টো টো কোম্পানি
মেঘের কোলে ছাঙ্গু লেক

ছাঙ্গু লেক থেকে কেবল কারে চড়ে উঠে যাওয়া যায় আরও উঁচুতে। ছবি: লেখক
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ফুট উঁচুতে, মেঘের কোলঘেঁষে এক টুকরো নীলকান্তমণির মতো জেগে আছে সিকিমের ছাঙ্গু লেক। সিকিমের এই হ্রদ ভ্রমণের গল্প বলেছেন ফাহিম মাশরুর
গ্যাংটক শহর পেরোতেই শুরু পাহাড়ি রাস্তা। ভয়ংকর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে চলছে গাড়ি। কখন গন্তব্যে পৌঁছাব, তর যে সইছে না। প্রায় দুই ঘণ্টা যাত্রা শেষে দেখা মিলল ছাঙ্গু লেকের। চারপাশের বরফঢাকা পাহাড়ের শুভ্র নিস্তব্ধতা, এর মাঝে দাঁড়িয়ে সেই জাদুকরী লেকের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এ যেন পৃথিবীর বাইরের এক দৃশ্য!
সিকিম ভ্রমণের পঞ্চম দিনে চলে যাই ছাঙ্গু হ্রদে। গ্যাংটক শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। তবে পাহাড়ি রাস্তার সুবাদে বেশ সময় লেগে যায় পৌঁছাতে। যাত্রাপথে প্রায় সব গাড়িই থামে পাহাড়ের বুকে গড়ে ওঠা ছোট্ট কিছু দোকানে। সকালের নাশতা মানেই এখানে ম্যাগি। সঙ্গে অমলেট ও পাউরুটি। প্রায় শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় ধোঁয়া ওঠা ম্যাগি খেতে এককথায় দুর্দান্ত!
স্থানীয় ভুটিয়া ভাষায় ‘ছাঙ্গু’ শব্দের অর্থ ‘পানির উৎস’। শুধু পর্যটন কেন্দ্র নয়, এই হ্রদটিকে সিকিমের বাসিন্দারা অত্যন্ত পবিত্র মনে করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই হ্রদের পানিতে ঔষধি গুণ রয়েছে। তাই হ্রদের পবিত্রতা রক্ষায় এর পানিতে নামা বা দূষিত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রাচীনকালে সিকিমের বৌদ্ধ লামারা হ্রদের পানির রঙ দেখে ভবিষ্যতের পূর্বাভাসও দিতেন। বলা হতো, পানির রঙ যদি গাঢ় বা ময়লাটে হতো, তবে তা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কঠিন সময়ের ইঙ্গিত দিত। আর স্বচ্ছ পানি বোঝাত শান্তিময় ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।
নভেম্বর থেকে মার্চ, শীতে পুরো হ্রদটি বরফে জমে শক্ত হয়ে যায়। চারপাশের তুষারাবৃত পাহাড় এবং বরফে ঢাকা হ্রদের দৃশ্য যেন কোনো রূপকথার রাজ্যকে মনে করিয়ে দেয়। আমরা জানুয়ারি মাসে যাওয়ায় ঠিক এমনই পেয়েছিলাম। এপ্রিল থেকে মে— গলতে থাকে লেকের বরফ। এ সময় হ্রদের পাড়ঘেঁষে রডোড্রেনড্রন, প্রিমুলা এবং নানা বুনো ফুল ফোটে, যা পুরো এলাকাকে এক রঙিন ক্যানভাসে পরিণত করে।
লেকের ধারে নেমেই দেখলাম বিশাল আকৃতির কিছু ইয়াক দাঁড়িয়ে আছে। রঙিন সাজে সজ্জিত ইয়াকের পিঠে চড়ে হ্রদের পাড়ঘেঁষে ঘুরে বেড়ানো এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী সিকিমি পোশাক পরে ছবি তোলার সুযোগও রয়েছে। আমার স্ত্রী, বোন, কাজিন— সবাই সেই পোশাক পরে ছবি তুলল। আমিও লোভ সামলাতে পারলাম না! আমার মেয়ে কাজিনদের সঙ্গে ইয়াকে চড়ে ঘুরে বেড়াল। তার ভাষ্যমতে, এ তো লোমশ বড় গরু!
বোন ও স্ত্রীর খানিকটা জোরাজুরিতেই লেকের পাশে থাকা কেবল কারে উঠলাম। জনপ্রতি ৩০০ রুপি ফির সেই কেবল কারের নিরাপত্তা বলতে মরিচা ধরা এক ছিটকিনি! যখন সেটা ওপরে উঠতে শুরু করল, প্রাণ যায় যায় অবস্থা! ডানে-বামে হেলতে-দুলতে তরতর করে উঠছে শত শত ফুট। নিচে তাকালে মনে হয়, এই বুঝি পড়ে যাব! এতগুলো টাকা খরচ করে উঠে কি তবে বেঘোরে প্রাণটাই যাবে— বারবার এটাই মনে হচ্ছিল।
ওপরে উঠতেই অপার্থিব এক সৌন্দর্যের মুখোমুখি হলাম। সামনে তাকালে শুধু শুভ্র সাদা পাহাড় ও মেঘ। মেঘ সরে যেতেই ধরা দিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। সিকিম ভ্রমণে সেই প্রথমবার এত পরিষ্কারভাবে সেই সোনার পাহাড় দেখার সৌভাগ্য হলো। পুরো সিকিম ভ্রমণের সেরা সময়টুকু মনে হয় আমরা এই জায়গাতেই কাটালাম।
স্থানীয়রা জানাল, আমরা ছাঙ্গু লেক থেকে আরও ৬ হাজার ফুট উঁচুতে উঠে এসেছি। প্রায় ১৮ হাজার ফুট উঁচুতে এসে স্বভাবতই শ্বাস-প্রশ্বাসে খানিকটা কষ্ট হচ্ছিল। বিশেষ করে যত বাচ্চা এখানে এসেছে, প্রায় সবাইকে অক্সিজেন নিতে হয়েছে। আমার তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিচে তার দাদির কাছে রেখে এসে খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছি বলেই মনে হলো!
ফিরতি কেবল কার ছিল ২৫-৩০ মিনিট পর। পুরোটা সময় যেন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ইচ্ছা না হলেও নামতে তো হবেই। আবারও সেই একই দুলুনি। এবার অবশ্য শুরুর মতো তেমন ভয় কাজ করছিল না।
মাত্র কয়েক ঘণ্টায় হাজারো স্মৃতি, একরাশ মুগ্ধতা, স্থানীয়দের ভালোবাসা নিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। শান্ত বিকালে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যখন গ্যাংটক শহরে প্রবেশ করছে আমাদের গাড়ি, তখন হঠাৎ হঠাৎ মেঘের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা।
কীভাবে যাবেন
বাংলাদেশ থেকে প্রথমে যেতে হবে জলপাইগুড়ি অথবা শিলিগুড়ি। আমরা ট্রেনে জলপাইগুড়ি গিয়ে সেখান থেকেই সিকিমে প্রবেশ করেছি। বর্তমানে রেলপথ বন্ধ থাকায় বাংলাবান্ধা বর্ডার দিয়ে স্থলপথে ভারতে প্রবেশ করতে হবে। সেখান থেকে ৪ বা ৭ সিটের গাড়ি ভাড়া নিয়ে সরাসরি যাওয়া যাবে গ্যাংটকে। ভাড়া গাড়িপ্রতি আনুমানিক ৫ থেকে ৭ হাজার রুপি। গ্যাংটক থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে ছাঙ্গু লেক ঘুরে আসা যায়। গাড়িপ্রতি সেখানে নেবে দুই থেকে আড়াই হাজার রুপি।
বাংলাদেশি নাগরিকদের সিকিমে প্রবেশের জন্য পারমিট সংগ্রহ করতে হয়। ভারতীয় ভিসা ও পাসপোর্টের কপি দিয়ে সহজেই এই অনুমতি নির্দিষ্ট চেকপোস্ট থেকে সংগ্রহ করা যায়।






