জাবি হলের ওয়াশরুমে ‘হিন্দু ছাত্রীর’ ভিডিও ধারণের দাবিটি বিভ্রান্তিকর

ছবি: আগামীর সময়
সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক হিন্দু ছাত্রীর গোপন ভিডিও ধারণের সময় একজন যুবককে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে—দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘Kolkata24x7’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের (হল) ওয়াশরুমে ওই ঘটনা ঘটে এবং ভুক্তভোগী একজন হিন্দু শিক্ষার্থী। একই দাবিতে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড এবং অন্যান্য ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও একটি ভিডিও প্রচারিত হতে দেখা যায়।
তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গোপনে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে এক বহিরাগত যুবক আটক হওয়ার ঘটনাটি সত্য হলেও, একে কেন্দ্র করে প্রচারিত ধর্মীয় ও স্থান সংক্রান্ত দাবিগুলো সঠিক নয়। অভিযুক্তকে কোনো নারী হল থেকে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ভবন থেকে আটক করা হয়। এছাড়া হিন্দু শিক্ষার্থীর ভিডিও ধারণ করার দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ভুক্তভোগী একজন নন, বরং একাধিক।
আসল ঘটনা
আলোচিত দাবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘প্রথম আলো’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৯ জুন দিবাগত রাত দুইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) গোপনে ওয়াশরুমে ছাত্রীদের ভিডিও করার অভিযোগে রিয়াজ আহমেদ নামের এক বহিরাগত যুবককে আটক করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের ব্রাজিল বনাম জাপানের খেলা দেখছিলেন শিক্ষার্থীরা। খেলা শেষে ছাত্রীদের কয়েকজন টিএসসির ওয়াশরুমে যান। এ সময় ছাত্রীদের ওয়াশরুমে কোনো পুরুষ ঢুকে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে গেছেন—এমন সন্দেহ করেন একজন। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে কয়েকজন ছাত্রী ওই যুবককে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে তাঁর মুঠোফোন তল্লাশি করে দেখতে পান, তিনি ওয়াশরুমের দরজার ছোট ছিদ্র দিয়ে ভিডিও ধারণ করেছেন।
ভুক্তভোগীর সংখ্যা ও ধর্মীয় পরিচয়ের বিভ্রান্তি
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, রিয়াজের ফোনের গ্যালারিতে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্পাসের ছাত্রীদের এমন অনেক স্পর্শকাতর ভিডিও পাওয়া যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের কয়েকজন তাঁকে পিটুনি দেন। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে নিরাপত্তাশাখার কর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে পুলিশে সোপর্দ করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রিয়াজ আহমেদের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথম আলোসহ অন্যান্য গণমাধ্যমের কোনো প্রতিবেদনেই ঘটনাস্থলকে হোস্টেল বা হলের ওয়াশরুম বলা হয়নি। পাশাপাশি, প্রতিবেদনের কোথাও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। যেহেতু অভিযুক্ত যুবক বেশ কয়েক মাস যাবৎ এমন ভিডিও ধারণ করে আসছিলেন, সেহেতু যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যতীত কারও পক্ষে ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
সামগ্রিক তথ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে এটি নিশ্চিত যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বহিরাগতের বিরুদ্ধে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগটি সত্য। তবে বাস্তব এই ঘটনাটিকে বিকৃত করে ‘হোস্টেলের ওয়াশরুমে এক হিন্দু ছাত্রীর ভিডিও ধারণ’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতীয় গণমাধ্যমে যে প্রচার চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন।








