টোটো কোম্পানী
এভারেস্ট বেসক্যাম্প: এক নবীনের অভিজ্ঞতা

ইবিসি রুটে আমা দাবলাম পর্বতের সামনে লেখক
অভিজ্ঞ একজন পর্বতারোহীর জন্য এভারেস্ট বেসক্যাম্প (ইবিসি) ভ্রমণ খুব কঠিন নয়। কিন্তু পাহাড়ি পথে ট্রেকিংয়ের সঙ্গে যারা কম পরিচিত, তাদের জন্য এটি এক কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষার নাম। শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে যখন কেউ প্রথমবার এ পথে পা বাড়ান, তখন কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় এবং কীভাবে সেগুলোর সমাধান করতে হয়, সেটাই আমার এই ইবিসি অভিযানের অভিজ্ঞতা।
দেশের বাইরে বড় কোনো পর্বত আরোহণের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিজেকে প্রস্তুত করতে আমি নিয়মিত ১০ তলা বাসার সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করতাম। এমনকি দিনের পর দিন সংসদ ভবনের চারপাশে ৮ থেকে ১০ কেজি ওজনের ভারী ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে হেঁটেছি। এই শারীরিক কসরত আমাকে পাহাড়ে গিয়ে দারুণভাবে সাহায্য করেছে।
৭ অক্টোবর লুকলায় পা রাখার পর শুরু হলো হেঁটে যাত্রা। এবারের এই ১২ জনের আন্তর্জাতিক দলে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিলি, জাপান ও পোল্যান্ডের ট্রেকাররা আমার সঙ্গে ছিলেন। যাত্রা শুরুর পরই আমার একটি বড় গেজেট ক্রাইসিস দেখা দিল। আমি স্লিপিং ব্যাগ না কিনে রওনা হয়ে গিয়েছিলাম! পাহাড়ি ঠান্ডায় যখন রাতের ঘুম হারাম হওয়ার উপক্রম, তখন গাইডদের পরামর্শে নামচে বাজার থেকেই একটি স্লিপিং ব্যাগ কিনে নেওয়া হয়। এ ছাড়া ট্রেইলে হাঁটার সময় হাতের হ্যান্ডগ্লাভস ভিজে গিয়েছিল এবং একটি পাতলা গ্লাভস হারিয়েও ফেলেছিলাম। ভেজা বা পাতলা কাপড়ের কারণে হাত বরফ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই পাহাড়ে অন্তত একজোড়া অতিরিক্ত ভালোমানের ওয়াটারপ্রুফ ও থার্মাল হ্যান্ডগ্লাভস সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক।
পাহাড়ে গিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা। সবকিছু পরিকল্পিতভাবে দুটি ভাগে ভাগ করে সাজাতে হবে— পিঠের ছোট ডে-প্যাক এবং পোর্টার বা ইয়াগের পিঠে থাকা বড় ডাফেল ব্যাগ। দিনের বেলায় হাঁটার সময় যা যা প্রয়োজন হতে পারে (রেইনকোট, ফ্লাস্কের পানি, ফার্স্ট এইড, স্ন্যাকস বা অতিরিক্ত হ্যান্ডগ্লাভস); তা নিজের ডে-প্যাকে হাতের কাছে রাখতে হবে, যাতে বড় ব্যাগ খোলা না লাগে।
কঠিন চড়াইতে ওঠার সময় মুখ হাঁ করে বাতাস ছাড়তে হবে, এতে ফুসফুসের ওপর চাপ অনেক কমবে
প্রথম রাতের গন্তব্য ফাকডিং পেরিয়ে আমরা এসে পৌঁছাই ট্রেকারদের রাজধানী ‘নামচে বাজার’-এ। সেখানে পৌঁছেই আমরা ৩৮৮০ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট ভিউ পয়েন্টে হাইকিং করে শরীরকে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর্ব সম্পন্ন করি। নিয়ম হলো, ধীরে ধীরে উচ্চতা বাড়ান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা। এ ছাড়া গাইড আমাদের একটি চমৎকার কৌশল শিখিয়েছিলেন, কঠিন চড়াইতে ওঠার সময় প্রতিটি পদক্ষেপে মুখ হাঁ করে জোরে শ্বাস ফেলে বাতাস ছাড়তে হবে, এতে ফুসফুসের ওপর চাপ অনেক কমে যায়।
অনেকেই ব্লগে পড়ে ভাবেন, একা একাই ঘুরে আসা যায়, যা আসলে একটি ভয়ংকর লেভেলের ঝুঁকি। উচ্চতায় আপনার শরীর ঠিক কী ধরনের পারফর্ম করবে, সে সম্পর্কে পূর্ব ধারণা না থাকলে এ ঝুঁকি নেবেন না; নতুন হলে তো প্রশ্নই আসে না। সবসময় গ্রুপে থাকার চেষ্টা করুন আর একা হলে পোর্টার বা গাইডদের সাহায্য নিন। ৪৪১০ মিটার উচ্চতার ডিংবোচেতে এক দিন বিশ্রাম ও শরীরকে অভ্যস্ত করার পর ১৩ অক্টোবর আমরা লাবুচের উদ্দেশে রওনা হই। বেসক্যাম্পের ঠিক আগের জায়গায় পৌঁছানোর পর আমার অবস্থা এমন হয়েছিল যে, কথা বলতেও ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল। আমার মতো একই অবস্থা হয়েছিল আরও কয়েকজনের। এ সময় গাইড আমার কানে কানে বললেন, ‘দেখো, বিদেশিরা পাহাড়ে হাঁটায় অভ্যস্ত আর আমরা নেপালিরাও অভ্যস্ত। তুমি সমতলের মানুষ, তাই তুমি লজ্জা পেয়ো না। পাল্লা দিয়ে যাওয়ার দরকার নেই, তুমি তোমার মতো ধীরে চলো।’ এরপর পুরো রাস্তা আমি আমার মতো ধীরেসুস্থে চলেছি। ফলে আমার বিশ্রামের সময়ও কম লেগেছে। যারা একটু দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের বারবার ক্লান্ত হয়ে থামতে হয়েছিল। অথচ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই প্রায় একই সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে যাই।
১৪ অক্টোবর। ৫৩৬৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এভারেস্ট বেসক্যাম্পে পৌঁছানোর পর চারপাশের হাড়কাঁপানো বাতাস আর অক্সিজেন সংকটের সঙ্গে লড়তে হয়েছে। ক্ষুধামান্দ্য সত্ত্বেও বারবার ছোট চুমুকে গ্লুকোজ বা ওরস্যালাইন খেয়ে শরীর সচল রাখার চেষ্টা করেছি। সমস্ত বাধা পেরিয়ে যখন বেসক্যাম্পে আমাদের লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দিলাম, গত কয়েক দিনের সব হাড়ভাঙা পরিশ্রম সার্থক বলে মনে হলো।
চাই সঠিক প্রস্তুতি
০৩ নভেম্বর ২০২৬




