কেনাকাটা
ঘরকন্যায় মৃত্তিকার মায়া

ছবি: আগামীর সময়
শুধু প্রয়োজনে নয়, ঘরের সৌন্দর্য আর জীবনযাপনে প্রকৃতির ছোঁয়া আনতেও মাটির থালাবাসন ও অন্যান্য পাত্রের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। লিখেছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
একসময় বাঙালির রান্নাঘরে উঁকি দিলেই পাওয়া যেত মাটির হাঁড়ি, কলসি, থালা, বাটি, হাঁড়িকুড়ি আর মাটির গন্ধ। ভোরবেলা কলসি কাঁখে পানি আনতে যাওয়া, দুপুরে মাটির পাতিলে ধীরে ধীরে রান্না হওয়া ভাত কিংবা উৎসবে সানকিতে পরিবেশিত পায়েস— এসব ছিল আমাদের জীবনযাপনের চিরচেনা অংশ। সময়ের প্রবাহে স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, ননস্টিক আর মেলামাইনের দখলে সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে আশার কথা, আবারও মানুষ ফিরছে মৃত্তিকার কাছে। ঐতিহ্যের টান, স্বাস্থ্যসচেতনতা, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন আর নান্দনিকতার কারণে মাটির থালাবাসন ও হাঁড়িকুড়ি নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে আধুনিক ঘরে।
রান্নার স্বাদে ভিন্নমাত্রা: অনেকেই বলেন, মাটির হাঁড়িতে রান্না করা খাবারের স্বাদই আলাদা। কারণ মাটি ধীরে ধীরে তাপ গ্রহণ করে এবং সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। এতে খাবার ধীরে সুসিদ্ধ হয়, মসলা ভালোভাবে মিশে যায় এবং স্বাদ আরও গভীরতা পায়। ভুনা মাংস, খিচুড়ি, পায়েস, ডাল কিংবা ভর্তা— মাটির পাত্রে রান্না হলে যেন অন্যরকম ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবেশবান্ধব: প্লাস্টিক এবং একবার ব্যবহারযোগ্য পণ্যের কারণে পরিবেশের ওপর বাড়ছে চাপ। সেই জায়গায় মাটির বাসন একটি টেকসই বিকল্প। এটি প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি, ব্যবহারের শেষে সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও কম থাকে।
মাটির হাঁড়িতে রান্না করা খাবারের স্বাদই আলাদা। কারণ মাটি ধীরে ধীরে তাপ গ্রহণ করে এবং সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। এতে খাবার ধীরে সুসিদ্ধ হয়, মসলা ভালোভাবে মিশে যায় এবং স্বাদ আরও গভীরতা পায়
স্বাস্থ্য সুরক্ষা: যদিও সব ধরনের স্বাস্থ্যগত দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়, তবে মাটির পাত্রে রান্না বা পরিবেশন করার অন্যতম সুবিধা হলো, এতে কোনো কৃত্রিম আবরণ বা রাসায়নিক প্রলেপ থাকে না। বিশেষ করে ভালো মানের, নিরাপদভাবে পোড়ানো মাটির বাসন ব্যবহার করলে খাবারের স্বাভাবিক স্বাদ বজায় থাকে।
ঘরের সাজ: শুধু রান্নাঘর নয়, ডাইনিং টেবিল সাজাতেও মাটির থালা, বাটি, কাপ, জগ বা ফুলদানি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাদামাটা রঙ, হাতে আঁকা নকশা কিংবা পোড়ামাটির স্বাভাবিক রূপ— সব মিলিয়ে এগুলো ঘরে এনে দেয় উষ্ণ ও প্রাকৃতিক আবহ। অতিথি আপ্যায়নেও মাটির বাসনের ব্যবহার আলাদা নান্দনিকতা যোগ করে। মাটির থালাবাসন শুধু ব্যবহার্য নয়, এগুলো ঘরের সৌন্দর্যেরও অনুষঙ্গ। পোড়ামাটির স্বাভাবিক রঙ, হাতের ছোঁয়ায় তৈরি অনন্য আকৃতি, সূক্ষ্ম কারুকাজ আর মাটির নিজস্ব টেক্সচারে প্রতিটি পাত্র যেন একেকটি শিল্পকর্ম। আধুনিক মিনিমাল সাজসজ্জার সঙ্গে যেমন সহজে মানিয়ে যায়, তেমনি ঐতিহ্যবাহী ঘরেও এনে দেয় উষ্ণতা আর আপন অনুভূতি। মাটির থালা বা বাটিতে পরিবেশন করলে সাধারণ একটি খাবারও হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। তাই অনেকেই প্রয়োজনের পাশাপাশি ঘরের সাজে প্রকৃতির ছোঁয়া আনতে এমন বাসন বেছে নিচ্ছেন।
ব্যবহারের আগে করণীয়: নতুন মাটির হাঁড়ি বা বাসন ব্যবহারের আগে কয়েক ঘণ্টা পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখা ভালো। এরপর ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে রান্নার কাজে প্রথম দিকে অল্প আঁচে ব্যবহার করুন। এতে বাসন দীর্ঘদিন টেকসই থাকে এবং ফাটার ঝুঁকিও কমে।
যত্নে ঠিকঠাক: মাটির বাসন ধোয়ার সময় অতিরিক্ত শক্ত রাসায়নিক ডিটারজেন্ট ব্যবহার না করাই ভালো। নরম স্পঞ্জ বা নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করলে বাসনের গায়ে আঁচড় পড়ে না। ধোয়ার পর সম্পূর্ণ শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। কেননা ভেজা অবস্থায় রেখে দিলে ছত্রাক বা দুর্গন্ধ হতে পারে।
প্রাপ্তিস্থান ও দরদাম
মাটির থালাবাসন ও হাঁড়িকুড়ি কিনতে চাইলে সবচেয়ে ভালো ঠিকানা দেশের বিভিন্ন কুমোরপাড়া ও স্থানীয় হাট। ঢাকায় রায়েরবাজার, দোয়েল চত্বর, শাঁখারীবাজার, ধানমন্ডি ও চকবাজার এলাকায় মাটির পণ্যের দোকান রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ভ্যানে করেও বিক্রি হয় এসব পণ্যসামগ্রী। এ ছাড়া আড়ং, কে ক্রাফট, ভূমি আর্টিসানসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের বিক্রয়কেন্দ্র এবং অনলাইন স্টোরেও মিলবে এ ধরনের নানা সামগ্রী। আকার, নকশা ও কারুকাজভেদে দামেও রয়েছে ভিন্নতা। সাধারণ একটি বাটি ৮০-২০০, থালা ১৫০-৪৫০, কাপ ১০০-২৫০, গ্লাস ১০০-২০০, জগ ৩০০-৮০০, রান্নার হাঁড়ি ৪০০-১৫০০, কলসি ৩০০-১০০০ এবং ডিনার সেট ১৫০০ থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায় । হাতে আঁকা বা টেরাকোটা কারুকাজ করা পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হতে পারে।




