চা দোকানি থেকে উদ্যোক্তা আব্দুল আওয়াল

তাঁত যন্ত্রের সঙ্গে আব্দুল আওয়াল
ছিলেন চা দোকানি। জীবনের প্রয়োজনে রিকশাও চালিয়েছেন। আজ তিনি উদ্যোক্তা। লিখেছেন সঞ্জিব দাস
কাঠের তাঁতে সুতা বুনছেন আব্দুল আওয়াল ব্যাপারি। একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে ছুটছে হাত। ধীরে ধীরে বুননে ফুটে উঠছে পাটের চট। সেই চট দিয়ে তৈরি হবে মানিব্যাগ কিংবা নারীদের হ্যান্ডব্যাগ। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বাইশরশি গ্রামের এই বাড়িটিতে তৈরি হয় এমন সব পাটপণ্য, যেগুলো বিক্রি হয় দেশের পরিচিত লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড আড়ংয়ের মাধ্যমে।
আওয়াল ব্যাপারির বয়স ৬৬ বছর। একসময় চায়ের দোকান আর রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাকে। মাসে আয় হতো দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। স্ত্রী ও তিন ছেলের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সেই জীবন বদলেছে পাটের হাত ধরে। প্রায় ২৮ বছর আগে শুরু হওয়া এক ছোট উদ্যোগ আজ তাদের প্রধান আয়ের উৎস। পাটের মানিব্যাগ ও হ্যান্ডব্যাগ তৈরি করে যাবতীয় খরচ বাদে এখন মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেন আওয়াল। এই আয়েই নিজেদের জমিতে বাড়ি করেছেন, সংসারে এনেছেন সচ্ছলতা। জীবনের শুরুর দিনগুলো ছিল অভাবের। পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি তার। স্বাক্ষর করতে পারেন, এটুকুই। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো চায়ের দোকান চালিয়েছেন, মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেছেন, কখনো রিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন।
এ পরিস্থিতিতে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে স্ত্রীর প্রশিক্ষণ। প্রায় ২৮ বছর আগে বাড়ির পাশে নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) উদ্যোগে পাটপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। সেই প্রশিক্ষণে অংশ নেন তাহমিনা বেগম। এর আগে সেলাইয়ের কাজেও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। পাটের কাজ শেখার পর ঘরে বসেই বিভিন্ন পণ্য তৈরির উদ্যোগ নেন। শুরুতে পাটের চট দিয়ে তৈরি হতো মানিব্যাগসহ নানা পণ্য। স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন আওয়ালও। একসময় চায়ের দোকান ছেড়ে পুরোপুরি নেমে পড়েন পাটপণ্যের কাজে।
আওয়াল বলেন, ‘আমার স্ত্রীই প্রথম পাটপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। তাকে সহযোগিতা করতে গিয়ে আমিও এই কাজে যুক্ত হই। তখন বুঝিনি, এই কাজই একদিন আমাদের পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন করবে।’
শুরুর দিকে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা থেকে পাটের চট সংগ্রহ করতেন। পরে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তার মধ্য থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে পাঁচটি তাঁত কেনেন আওয়াল। বাড়িতেই শুরু হয় পাটের চট তৈরির কাজ। তিনি নিজে এবং আরও তিনজন শ্রমিক মিলে তাঁতে চট তৈরি করতেন। সেই চট দিয়ে মানিব্যাগ ও হ্যান্ডব্যাগ বানাতেন তারা। ব্যবসার শুরুতে বিআরডিবির এক কর্মকর্তার মাধ্যমে আড়ংয়ের সঙ্গে পাটপণ্য সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৯৮ সালে প্রথম ১০০টি মানিব্যাগ আড়ংকে সরবরাহ করেন তিনি। এর বিনিময়ে পান দুই হাজার ৫০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে প্রথমেই ধারদেনা পরিশোধ করেন। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কাজের পরিধি।
যেখানে সংসার চালানোই ছিল কঠিন, সেখানে পাটপণ্যের আয় থেকে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছেন আওয়াল
কাজের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে সংসারের অবস্থাও। আগে যেখানে সংসার চালানোই ছিল কঠিন, সেখানে পাটপণ্যের আয় থেকে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছেন আওয়াল। সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের জন্যও অর্থ ব্যয় করতে পেরেছেন। তার বড় ছেলে মাস্টার্স শেষ করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। অন্য দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন উন্নত ভবিষ্যতের আশায়। এই অর্জনের পেছনে নিজের পরিশ্রমের পাশাপাশি স্ত্রীর অবদানও অকপটে স্বীকার করেন তিনি। আওয়ালের ভাষায়, ‘আমার স্ত্রী যদি প্রথম প্রশিক্ষণ না নিতেন, তাইলে হয়তো আজও চায়ের দোকান চালাইতাম। তার উদ্যোগ থেকেই আমার এই কাজে আসা।’
বর্তমানে মাসে প্রায় এক হাজার ৫০০টি পাটপণ্য তৈরি করেন তারা। এর মধ্যে প্রায় এক হাজারটি মানিব্যাগ ও ৫০০টি হ্যান্ডব্যাগ। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আওয়ালের বড় আক্ষেপ, শ্রমিকের অভাবে তিনটি তাঁত বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে শ্রমিক পাওয়া গেলে সেগুলো আবার চালু করতে চান।




