নীল জলে নিমগ্ন গবেষক

সেন্টমার্টিনের সৈকতে পড়ে থাকা বর্জ্য সংগ্রহ করে তৈরি করা হয়েছে বিশালাকার মাছ, কচ্ছপ ও জেলিফিশের ম্যুরাল
বাংলাদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় প্রতিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশ গবেষণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তুলতে প্রচুর অবদান আছে। ‘দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক-২০২৫’ লাভ করেছেন তিনি। তাকে নিয়ে লিখেছেন তাহিরুল হাসান ফাহিম
একবার বর্ষাকালে সুন্দরবনের একটি চ্যানেলে গবেষণা করার সময় প্রবল স্রোতের মুখে তাদের নৌকাটি ডুবে যাচ্ছিল। চারপাশে তখন অন্য কোনো নৌকা বা মানুষ ছিল না। অভিজ্ঞ মাঝির তাৎক্ষণিক দক্ষতা ও বিচক্ষণতার কারণে শেষ পর্যন্ত তারা বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান। বাংলাদেশের সামুদ্রিক ও জলজ প্রাণীর গবেষণায় অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো গবেষণার জন্য বিশেষায়িত গবেষণা জাহাজ বা বোটের অভাব। ফলে গবেষণা পরিচালনার জন্য তাদের সাধারণ নৌকা ভাড়া করে দুর্গম এলাকায় কাজ করতে হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিকূল পরিবেশ, উত্তাল সমুদ্র, দুর্গম চরাঞ্চল এবং সীমিত গবেষণা অবকাঠামো— এমন নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তবুও গবেষণা করে চলেছেন ড. কাজী আহসান হাবীব। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন ও ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের চেয়ারম্যান তিনি। দীর্ঘদিন ধরে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, ডিএনএ বারকোডিং, সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান, উপকূলীয় প্রতিবেশ এবং ব্লু ইকোনমি নিয়ে নিরলস গবেষণা করছেন। গবেষণা, শিক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা— এই চারটি ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছেন সমান গুরুত্ব দিয়ে। আধুনিক মলিকুলার প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণায় যোগ করেছেন নতুন মাত্রা।
তার উদ্যোগেই শেরেবাংলা কৃিষ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক অ্যাকুয়াটিক বায়োরিসোর্স গবেষণাগার, যেখানে ডিএনএ বারকোডিং, পপুলেশন জেনেটিকস, এনভায়রনমেন্টাল ডিএনএ, মলিকুলার ট্যাক্সোনমি নিয়ে অত্যাধুনিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। গবেষণা চলছে জলজ জীববৈচিত্র্য নিয়েও। ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের প্রতিষ্ঠা, পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অধ্যাপক হাবীবের গবেষণার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ। প্রায় ৫০ বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বই ও প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে তিনি ও তার গবেষণা দল প্রমাণ করেছে, বঙ্গোপসাগরে স্বীকৃতি পাওয়া ৪৭৫ প্রজাতির পরিবর্তে অন্তত ৭৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। এই গবেষণা বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চল থেকে তিনটি মাছের প্রজাতি (বড় জালি পটকা, পেট্টলি, গিটারফিশ) আবিষ্কৃত হয়েছে। যা সারা দেশের জন্যই নতুন। সেন্টমার্টিনের প্রবাল প্রতিবেশ থেকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় প্রথমবারের মতো ৩৭টি রিফ মাছ, ১২টি প্রবাল, ১০টি কাঁকড়া এবং একাধিক মোলাস্ক প্রজাতির নতুন রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। সুন্দরবনের জলজ প্রতিবেশ থেকে প্রথমবারের মতো পাঁচটি মাছের প্রজাতিও নথিভুক্ত করেছেন তিনি। এসব গবেষণা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে বৈশ্বিক গবেষণায় নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
গবেষণাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার উদ্যোগে দেশের সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির জীববৈচিত্র্য নিয়ে দুটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার (marine biodiversity portal of Bangladesh ও freshwater biodiversity portal of Bangladesh) ও অনলাইন পোর্টাল (marinebiodiversity.org.bd) তৈরি করা হয়েছে। এসব পোর্টালে মাছ, প্রবাল, প্ল্যাঙ্কটন, কাঁকড়া, মোলাস্ক, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি, শৈবালসহ হাজারো জীবের ছবি, বৈজ্ঞানিক পরিচিতি, আবাসস্থল, বিস্তৃতি ও ডিএনএ বারকোড সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া ড. কাজী আহসান হাবীবের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাদুপানির জীববৈচিত্র্যের ওপর freshwaterbiodiversity.org নামে একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরি হয়েছে। তার গবেষণার মাধ্যমে সুন্দরবন থেকে প্রথমবারের মতো পাঁচ প্রজাতির মাছের রেকর্ড করা হয়েছে। তার গবেষক দল সুন্দরবনের জলজ অঞ্চলে মাছের হালনাগাদ সংখ্যা ও তালিকা প্রকাশ করেছে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে তাঁর উদ্যোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পের আওতায় সৈকতে পড়ে থাকা প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল এবং অন্যান্য বর্জ্য সংগ্রহ করে তার পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছে বিশালাকার মাছ, কচ্ছপ ও জেলিফিশের ম্যুরাল। এ নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি বৈশ্বিকভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। এই উদ্যোগ দ্বীপটিকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তিনি প্রায় প্রতিবছর শিক্ষার্থী ও তার গবেষণা দল নিয়ে সেন্টমার্টিনে সৈকত ও প্রবাল এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে তরুণদের পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করছেন। এ ছাড়া এই দ্বীপের প্রবাল অঞ্চল থেকে প্রথমবারের মতো ৩৭ জাতের প্রবালনির্ভর মাছ আবিষ্কার করেছেন তারা। তার গবেষণার মাধ্যমে সেন্ট মার্টিনে নতুন ১২ প্রজাতির প্রবাল আবিষ্কার করা হয়েছে।
তিনি ও তার গবেষণা দল প্রমাণ করেছে, বঙ্গোপসাগরে স্বীকৃতি পাওয়া ৪৭৫ প্রজাতির পরিবর্তে অন্তত ৭৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে
বাংলাদেশে আধুনিক ই-ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলজ জীববৈচিত্র্য শনাক্তকরণ গবেষণায় তিনি পথিকৃৎদের একজন। ইউনেসকোর উদ্যোগে সুন্দরবনে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ই-ডিএনএ গবেষণায় তিনি বাংলাদেশের গবেষণা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। এই গবেষণার মাধ্যমে সরাসরি জলজ প্রাণী না ধরে পানির নমুনা সংগ্রহ করে এতে মিশে থাকা প্রাণীর ডিএনএ খণ্ড আলাদা করে সিকুয়েন্সিং বা মেটাবারকোডিংয়ের মাধ্যমে বিপন্ন মাছ, ডলফিনসহ অসংখ্য জলজ প্রাণীর উপস্থিতি অতি স্বল্প সময়ে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা দেশের জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। এসব কাজে স্কুবা ড্রাইভিং করেছেন।
শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি মাধ্যমিক পর্যায়ের (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) কৃষি শিক্ষা পাঠ্যবইয়ের মৎস্য অংশের লেখক। ২০১২ সাল থেকে ছাত্রছাত্রীরা তার লেখা পড়ছে। এ ছাড়া সেন্টমার্টিন, সুন্দরবন এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে একাধিক গবেষণাভিত্তিক বই রচনা করেছেন, যা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তার ৬০টির অধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন।





