গবেষণায় কাজের সুযোগ বিশ্ব জুড়ে

গবেষণা হতে পারে চাকরির বাইরে একটি সম্ভাবনাময় পেশা । মডেল: সুরাইয়া রহমান। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
নতুন জ্ঞান তৈরি, জটিল সমস্যার সমাধান এবং নীতিনির্ধারণে গবেষণার ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। একে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ ও প্রস্তুতির নানা দিক নিয়ে লিখেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের রিসার্চ প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট খালেদ আল ফারুক
কোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, সেজন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি তথ্য যাচাই করা এবং ফলাফল অন্যদের সামনে উপস্থাপনাই গবেষণার মূল প্রক্রিয়া। ফলে গবেষণাকে শুধু কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি নয়; বরং একটি দক্ষতা ও পেশাগত ক্ষেত্র হিসেবে দেখা সম্ভব।
নেপথ্যে যে কাজ
গবেষকের কাজ বিষয়ভেদে বদলে যায়। মেশিন লার্নিং গবেষক সংগৃহীত তথ্যের ভুল ও অসংগতি সংশোধন করে তা বিশ্লেষণের উপযোগী করার পাশাপাশি বিভিন্ন মডেল পরীক্ষা করে নেন। যন্ত্রের প্রোটোটাইপ তৈরি ও কার্যকারিতা যাচাই করেন বায়োমেডিকেল প্রকৌশলী। জনস্বাস্থ্য গবেষক জরিপ, তথ্য সংগ্রহ ও ফলাফল বিশ্লেষণে কাজ করেন। আবার ইতিহাস বা মানবিক বিদ্যার গবেষকের কাজ জুড়ে থাকে বই, নথি, আর্কাইভ ও ভাষা বিশ্লেষণ। তাই গবেষণা শুধু নতুন কিছু আবিষ্কারের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ, নথিবদ্ধকরণ, সংশোধন এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও উত্তর খুঁজে যাওয়ার ধৈর্য।
শিখবেন কোথায়
গবেষণার হাতেখড়ি হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। শিক্ষকরা বিভিন্ন গবেষণাপত্র, জরিপ ও গবেষণা প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করেন, যেখানে সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার, ডেটা ক্লিনিকিং বা প্রাথমিক বিশ্লেষণের মতো কাজ শেখার সুযোগ থাকে। নিজের আগ্রহের বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও গবেষণার প্রশ্ন তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ ও ফলাফল উপস্থাপনের বাস্তব ধারণা পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি অভিজ্ঞ শিক্ষকের পরামর্শ ও ভবিষ্যতের অ্যাকাডেমিক সুপারিশ কাজে আসতে পারে।
কাজের সুযোগ
গবেষণার ক্যারিয়ার শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নয়। থিংকট্যাংক, এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বৈজ্ঞানিক সংগঠন ও বেসরকারি খাতেও কাজের সুযোগ রয়েছে। সিপিডি, বিআইডিএস, ব্র্যাক ও আইসিডিডিআর,বির মতো প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ক্যারিয়ারের শুরুতে ইন্টার্নশিপ, ফেলোশিপ, এনুমারেটর বা ফিল্ড ইনভেস্টিগেটর হিসেবে কাজ করে অভিজ্ঞতা নেওয়া যেতে পারে। পরে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, প্রজেক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট বা জুনিয়র অ্যানালিস্টের মতো পদে এগোনোর সুযোগ থাকে। এসব নিয়োগের খবর পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, লিংকডইন, বিডিজবস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেটওয়ার্কে।
গবেষণার ক্যারিয়ার শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নয়। থিংকট্যাংক, এনজিওসহ রয়েছে নানামুখী কাজের সুযোগ
কোন দক্ষতাগুলো প্রয়োজন
গবেষণায় বিষয়ভেদে দক্ষতার চাহিদা আলাদা হলেও তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, গবেষণার নকশা তৈরি, অ্যাকাডেমিক লেখালেখি এবং ফল উপস্থাপনের দক্ষতা প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এক্সেল, এসপিএসএস, স্টাটা, আর ও পাইথনের মতো সফটওয়্যার জানা কাজে আসে। এসব দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাগত ও অনলাইন কোর্স করতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড স্ট্যাটিসটিকস অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স (আইএএসডিএস), বেসিস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইটিএম), সরকারের এজ প্রজেক্ট এবং কোর্সেরা, এডএক্স, ডেটাক্যাম্প ও ক্যাগলের মতো প্ল্যাটফর্ম এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। দেশীয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানেও ডেটা বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিভিত্তিক কোর্স রয়েছে। তবে সফটওয়্যার জানা এবং গবেষণা করতে পারা এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থীকে বুঝতে হবে কোন পরিস্থিতিতে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা দরকার এবং সেই পদ্ধতির ফল কীভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। বাস্তব ডেটা নিয়ে কাজ, একটি গবেষণা প্রকল্প, থিসিস বা রিপ্লিকেশন স্টাডি এই দক্ষতা তৈরিতে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে
বাংলাদেশে থেকেই আন্তর্জাতিক গবেষণার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। যারা অর্থায়নপ্রাপ্ত মাস্টার্স, গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ বা পিএইচডি করতে চান, তাদের প্রথমে নিজের গবেষণার আগ্রহ ও ক্ষেত্রটি পরিষ্কার করা দরকার। এরপর সেই বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রোগ্রাম ও সুপারভাইজার খুঁজে দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু কোনো নির্দিষ্ট স্কলারশিপের পেছনে না ছুটে নিজের গবেষণার প্রস্তুতি তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। থিসিস, প্রাসঙ্গিক কোর্স, গবেষণা প্রকল্প, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সুপারিশপত্র একজন শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে কোন অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা বিষয়ভেদে বদলে যায়।
সিভিতে কী থাকবে
সিভিতে থিসিস, গবেষণা প্রকল্প, ইন্টার্নশিপ, লেখালেখি বা তথ্য বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন। সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার, নেতৃত্ব ও স্বেচ্ছাসেবী কাজের পাশাপাশি ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাও উল্লেখ করা যেতে পারে। সম্ভব হলে এমন রেফারেন্স দিন, যিনি আপনার অ্যাকাডেমিক বা গবেষণাসংক্রান্ত কাজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শুধু সার্টিফিকেটের তালিকা না দিয়ে আপনার গবেষণার সক্ষমতা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা সিভিতে ফুটিয়ে তুলুন।







