আইনজীবী হলে কাজের সুযোগ বিশ্ব জুড়ে

মডেল: আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
আদালতের কাঠগড়া থেকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বোর্ডরুম, শিক্ষকতা থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন— আইন নিয়ে পড়াশোনা খুলে দিতে পারে ক্যারিয়ারের নানা দুয়ার। জানাচ্ছেন মাহফুজ কায়সার
আইন পড়ে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। এই বৈচিত্র্যের কারণে বিভ্রান্ত না হয়ে শুরু থেকেই নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।
কোথায় পড়বেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে আইন পড়া যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম, শিক্ষার পরিবেশ, ব্যবহারিক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বিবেচনা করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেলেও আইন পড়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন কলেজের মাধ্যমেও উচ্চশিক্ষার নেওয়া সম্ভব। স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীরা প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করে আইন কলেজে এলএলবি কোর্সে ভর্তি হতে পারেন। ঢাকার আইডিয়াল ল কলেজ ও ন্যাশনাল ল কলেজ এক্ষেত্রে পরিচিত প্রতিষ্ঠান। কিছু প্রতিষ্ঠানে সন্ধ্যাকালীন বা চাকরিজীবীদের উপযোগী সময়সূচিতে পড়ার সুযোগও রয়েছে। তবে ভর্তি হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, বর্তমান কোর্সের কাঠামো এবং বার কাউন্সিলের নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
দক্ষতা ও প্রস্তুতিই এগিয়ে রাখবে: শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই পেশাগত জীবনে সফল হওয়া যায় না। পড়াশোনার পাশাপাশি আইনবিষয়ক গবেষণা, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। শুরুতেই নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন হলে সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়। আইনে পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা, আইনি নথি তৈরি, যুক্তি উপস্থাপন, যোগাযোগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করা জরুরি। নিজের আগ্রহ অনুযায়ী আদালত, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকতা, গবেষণা কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে হবে।
সঠিক দক্ষতা, ভাষা দক্ষতা এবং আধুনিক আইনের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শিতা অর্জন করতে পারলে আইন পেশা হতে পারে দেশ ও দেশের বাইরে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর চমৎকার মাধ্যম
আদালতের বাইরে কাজের সুযোগ: আইন এখন আর শুধু আদালতকেন্দ্রিক পেশায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক ও সম্মানজনক ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। দেশে বিচারক বা আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি করপোরেট খাতেও কাজের সুযোগ রয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, মোবাইল অপারেটর ও বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানে লিগ্যাল অ্যাডভাইজার, লিগ্যাল অফিসার এবং কমপ্লায়েন্স ম্যানেজার হিসেবে কাজ করা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের চুক্তি, নীতিমালা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান অনুসরণ এবং আইনি জটিলতা সমাধানে আইনে দক্ষ ব্যক্তিদের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করার পাশাপাশি সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিচার বিভাগে ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়ও আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কেউ চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হতে পারেন। আবার আইন পেশায় সরাসরি যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থী বা জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। পরে নিজস্ব চেম্বার প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীনভাবে আইন পেশা পরিচালনার সুযোগও রয়েছে। তবে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্যারিয়ার: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইন ডিগ্রিধারীদের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় ক্যারিয়ারের সুযোগ। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য বা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর আইন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বার অ্যাট-ল বা সলিসিটর কোয়ালিফিকেশন অর্জন করা গেলে ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কাজের প্রচুর ক্ষেত্র তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কূটনৈতিক মিশন এবং বৈশ্বিক সংস্থায় (যেমন জাতিসংঘ বা এর সহযোগী অঙ্গসংগঠন, বিশ্ব ব্যাংক) আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে কাজ করা সম্ভব। এ ছাড়া বিদেশি ল ফার্ম বা করপোরেট কনসালট্যান্সি ফার্মগুলোয় ক্রস-বর্ডার ট্রানজেকশন, আন্তর্জাতিক সালিশি এবং মেধাস্বত্ব আইন নিয়ে কাজ করার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোয় এলএলএম সম্পন্ন করে অনেকেই বৈশ্বিক আইনি পরামর্শক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছেন।
সঠিক দক্ষতা, ভাষা দক্ষতা এবং আধুনিক আইনের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শিতা অর্জন করতে পারলে আইন পেশা হতে পারে দেশ ও দেশের বাইরে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর চমৎকার মাধ্যম।



