স্কার্ফে উচ্ছল

ছবি: আগামীর সময়
ফ্যাশনের বিবর্তনে স্কার্ফ সবসময় ধরা দিয়েছে ব্যক্তিত্ব ও রুচির শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। স্টাইলকে করে তুলছে প্রাণবন্ত। লিখেছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
ফ্যাশনের ক্যালেন্ডারে ঋতু বদলায়, ট্রেন্ডের বদলায় রঙ। এই বদলের মধ্যেও কিছু কিছু অনুষঙ্গ ধ্রুবতারার মতো টিকে থাকে। তেমনই একটি হলো স্কার্ফ। এক টুকরো কাপড়, অথচ তার মায়াবী বুননে জড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, সংস্কৃতি আর অগণিত মানুষের ব্যক্তিগত রুচির ছাপ। শীতের উষ্ণতা, গ্রীষ্মের রোদ কিংবা বর্ষার খামখেয়ালি আবহাওয়ায় সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি এটি একধরনের শক্তিশালী স্টাইল স্টেটমেন্ট, যা ব্যক্তির সাধারণ মুহূর্তকেও করে তুলতে পারে অনন্য।
ইতিহাসে আধিপত্য
স্কার্ফের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে ঘাম মোছার জন্য ব্যবহৃত সুডারিয়াম থেকেই মূলত আজকের ফ্যাশনেবল এই অনুষঙ্গের বিবর্তন। আঠারো শতকের ফরাসি রাজদরবার থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর হলিউড আইকনদের মাথায় বাঁধা সিল্কের স্কার্ফ— সবই প্রমাণ করে, এই এক টুকরো কাপড় চিরকালই আভিজাত্যের প্রতীক। আবার মরুভূমির উত্তপ্ত বালু আর ঝোড়ো হাওয়া থেকে মাথা বাঁচানোর জন্য আরবের মরুচারীরা যে স্কার্ফকে সঙ্গী করেছেন, সেটি এখন বিশ্ব ফ্যাশনের অন্যতম শীর্ষ অনুপ্রেরণা। মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সৌন্দর্য ও শালীনতার অনুষঙ্গ হিসেবে স্কার্ফের ব্যবহার গড়ে ওঠে। সেই ঐতিহ্য আজ আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে মিশে পেয়েছে নতুন পরিচয়।
আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে স্কার্ফের রয়েছে আলাদা স্টাইল স্টেটমেন্ট। বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন হাউজগুলোর রানওয়েতে দেখা যায় নানা রঙ, নকশা ও বুননের স্কার্ফ। কখনো মাথা ঢেকে পুরনো হলিউড গ্ল্যামারের আবহ, কখনো গলায় আলগা বাঁধনে নির্ভার আধুনিকতা, আবার কখনো কোমরে বেল্টের মতো ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নতুন মাত্রা।
এক স্কার্ফ, হরেক রূপ
স্কার্ফের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর বহুমুখিতা। একে কীভাবে ব্যবহার করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে বদলে যেতে পারে আপনার পুরো লুক।
ক্ল্যাসিক নট: গলায় সাধারণ গিঁট দিয়ে শার্ট বা টপের সঙ্গে জড়িয়ে নিন। এটি ফরমাল মিটিং বা ক্লাসরুমের জন্য একদম জুতসই।
হলিউড গ্ল্যাম: মাথায় স্কার্ফ জড়িয়ে বড় সানগ্লাস পরে নিন। ষাটের দশকের সেই ক্ল্যাসিক হলিউড ডিভা লুক আপনাকে দেবে আভিজাত্যের স্পর্শ।
বোহেমিয়ান ভাইব: ব্যাগের হাতলে জড়িয়ে দিন কিংবা কোমরে বেল্টের বদলে ব্যবহার করুন রঙিন স্কার্ফ। এই ছোট পরিবর্তনটুকু আপনার সাধারণ পোশাকেও যোগ করবে বোহেমিয়ান এক নান্দনিকতা।
হেডব্যান্ড বা পনিটেল: চুলে স্কার্ফের ব্যবহার এনে দেবে চনমনে এক লুক। পনিটেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্কার্ফ কিংবা হেয়ারব্যান্ড হিসেবে এর ব্যবহার এখন তরুণ প্রজন্মের অন্যতম ফ্যাশন।
সাসটেইনেবল ফ্যাশন: ড্রয়ারে পড়ে থাকা পুরনো বা অনাদৃত পোশাকটিকে একটি রঙিন স্কার্ফের জাদুতে নতুন প্রাণ দিতে পারেন। এই স্টাইলিং শুধু পরিবেশবান্ধব নয়; বরং অপচয় রোধে সচেতন মানুষের দায়িত্বশীলতার পরিচয়ও।
পার্সোনাল টাচ: মায়ের আলমারির পুরনো স্কার্ফকে মাঝেমধ্যে জড়িয়ে নিন। মনে হবে, এক টুকরো স্মৃতি গলার কাছে লেপ্টে আছে।
কখনো মাথা ঢেকে পুরনো হলিউড গ্ল্যামারের আবহ, কখনো গলায় আলগা বাঁধনে নির্ভার আধুনিকতা, আবার কখনো কোমরে বেল্টের মতো ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নতুন মাত্রা
ঋতুর রঙে স্কার্ফের কাব্য
মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির দিনে মন যখন একটু বিষণ্ন, তখন স্কার্ফ হতে পারে আপনার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। ধূসর আকাশে একচিলতে রোদ হয়ে থাকুক উজ্জ্বল হলুদ, কমলা কিংবা নীল রঙের স্কার্ফ। গরমে একরঙা কুর্তি বা কামিজের সঙ্গে প্রিন্টেড বা ফুলেল নকশার এই ফ্যাশন অনুষঙ্গ মুহূর্তেই এনে দেবে উচ্ছলতা। সুতি, জর্জেট বা সিল্ক— আবহাওয়া অনুযায়ী উপাদানের পরিবর্তন আপনার সাজে যোগ করবে আরাম আর স্টাইলের ভারসাম্য।
আবহাওয়া বিবেচনায় স্কার্ফ বেছে নেওয়ার সময় কাপড়ের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। সুতি, মসলিন ও লিনেনের স্কার্ফ গরমে আরাম দেয় এবং সহজে ঘাম শোষণ করে। অন্যদিকে শিফন ও জর্জেট স্কার্ফ ঝরঝরে ও স্টাইলিশ লুক এনে দেয়। উৎসব কিংবা বিশেষ আয়োজনে সিল্ক ও হাফ সিল্কের স্কার্ফ সাজে যোগ করে আভিজাত্য।
দেশীয় ঐতিহ্যে আধুনিকতা
বর্তমানে দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো স্কার্ফের ওপর দারুণ সব নিরীক্ষা চালাচ্ছে। জামদানি মোটিফ, নকশিকাঁথা ফোঁড়, ব্লক প্রিন্ট কিংবা বাটিকের স্কার্ফগুলো আন্তর্জাতিক বাজারেও সমাদৃত। পাশ্চাত্য ঘরানার জিন্স-টপের সঙ্গে দেশীয় মোটিফের স্কার্ফ পরা আধুনিকচেতা অনেকেরই প্রথম পছন্দ। এটি একদিকে যেমন নিজের সংস্কৃতিকে বহন করে, অন্যদিকে পাশ্চাত্য স্টাইলের সঙ্গে গড়ে তোলে দারুণ বৈপরীত্য।
এ সময়ের ফ্যাশনে ফুলেল নকশা, জ্যামিতিক ডিজাইন, অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রিন্ট এবং দেশীয় মোটিফের স্কার্ফ বেশ জনপ্রিয়। ব্লক প্রিন্ট, নকশিকাঁথা কিংবা হাতে আঁকা নকশাও জায়গা করে নিচ্ছে পছন্দের তালিকায়। একরঙা পোশাকের সঙ্গে বিপরীত রঙের স্কার্ফ এখন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। রঙের ক্ষেত্রেও এসেছে বৈচিত্র্য। নুড, অ্যাশ, বেজ, সাদা, কালো কিংবা অলিভের মতো সংযত রঙ যেমন জনপ্রিয়, তেমনি সরিষা হলুদ, কোরাল, ফিরোজা, ফুশিয়া, সবুজ কিংবা টেরাকোটার মতো প্রাণবন্ত রঙও গ্রীষ্ম ও বর্ষার ফ্যাশনে সমানভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
দেশীয় পোশাকের পাশাপাশি পশ্চিমা পোশাকেও স্কার্ফের চলছে জয়রথ। শাড়ি, কুর্তি কিংবা কামিজের সঙ্গে যেমন মানিয়ে যায়, তেমনি টি-শার্ট, শার্ট, ব্লেজার, জিন্স কিংবা ম্যাক্সি ড্রেসের সঙ্গেও এটি অনায়াসে ব্যবহার করা সম্ভব। তাই একটি স্কার্ফ একই সঙ্গে নান্দনিকতা ও ব্যবহারিক সুবিধা এনে দেয়।
বাছাই প্রক্রিয়া
মূল পোশাক যদি একরঙা হয়, তবে স্কার্ফটি হোক গাঢ় বা প্রিন্টেড। আর পোশাক জমকালো হলে ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে হালকা বা ম্যাট শেডের স্কার্ফ বেছে নেওয়া ভালো। বর্ষাকালে আমাদের দেশে কোনো কোনো সময় ভ্যাপসা গরম, আবারও কখনো তুমুল বৃষ্টির ফলে হালকা শীত অনুভূত হয়। গরমে শিফন বা পাতলা সুতি বেছে নিন। শীতের আমেজ থাকলে বেছে নিতে পারেন পশমি বা ভারী ফেব্রিকের স্কার্ফ। খেয়াল রাখতে হবে, স্টাইলিংয়ে যেন ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটে। আপনি যদি লাজুক হন, তবে গলার আলগা বাঁধন যথেষ্ট। আর যদি হন প্রাণখোলা, তবে স্কার্ফের উজ্জ্বল রঙ ও বাঁধনে আনুন সৃজনশীলতা।
স্কার্ফ কেনার সময় শুধু রঙ বা নকশা নয়, আকারও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট স্কার্ফ গলায়, চুলে কিংবা ব্যাগে ব্যবহার করতে সুবিধাজনক। বড়গুলো কাঁধে, মাথায়, এমনকি ওড়নার বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নিজের উচ্চতা, পোশাক ও ব্যবহারের ধরন বিবেচনা করে স্কার্ফ বেছে নিলে সেটি আরও মানানসই দেখায়।
পনিটেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্কার্ফ কিংবা হেয়ারব্যান্ড হিসেবে এর ব্যবহার এখন তরুণ প্রজন্মের অন্যতম ফ্যাশন
কেমন স্কার্ফ, পাবেন কোথায়
মূলত শিফন, জর্জেট ও সিল্ক কাপড়ে তৈরি হয় এই অনুষঙ্গ। তবে সুতি, জামদানি, নেট, ক্রেপ, এন্ডি, উল প্রভৃতি কাপড়ের স্কার্ফও পাওয়া যাচ্ছে। এসবের নকশায় ব্যবহার হয় জরি, চুমকি, এমব্রয়ডারি, লেস ও টারসেল। প্রায় সব মার্কেট ও ফ্যাশন হাউজে পাওয়া যায় নানা নকশার স্কার্ফ। লা রিভ, সেইলর, টুয়েলভ, ইনফিনিটি, ওটু, ইয়ালো, আড়ং, স্মার্টেক্স প্রভৃতি ব্র্যান্ডের শপে এটি সহজলভ্য। এ ছাড়া নিউ মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, মিরপুর, সীমান্ত স্কয়ার, যমুনা ফিউচার পার্ক, ইস্টার্ন প্লাজা, বেইলি রোডেও পাওয়া যাবে।
যত্নআত্তি
স্কার্ফের যত্নও সমান জরুরি। নিয়মিত ব্যবহারে এতে ধুলাবালি জমে যায়। তাই কয়েকবার ব্যবহারের পর ধুয়ে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে মুখ ঢাকার জন্য ব্যবহার করলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে। সিল্কের স্কার্ফ ঠান্ডা পানিতে হালকা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়া এবং ছায়ায় শুকানো ভালো। এতে কাপড়ের রঙ ও গুণগত মান দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ন থাকে।






