছে। নাবিহা আর আরশাদী বারবার ভিডিওগুলো দেখতে থাকল।
হঠাৎ আরশাদী বলে উঠল, ‘আরে, এই একটা ছেলেই যতবার বল মারে, হারিয়ে যায়।’
‘যাক, এটুকু বুঝেছেন অন্তত’, টিপ্পনী কাটল নাবিহা। পরক্ষণেই আবার সামলে নিয়ে বলল, একটা বিষয় লক্ষ করেছেন, যে বলগুলো হারিয়ে গেছে সবকটিই ছোট্ট করে একটা নম্বর লেখা।’ বলতে বলতে জুম করে দেখাল।
আরশাদী অবাক হয়ে দেখল আসলেই তো, লাল কালিতে সংখ্যায় কী যেন লেখা।
আরশাদী বলল, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না।’
নাবিহা মজা করে বলল, ‘মাথা তো আর খাটাবেন না। আপনি যা যা বলেছেন, সেটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাধানের সূত্র।’
‘মানে কী?’ অবাক হলো আরশাদী।
‘নিজের চোখে দেখবেন।’ বলে আরশাদীকে হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল নাবিহা। পরিচালক সাদমান রাজীব কফি খাচ্ছিলেন। নাবিহা তাড়াহুড়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘ভাই, আমাদের বলের কালেকশনগুলো একটু দেখাবেন।’ সাদমান অবাক হলেন, কিন্তু কোনো প্রশ্ন করলেন না। কারণ, এ দুদিনে তিনি বুঝে গেছেন, এই মেয়ে ফালতু কথা বলে না।
স্টোররুমের দরজা খোলা হলো। এখনো মনে হয় গোটা বিশেক বল আছে। নাবিহা অধৈর্যভাবে সব চেক করতে লাগল। হঠাৎ একটা বলে হাত দিয়েই সে চিৎকার করে উঠল, ‘পেয়ে গেছি?’ রুমের বাকি দুই সদস্য তখনো অন্ধকারে।
‘শুধু বলছি, এগুলো আসলেই গোল্ডেন বল।’
পাঠক, বলুন তো কী পেয়েছে নাবিহা? এই বলগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হতো?
উত্তর পাঠাতে হবে ১৭ জুনের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।




