নকশাকারের বয়ান
পোশাকে মানবিক পৃথিবীর বুনন

ইমাম হাসান। প্রতিশ্রুতিশীল ফ্যাশন ডিজাইনার। নিজের নামেই গড়েছেন ব্র্যান্ড ‘লেবেল ইমাম হাসান’। দেশের শীর্ষস্থানীয় রানওয়েগুলোতে তার নকশাকৃত পোশাকের দৃপ্ত উদ্ভাস এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। জানিয়েছেন তার শিল্পদর্শন
ফ্যাশন ডিজাইন আমার কাছে শুধু পোশাক তৈরির শিল্প নয়; বরং গভীরভাবে আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। ফ্যাশন জগতের মানুষ এখন আমাকে হয়তো ডিজাইনার হিসেবে চেনেন; কিন্তু এই যাত্রার শুরু ঠিক কাগজে-কলমে বা ভাবনা-চিন্তা করে হয়নি। মনে পড়ে, ছোটবেলায় কোনো ঈদ বা বিশেষ দিনে যখন বাজার থেকে কিনে দেওয়া পোশাক আমাকে পরতে হতো, ভীষণ কান্নাকাটি করতাম। তখন হয়তো বুঝতাম না, কেন ভালো লাগছে না; কিন্তু মনের ভেতরে একধরনের অস্পষ্ট অস্থিরতা কাজ করত। একটু বড় হওয়ার পর নিজে নিজেই দর্জি বা টেইলর দিয়ে নিজের কাপড়ের নকশা বানিয়ে নিতাম।
আমার ডিজাইনার হয়ে ওঠার প্রধান ভিত্তি নিজের শিকড়। শৈশবের অনেকটা সময় কাটিয়েছি নানাবাড়ি যশোর এলাকায়। সেখানকার নকশিকাঁথা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। গ্রামে নানি-খালাদের হাতে কাঁথা সেলাই, সূক্ষ্ম হ্যান্ড এমব্রয়ডারি এবং নানাবিধ লোকজ নকশা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতাম। গ্রামের মাটির রঙ, শেওলা, কাদা কিংবা কলসি কাঁখে গ্রাম্য নারীর হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাসায় ফিরে ওই নকশাগুলোর প্র্যাকটিস করতাম। পরে শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে স্নাতক করার পর প্রফেশনাল ডিজাইনার হিসেবে আমার হাতেখড়ি হয়েছিল প্রখ্যাত ডিজাইনার লিপি খন্দকারের সঙ্গে কাজের সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করি সিগনেচার ব্র্যান্ড ‘লেবেল ইমাম হাসান’। কেননা, আমি শুধু ডিজাইনার হতে চাইনি কিংবা বিখ্যাত ব্যবসায়ী হওয়ার মোহ আমার ছিল না। চেয়েছি, একজন মানুষ হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করতে। তাই প্রতিটি পোশাকের নকশায় দেশীয় হ্যান্ডলুম ও হ্যান্ড এমব্রয়ডারিকে প্রাধান্য দিই। তবে শুধু নান্দনিকতা নয়, আমার ডিজাইনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ইথিক্যাল ও সাসটেইনেবল ফ্যাশন। পোশাক তৈরির প্রতিটি প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সচেতন থাকি যেন পরিবেশের ভারসাম্য কোনোভাবেই নষ্ট না হয়। আমার কাজের মাধ্যমে পৃথিবী ও প্রকৃতির প্রতি একধরনের মমতা ফুটিয়ে তুলতে চাই। বিশেষ করে আর্থ টোন বা মাটিরঙের প্রতি বিশেষ ঝেঁাক মূলত এই দর্শনেরই প্রতিফলন। ক্রেতাদের বোঝাতে চাই, আমরা এই পৃথিবীরই অংশ; প্রকৃতি ও পরিবেশ ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব কল্পনাও করা অসম্ভব।
লেবেল ইমাম হাসানকে একটি ইথিক্যাল বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করতে চাই। আমার ব্র্যান্ডের দুটি সেগমেন্ট রয়েছে— একটি রেডি-টু-ওয়্যার বা স্ট্রিটওয়্যার, যা গুলশান ও বনানীর সেলস পয়েন্টে পাওয়া যায়; অন্যটি কাস্টম-মেড। আমাদের দেশে উৎসব বা বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য দেশীয় ঘরানার কাস্টমাইজ পোশাকের বেশ অভাব ছিল। সেই শূন্যতা পূরণ করতে এই সেগমেন্ট রেখেছি। আমি চাই, ক্রেতারা জেনে-বুঝেই কাপড় কিনুক; এই স্বচ্ছতা ক্রেতার মনে ব্র্যান্ডটির প্রতি একটি আস্থার জায়গা তৈরি করে।
সাফল্যের কথা যদি বলি, বাংলাদেশ ফ্যাশন উইকসহ বিভিন্ন বড় প্ল্যাটফর্মে আমার কাজের প্রদর্শনী হয়েছে। লাক্স সুপারস্টারের মতো প্ল্যাটফর্মের জন্য কস্টিউম ডিজাইন করেছি। আরও বড় পরিকল্পনার বুনছি বীজ। একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলার কাজ করছি, যার মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে পথশিশুদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চাই। পথশিশুদের কেবল সহযোগিতা নয়, তাদের একটি মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার উপহার দেওয়াই লেবেল ইমাম হাসানের লক্ষ্য।
বিশ্বাস করি, ফ্যাশন শুধু বাহ্যিক চাকচিক্যের বিষয় নয়, এটি একটি জীবনবোধ। কাজ ও স্বপ্নের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাই, সৃজনশীলতার শক্তি দিয়ে প্রান্তিক মানুষকেও মূলধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সেই মেঠোপথ থেকে এই পথচলা— আমি পোশাকে শুধু সুতাই নয়, বুনছি আগামীর এক মানবিক পৃথিবী।




