টোটো কোম্পানি
রাতের আমিয়াখুম

ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। একপাশে খাড়া পাথুরে দেয়াল, অন্যপাশে হাজার ফুট গভীর খাদ। মাঝে এক ফুট পরিমাণ পায়ে হাঁটার ট্রেইল। একজন মানুষ কোনোমতে দাঁড়াতে পারে। বান্দরবানের গহিনে এই পাহাড় ঘিরে প্রচলিত আছে অনেক লোককথা। স্থানীয়রা এ পাহাড়টিকে পুজো করে, তাই নাম দেবতা পাহাড়। এখানে মাঝেমধ্যেই নাকি ভুতুড়ে সব ঘটনা ঘটে। কখনো দেখা যায় কালো বিড়াল, কখনো অদ্ভুতদর্শন কুকুর; সেগুলো মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়! পাহাড়ের সন্তানদের কাছে এটা বিপৎসংকেত। এমন কিছু ঘটলে রুষ্ট দেবতাকে তুষ্ট করতে হয় পশু বলি দিয়ে! রাতের আঁধারে এ পাহাড় পেরোনো নিষেধ, স্থানীয়রা পছন্দ করেন না।
সবসময় সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়ে ওঠে না। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, সকাল সকাল রওনা হয়ে দেবতা পাহাড় বেয়ে আমিয়াখুম জলপ্রপাতে নামব। এরপর ভেলাখুমে ভেসে বেড়াব। রাতে থাকব অতিরাংপাড়ায়। কিন্তু লাল দুসাং কারবারিপাড়া থেকে পথের নানা বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে আমরা যখন দেবতা পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম, তখন সূর্য অস্ত গেছে। পাহাড়ে ঘনিয়েছে অন্ধকার। সুন্দরী আমিয়াখুম দেখতে এই পাহাড় বেয়ে নামতেই হবে। পাহাড়ে ওঠা যত সহজ, নামা ততটাই কঠিন— দেবতা পাহাড় বেয়ে নামার সময় এই আপ্তবাক্য না মেনে উপায় নেই।
স্থানীয়দের নজর এড়াতে কোনো আলো জ্বালানো যাবে না। সন্ধ্যার আবছায়ায় অভিজ্ঞতা আর অনুমানের ওপর ভর করে আমরা নামতে শুরু করি। শুষ্ক আবহাওয়া। পাহাড়ের মাটি ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। পা রাখতে গেলেই হড়কে যাচ্ছে। তার ওপর নেই পর্যাপ্ত আলো। দলের সবাই অভিজ্ঞ ট্র্যাকার, তবু অদ্ভুতভাবে অনেককেই পেয়ে বসল উচ্চতাভীতি! সামনে দেখা যাচ্ছে পা রাখার জায়গা, কিন্তু পা বাড়ালেই আর মাটির স্পর্শ মিলছে না! হতে পারে এটা চোখের ধাঁধা, কিন্তু মুহূর্তেই আতঙ্ক জেঁকে ধরল সবাইকে। শুরু হলো প্যানিক অ্যাটাক। থেমে গেল পুরো দল। তখন পাহাড়ের অর্ধেকটাও নামা হয়নি। খাদের কিনারায় সবাই আটকে আছি। এমন বিপদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মাথা ঠান্ডা রাখা। আমাদের মাথা ঠান্ডা ছিল। একটু দম নিয়ে, একে অন্যের হাত ধরে সারিবদ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে শুরু হলো পাহাড় বেয়ে নামা। কিন্তু বিপদের তখনো বাকি।
দেবতা পাহাড়ের অর্ধেকটা নামতেই কানে মধুবর্ষণ করতে লাগল আমিয়াখুম জলপ্রপাতের সুমধুর ঝংকার। এই অপরূপার কলতানে ততক্ষণে সবার ভয় কেটে গেছে। বেড়েছে হাঁটার গতি। তর সইছিল না। কতক্ষণে পৌঁছব আমিয়াখুম? হঠাৎ দেখা মিলল একটি লোহার সিঁড়ির। পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত খাড়া জায়গায় এমন সিঁড়ি বসানো হয়েছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই ভেসে এলো কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর। ঝরনার শব্দে বোঝা যাচ্ছিল না, তারা কারা। আমরা আবারও থেমে গেলাম। মিনিট পনেরো পর চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন করে তিনজন স্থানীয় তরুণ উঠে এলেন আমাদের সামনে। আমরা কেউ কারও ভাষা জানি না। তাদের বেশ রাগান্বিত মনে হচ্ছিল। সে যাত্রায় রক্ষাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো আমাদের গাইড বীর বাহাদুর। সদ্য কৈশোর পেরোনো ছেলেটি আগন্তুকদের সঙ্গে কথা বলে অল্প কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করল। পরে জানলাম, রাতের বেলায় দেবতা পাহাড় থেকে নামতে দেখে আগন্তুকরা ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। বিপদ কেটে গেল। আমরা দ্রুতপায়ে নামতে শুরু করলাম। যতই নামছি, ততই বাড়ছে জলপ্রপাতের শব্দ।
শেষ পাথরটি পেরিয়ে আমিয়াখুমের পাশে আসতেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম সবাই। এখানে ধরা পড়ার ভয় নেই, জ্বলে উঠল সব হেডটর্চ। রাতের আঁধারে কৃত্রিম আলোয় হীরের মতো প্রস্ফুটিত হলো রূপবতী আমিয়াখুম। পাথুরে বুক বেয়ে নেমে আসছে বিশাল জলধারা, নিচে গভীর খুম। দিনের আলোয় হলে হয়তো খুমের জলে একচোট ঝাঁপাঝাঁপি হয়ে যেত। কিন্তু আমিয়াখুম আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে রাতের অপ্সরা হয়ে। ঝরনাটির নিচেই একটি বড় পাথর আছে। ব্যাগপত্র রেখে সেই পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে নানা ভঙ্গিমায় চলল ফটোসেশন। আমিয়াখুমে তো সবাই দিনেই যায়, রাতের সুন্দরীকে দেখার সৌভাগ্য কজনের হয়? অনেকটা সময় কাটিয়ে আমরা রওনা হলাম অতিরাংপাড়ার দিকে। ফেরার পথে মনটা বিষিয়ে দিল ঝরনার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য। হাতের কাছে যতগুলো পেলাম, তুলে নিয়ে ব্যাগে ভরে হাঁটতে লাগলাম। পেছনে শোনা যেতে লাগল আমিয়াখুমের মায়াবী আহ্বান।
জেনে রাখুন
ঢাকা থেকে প্রথমে বাসে চড়ে বান্দরবান জেলা সদরে পৌঁছাতে হবে। এরপর সেখান থেকে চান্দের গাড়ি বা জিপে চেপে থানচি উপজেলায় যেতে হবে। থানচি থেকে প্রশাসন নির্ধারিত স্থানীয় গাইড এবং অনুমতি নিয়ে ইঞ্জিনবোট বা নৌকায় সাঙ্গু নদী পাড়ি দিয়ে রেমাক্রি হয়ে অথবা থানচি থেকে সরাসরি পদ্মঝিরি রুট ধরে ট্র্যাকিং শুরু করতে হয়। পথে তিন্দু, বড়পাথর, দুর্গম পাহাড় এবং রোমাঞ্চকর ঝিরিপথ ও খাড়া ‘দেবতা পাহাড়’ পাড়ি দিয়ে হেঁটে পৌঁছাতে হয় দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গহিন জলপ্রপাত আমিয়াখুমে। এ যাত্রায় আশপাশে দেখার মতো চমৎকার স্থানের অভাব নেই। আমিয়াখুমের ঠিক কাছাকাছি জাদুকরী সৌন্দর্যের আধার ‘ভেলাখুম’ ও ‘সাতভাইখুম’-এর শীতল জলে ভেলায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো যায়। এ ছাড়া এই ট্র্যাকিং ট্রেইলে রয়েছে অপরূপ সুন্দর ‘নাফাখুম জলপ্রপাত’, জিংলিমপাড়া, থুইসাপাড়ার মতো পাহাড়ি জনপদ এবং চারপাশের মেঘে ঢাকা বিশাল সব সবুজ পাহাড় ও নদীঘেরা আদিম প্রকৃতি, যা যেকোনো ভ্রমণপিপাসুকে মুগ্ধ করে।



