‘রাজেকা মোর মাও-বাপ’

এক প্রবীণের যত্ন নিচ্ছেন রাজেকা রহমান। ছবি: হাসান ফেরদৌস রাসেল
রংপুরের পীরগাছায় অসহায় প্রবীণদের আশ্রয় হয়ে উঠেছে রাজেকার ‘দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র’। ঘুরে এসে লিখেছেন স্বপন চৌধুরী
রংপুরের পীরগাছা রেলস্টেশনে সেদিন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন ৮০ বছরের নূরজাহান। পাশে ৩০ বছরের প্রতিবন্ধী মেয়ে। দুজনেরই চোখেমুখে আতঙ্ক, শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন। ২০১৩ সালের এ ঘটনা বীমাকর্মী রাজেকা রহমানকে থমকে দিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আপনজনরাই তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। পরে রাজেকা তাদের আশ্রয় হয়ে ওঠে। নিজের বাড়ির বারান্দায় জায়গা করে দেন মা-মেয়েকে। খাবার, চিকিৎসা আর যত্নে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন বৃদ্ধ নূরজাহান। ছয় বছর রাজেকার আশ্রয়ে থাকার পর মারা যান তিনি। তবে তার প্রতিবন্ধী মেয়ে খালেদা এখনো রাজেকার কাছেই আছেন।
নূরজাহান থেকে শুরু। এরপর একে একে আরও মানুষ। পীরগাছার কুতুববস এলাকার নিঃসঙ্গ জাহানারা থেকে শুরু করে সন্তানদের নির্যাতনের শিকার সত্তরোর্ধ্ব নছিম উদ্দিন— এভাবে বাড়তে থাকে রাজেকার আশ্রয়ের পরিধি। ২০১৪ সালে ভাড়া বাড়িতে পাঁচজন অসহায় মানুষকে নিয়ে শুরু হয় একটি বৃদ্ধাশ্রম। ইতিহাসের কিংবদন্তি নারী দেবী চৌধুরানীর নামে পুনর্বাসন কেন্দ্রটির নাম দেওয়া হয় ‘দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র’। আজ সেখানেই জীবনের পড়ন্ত বেলায় আশ্রয় পেয়েছেন ১৭ জন প্রবীণ।
পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে চৌধুরানী বাজার এলাকায় টিনশেডের আধাপাকা তিনটি ঘর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন্দ্রটি। চারপাশে ইটের প্রাচীর। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক ধরনের ঘরোয়া ব্যস্ততা। কেউ বসে আছেন, কেউ গল্প করছেন। দুপুরের খাবারের অপেক্ষায় কয়েকজন। আর শতবর্ষী এক বৃদ্ধার চুল ঠিক করে দিচ্ছেন রাজেকা।
এখানকার মানুষগুলোর গল্প আলাদা হলেও কষ্টের জায়গাটি প্রায় একই। অভাব, নিঃসঙ্গতা, স্বজনের অবহেলা কিংবা নির্যাতন।
কুতুববস গ্রামের জাহানারা বেগমের কোনো সন্তান নেই, জমিজমাও নেই। স্বামী সবুর উদ্দিন মারা যাওয়ার পর ভিক্ষা করেই চলতেন। বয়স বেড়ে যাওয়ার পর সেটিও সম্ভব হচ্ছিল না। প্রায় এক যুগ আগে রাজেকা তাকে নিয়ে আসেন এ কেন্দ্রে।জাহানারার কাছে রাজেকার পরিচয় এখন আর কেবল আশ্রয়দাতা নয়, পরিবারের মানুষ। তিনি বলেছেন, ‘রাজেকা মোর মাও-বাপ। প্রায় দিনত মোক মায়ের মতোন আদর করি গোসল করায়, ত্যাল মাখায়, নিজ হাতোত ভাত খাওয়ায়।’
চৌধুরানী বাজারে তার আছে দর্জির দোকান, কাপড়ের শোরুম ও বিউটি পার্লার। এসব আয়ের বড় অংশই চলে যায় পুনর্বাসন কেন্দ্রে
কেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা বেগমের বয়স ১১৩ বছর। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ছয় বছর ভাতিজার কাছে ছিলেন। অযত্ন-অবহেলায় সেখানে জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। দুই বছর আগে রাজেকার আশ্রমে এসে এখন ভালো আছেন তিনি। ৯৫ বছরের বাছির উদ্দিনের সন্তানরা ঢাকায় থাকেন। দেখভাল করার মতো কেউ ছিল না। একবার অসুস্থ অবস্থায় স্থানীয় একটি মসজিদে ১৫ দিন না খেয়ে পড়ে ছিলেন তিনি। খবর পেয়ে রাজেকা তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। এখন তার ভাষায়, ‘খাওয়া-পরা নিয়ে আর চিন্তা করতে হয় না।’
রাজেকার এ উদ্যোগের পেছনে কোনো বড় প্রতিষ্ঠান নেই। নেই নিশ্চিত কোনো অর্থের উৎসও। বীমাকর্মী হিসেবে সামান্য আয় করেন। চৌধুরানী বাজারে তার আছে দর্জির দোকান, কাপড়ের শোরুম ও বিউটি পার্লার। এসব আয়ের বড় অংশই চলে যায় পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
২০১৬ সালে নিজের গয়না বিক্রি এবং জমানো টাকা দিয়ে ৩০ শতক জমি কেনেন রাজেকা। এর মধ্যে ২০ শতক লিখে দেন পুনর্বাসন কেন্দ্রের নামে। সেখানে এখন দ্বিতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।
প্রতি মাসে কেন্দ্রটির পেছনে ব্যয় হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। খাবার, চিকিৎসা, ওষুধ, পোশাক সবই জোগাতে হয়। শুরুতে উপজেলা প্রশাসন কিছু সহায়তা করলেও পরে তা নিয়মিত থাকেনি। এখন কিছু হৃদয়বান মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন।
রাজেকা বললেন, ‘এই বৃদ্ধাশ্রম তৈরির পেছনে আমার যা অর্জিত সম্পদ-অর্থ ছিল, সবই শেষ করেছি। এখন আমি যা আয় করি, ওই টাকাতে নিজেও চলি, বৃদ্ধাশ্রমও চালাচ্ছি।’
এ লড়াইয়ের মূল্যও কম দিতে হয়নি তাকে। পুনর্বাসন কেন্দ্র ঘিরে সংসারে সৃষ্টি হয়েছিল অশান্তি। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। এরপর কলেজপড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কেন্দ্রেরই একটি ঘরে থাকছেন রাজেকা। সেখানে এক এতিম কন্যাশিশুকেও নিজের মেয়ের মতো করে বড় করছেন।
কেন্দ্রের জীবন চলে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ। প্রবীণদের একজন আজান দেন, তিনিই নামাজ পড়ান। এরপর কোরআন পাঠ। সকালে বাইরে প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি। তারপর খাবার।
রাজেকা নিজ হাতে সবার পাতে খাবার তুলে দেন। জোহরের নামাজের পর দুপুরের খাবার। দুই ঘণ্টা বিশ্রাম। আসরের পর আবার কিছুক্ষণ হাঁটাচলা। রাতে খাবার শেষে ঘুম। কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসক এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া হয় ওষুধ।
গত ১২ বছরে প্রায় এক হাজার অসহায় বয়স্ক নারী-পুরুষ এই কেন্দ্রে আশ্রয় ও সেবা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ জন মারা গেছেন। অনেককে পরে স্বজনরা বাড়ি নিয়ে গেছেন। এখন আছেন ১৭ জন— ৫ জন পুরুষ ও ১২ জন নারী।
একসময় কয়েকজন কর্মচারী থাকলেও এখন একজনকে নিয়ে সবকিছু সামলান রাজেকা। তবু ক্লান্তির চেয়ে তার কথায় বেশি শোনা যায় এক ধরনের তৃপ্তি। ‘পুনর্বাসন কেন্দ্রের সবাই আমাকে মা বলে ডাকেন— আনন্দে বুক ভরে যায়। এরাই আমার প্রাণ।’
দেবী চৌধুরানীর গল্প শুনেই একসময় মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন রাজেকা। সে স্বপ্ন অবশ্য এখানেই শেষ নয়। ২০ শতক জমিতে যে দ্বিতল ভবনের কাজ চলছে, সেখানে অন্তত ৫০ জন মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে চান। ‘আমি না থাকলেও আমার ছেলে আর পালিত মেয়ে যেন তাদের দেখভাল করতে পারে’— ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে বললেন রাজেকা।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাদের জন্য দেবী চৌধুরানী বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র একটি ঠিকানা। আর সেই ঠিকানার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন রাজেকা।



