ক্লাসিক যখন ট্রেন্ডি

মডেল: কাজী তারানা, সাজ: শামীম, পোশাক: এনটয়ইন, কৃতজ্ঞতা: বিহাইভ স্টুডিও, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
আধুনিকতা, ব্যবহার উপযোগিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে ওয়েস্টার্ন আউটফিটের কদর বাড়ছে। তবু সালোয়ার কামিজ এখনো অনেক নারীর নিত্যদিনের পোশাক হিসেবে প্রথম পছন্দ। এই টু-পিসের ভাঁজে মিশে আছে উপমহাদেশের দীর্ঘ পোশাক-ঐতিহ্য। লিখেছেন রেজাউল আহমেদ
পোশাকেরও আছে নিজস্ব ভূগোল। কোনোটির ভাঁজে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, কোনোটিতে ফুটে ওঠে স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন। সালোয়ার-কামিজ তেমনই এক দক্ষিণ এশীয় টু-পিস, যার শিকড় উপমহাদেশের দীর্ঘ পোশাক-ঐতিহ্যে আর বর্তমান রূপটি তৈরি হয়েছে নানা অঞ্চল, সংস্কৃতি ও সময়ের প্রভাবে। বাংলাদেশের নারীর পোশাক সম্ভারে এটি পেয়েছে দেশীয় কাপড়, কারুশিল্প ও রুচির আলাদা ছাপ। পাশ্চাত্যের পোশাকের বিস্তৃত উপস্থিতির মধ্যেও তাই সালোয়ার-কামিজ হারিয়ে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে বারবার নতুন করে সাজিয়েছে।
ইতিহাসের পথ
সালোয়ার-কামিজের ইতিহাসকে দেশ-কালের গণ্ডিতে আটকে রাখা মুশকিল। সালোয়ার বা শালওয়ারের মতো ঢিলেঢালা পায়জামা এবং দীর্ঘ কুর্তা বা কামিজের সমন্বয় মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার পোশাকধারার সঙ্গে যুক্ত। মধ্যযুগে এ ধরনের সেলাই করা পোশাক দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। পরে অঞ্চলভেদে এর গড়ন ও ব্যবহার বদলেছে। সময়ের সঙ্গে কামিজ, সালোয়ার ও ওড়না মিলে যে তিন অংশের পোশাকটি পরিচিত হয়েছে, তার নানা আঞ্চলিক রূপ তৈরি হয়েছে। এ সময়ে কারও কারও কাছে অবশ্য থ্রি-পিসের বদলে টু-পিসেরই কদর বেশি; কাটা পড়েছে ওড়নার আবেদন। সালোয়ার কোথাও প্রশস্ত, কোথাও সরু। কামিজ কোথাও দীর্ঘ, কোথাও ছোট। এসব পরিবর্তন থেকেই বোঝা যায়, ঐতিহ্যবাহী পোশাক মানেই স্থির কোনো নকশা নয়।
বাংলাদেশে বদলে যাওয়া গল্প
এ দেশের পোশাক সংস্কৃতিতে শাড়ির দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে। পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ ধীরে ধীরে নারীর দৈনন্দিন পোশাকে শক্ত জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। বিশেষ করে নগরজীবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে এর ব্যবহারিক গুরুত্বও বেড়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারীদের ক্ষেত্রেও শাড়ির তুলনায় সালোয়ার-কামিজকে কাজের জন্য বেশি সুবিধাজনক বলে দেখার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে গবেষণায়। ফলে শুধু ফ্যাশনের পরিবর্তন নয়; নারীর চলাফেরা, কাজ ও জনপরিসরে উপস্থিতির সঙ্গেও এ পোশাকজুটির বিস্তার জড়িয়ে আছে। আমাদের দেশে এই টু-পিস আবার পেয়েছে স্থানীয় কাপড় ও নকশার ধারা। তাঁত, সুতি, খাদি, মসলিন, সিল্ক, জামদানি-অনুপ্রাণিত নকশা এবং ব্লক, বাটিক, সূচিকর্মসহ বিভিন্ন দেশীয় উপাদান এর অবয়ব করেছে স্বতন্ত্র। বাংলাদেশের ফ্যাশন বিবর্তনেও সালোয়ার-কামিজকে স্থানীয় ঐতিহ্য ও পশ্চিমা প্রভাবের সঙ্গে বদলে যেতে দেখা যায়।
যত রূপ সালোয়ারে
এ পোশাকের কথা বললেই এখন কোনো নির্দিষ্ট কাট বোঝায় না। একসময়ের চওড়া, কুঁচি দেওয়া সালোয়ারের পাশাপাশি এসেছে পাটিয়ালা, চুড়িদার, সরু পায়জামা, পালাজ্জো কিংবা প্রশস্ত প্যান্ট। চওড়া সালোয়ারে তৈরি হয় ঐতিহ্যঘেঁষা আবহ, চুড়িদারে আসে শরীরঘেঁষা ছিমছাম ভাব আর পালাজ্জো বা প্রশস্ত প্যান্টে ফুটে ওঠে সমকালীন অবয়ব। কামিজের কাটও এর সঙ্গে বদলে যায়। অর্থাৎ শরীরের নিম্নাংশের এ পোশাকই অনেক সময় পুরো টু-পিসকে দেয় ভিন্নমাত্রা।
সালোয়ার-কামিজে বাংলাদেশের নিজস্ব রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কারুশিল্পের ভূমিকা কম নয়। সুতি বা খাদির ওপর সূচিকর্ম, ব্লকপ্রিন্ট কিংবা বাটিক; মসলিন বা সিল্কে সূক্ষ্ম কারুকাজ; নকশিকাঁথার ফোঁড় থেকে অনুপ্রাণিত মোটিফ— এসব এ পোশাকজুটিকে দিয়েছে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য
কাটে নতুনত্ব কামিজে
স্ট্রেট থেকে এ-লাইন কাট, লম্বা কামিজ থেকে ছোট কুর্তি— ঊর্ধ্বাংশের এ পোশাকের গড়নে এসেছে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন। কোথাও হাঁটুর নিচে নেমে যাওয়া দীর্ঘ কামিজ, কোথাও আবার কোমরের কাছাকাছি ছোট কাট। অসম হেমলাইন, সাইড স্লিট, কলার, কাফ, পকেট— আধুনিক পোশাকের নানা উপাদানও ঢুকে পড়েছে কামিজে। একসময় যেখানে গলা ও হাতার নকশা ছিল প্রধান আকর্ষণ, এখন কাট ও সিলুয়েটকেই সামনে রাখছেন অনেক নকশাকার। ফলে কারুকাজ কম হলেও পোশাকটি নজর কাড়ে।
কারুশিল্পে দেশি মায়া
সালোয়ার-কামিজে বাংলাদেশের নিজস্ব রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কারুশিল্পের ভূমিকা কম নয়। সুতি বা খাদির ওপর সূচিকর্ম, ব্লকপ্রিন্ট কিংবা বাটিক; মসলিন বা সিল্কে সূক্ষ্ম কারুকাজ; নকশিকাঁথার ফেঁাড় থেকে অনুপ্রাণিত মোটিফ— এসব এ পোশাকজুটিকে দিয়েছে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁতি, কারিগর, নকশাকার ও স্থানীয় শিল্পের গল্প। এ কারণেই একই সালোয়ার-কামিজের কাঠামো অন্য দেশে দেখা গেলেও বাংলাদেশের পোশাকে তার রঙ, কাপড় ও কারুকাজে তৈরি হয় আলাদা ধরন।
এথনিক মানে পুরনো নয়
এথনিক শব্দটি অনেক সময় এমন পোশাক বোঝাতে ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে ঐতিহ্যের ছাপ আছে। অথচ ঐতিহ্য আর সেকেলে হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। একটি পোশাকের সাংস্কৃতিক শিকড় থাকে, আবার তার কাটও হতে পারে একেবারেই আধুনিক। সালোয়ার-কামিজ তারই উদাহরণ। যেমন কামিজে শার্ট-কলার ও পকেট থাকতে পারে; হাতায় রাখা যায় কাফ আর সালোয়ারের বদলে প্রশস্ত প্যান্ট। তবু এ পরিচ্ছদের মূল পরিচয় একই থাকে। এথনিক পোশাক তাই অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়; অতীতকে সমকালীন করে নেওয়ার উপায়।
পাশ্চাত্যকে ছুঁয়েও নিজের মতো
পাশ্চাত্যের প্রভাব থেকে সালোয়ার-কামিজও দূরে নেই। পোশাকের কাট, সিলুয়েট, কলার, হাতা, পকেট, লেয়ারিং— বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রভাব স্পষ্ট। আবার এই টু-পিসের সঙ্গে জুতা, ব্যাগ বা গয়নার ক্ষেত্রেও আধুনিক অনুষঙ্গ যুক্ত হচ্ছে। এখানে অনুকরণ নয়; বরং মিশ্রণের গল্পই গুরুত্বপূর্ণ। একটি লম্বা কামিজের সঙ্গে স্নিকার্স, প্রশস্ত প্যান্টের সঙ্গে ছোট কুর্তি কিংবা সাদামাটা দেশি পোশাকের সঙ্গে আধুনিক ব্যাগ— সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন স্টাইল। ওয়েস্টার্ন আউটফিটকে প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে বরং তার কিছু ধরন-ধারণ ধার করেছে সালোয়ার-কামিজ; তবে তাতে নিজের ব্যাকরণ বদলায়নি।
ওড়নার বদল
সবাই যে ওড়নাকে বিদায় জানিয়েছেন, অর্থাৎ সালোয়ার-কামিজ-ওড়না— এই থ্রি-পিসকে টু-পিসে কমিয়ে নিয়েছেন, তা নয়। ওড়না ব্যবহারের চল এখনো ভালোভাবেই রয়েছে। তবে সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে এর সম্পর্কও বদলেছে সময়ের সঙ্গে। আগে দুই কাঁধে বা মাথায় ওড়না রাখার চল বেশি থাকলেও এখন এর স্টাইলিংয়ের ধরন অনেক বিস্তৃত। এক কাঁধে, গলায়, সামনে ঝুলিয়ে কিংবা একেবারেই বাদ দিয়ে পরছেন কেউ কেউ। ওড়নার কাপড়েও এসেছে বৈচিত্র্য; এতে সুতি, মসলিন, সিল্ক, অর্গানজা কিংবা হালকা জালের মতো ফেব্রিকের ব্যবহার দেখা যায়। ভারী কামিজের সঙ্গে হালকা ওড়না যেমন ভারসাম্য তৈরি করে, তেমনি সাদামাটা পোশাকে কারুকাজ করা ওড়নাই হয়ে উঠতে পারে মূল আকর্ষণ।
সবাই যে ওড়নাকে বিদায় জানিয়েছেন অর্থাৎ সালোয়ার-কামিজ-ওড়না— এই থ্রি-পিসকে টু-পিসে কমিয়ে নিয়েছেন তা নয়। ওড়না ব্যবহারের চল এখনো ভালোভাবেই রয়েছে। তবে সালোয়ার কামিজের সঙ্গে এর সম্পর্কও বদলেছে সময়ের সঙ্গে
কর্মজীবী নারীর পছন্দ
সালোয়ার-কামিজের জনপ্রিয়তার সঙ্গে কর্মজীবনের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা, যাতায়াত, কাজের ব্যস্ততা— সবকিছুর মধ্যে এই টু-পিস ও থ্রি-পিস স্বাচ্ছন্দ্য দেয়। শাড়ির মতো আলাদা করে আঁচল সামলানোর প্রয়োজন নেই; আবার পোশাককে যথেষ্ট পরিপাটি করে তোলাও যায়। অফিসের জন্য একরঙা বা নরম রঙের স্ট্রেট কাট কামিজ, স্ট্রেট প্যান্ট ও কম কারুকাজের ওড়নায় মার্জিত দেখায়। আবার একই পোশাকজুটি সন্ধ্যায় গয়না ও ওড়না বদলে হয়ে উঠতে পারে দাওয়াতের সাজ।
তরুণীর আলমারিতে
একজন তরুণীর কাছে সালোয়ার-কামিজ ভালো লাগার কারণ তার স্বাধীনতায়। একই কামিজ এক দিন দেশি গয়নায়, আরেক দিন স্নিকার্স ও আধুনিক ব্যাগের সঙ্গ নিয়ে পরা যায়। কেউ ওড়না রাখছেন, কেউ বাদ দিচ্ছেন। কেউ লম্বা কামিজ বেছে নিচ্ছেন, কেউ ছোট কুর্তি। অর্থাৎ পোশাক আর নির্দিষ্ট কোনো বয়স বা প্রজন্মের মধ্যে আটকে নেই। নিজের ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী বদলে নেওয়ার জায়গাটিই একে নতুন প্রজন্মের কাছেও দারুণ প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
এক পোশাকে বহু বদল
সকাল থেকে রাত— একই সালোয়ার-কামিজের উপযোগিতা কয়েকবার বদলানো সম্ভব। অফিসে সাদামাটা ব্যাগ ও জুতা, বিকালে ওড়নার ভঙ্গি বদল, সন্ধ্যায় কানের দুল ও জুতা পাল্টে নিলেই তৈরি হতে পারে নতুন সাজ। এই বহুমুখিতা সালোয়ার-কামিজকে করে তুলেছে জনপ্রিয়। ফ্যাশন যত দ্রুত বদলায়, এমন পোশাক তত বেশি টিকে থাকার সুযোগ পায়। কারণ প্রতিবার নতুন পোশাক কিনতে হয় না, পুরনোটিকেই নতুনভাবে পরা যায়।
সময়ের সঙ্গে নিজের মতো
পাশ্চাত্য পোশাকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, ফ্যাশনও হয়েছে অনেক বেশি বৈশ্বিক। তবুও সালোয়ার-কামিজ সরে যায়নি। বরং সালোয়ারের কাট বদলেছে, কামিজ ছোট-বড় হয়েছে, ওড়না নতুনভাবে এসেছে। তবুও এই টু-পিস ও থ্রি-পিসের থেকে গেছে পরিচিত অবয়ব— স্বাচ্ছন্দ্যের পাশাপাশি নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা।






