নোয়াখালীতে যুব মহিলা লীগ নেত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ভাইরাল দাবিটি ভুয়া

ছবি: আগামীর সময়
নোয়াখালী সদর উপজেলার যুব মহিলা লীগের সদস্য নাজমুন নাহারকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, ভিডিও এবং স্ট্যাটাস দিয়ে অনেকেই ছড়িয়েছে।
তবে যাচাই করে দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিও, স্ট্যাটাস এবং ছবির দাবিটি সঠিক নয়। মূলত গত আগস্ট মাসে মাদারীপুরে শম্পা খাতুন নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
কী ভিডিও ছড়াচ্ছে?
ফেসবুকের ‘Sajjed Hossain Rasel’ নামের একটি আইডি থেকে গত ২৩ অক্টোবর ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। তার ক্যাপশনে লেখা— ‘নোয়াখালী সদর উপজেলার— যুব মহিলা লীগের সদস্য নাজমুন নাহারকে ধর্ষণের পর করে হত্যা করা হয়। সেও কারও না কারও মা, বোন, মেয়ে, আল্লাহ ছাড় দেয় ছেড়ে দেয় না।’ ভিডিওতে দেখা যায়, ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটি মৃতদেহ দেখা যাচ্ছে এবং দুজন মহিলা লাশটিকে সোজা করে দেখছেন।
কী স্ট্যাটাস ও ছবি ছড়াচ্ছে?
গত ২৪ অক্টোবর ‘Sheikh Sohel Ahmed Talukdar’ নামের একটি আইডি থেকে স্ট্যাটাস পোস্ট করে লেখা হয়, ‘নোয়াখালী সদর উপজেলার যুব মহিলা লীগের সদস্য নাজমুন নাহারকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। মনে রেখো বাংলাদেশ।’ এবং অপর একটি ‘Imran Khan’ নামের আইডি থেকে আজ সোমবার ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, ‘নোয়াখালী সদর উপজেলার যুব মহিলা লীগের সদস্য নাজমুন নাহারকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। মনে রেখো বাংলাদেশ। তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’
যাচাইয়ে যা মিলছে
অনুসন্ধানে আলোচিত দাবিটির বিষয়ে সার্চ করা হলে ‘Noakhali district police’ নামের একটি পেজ থেকে গত ২৩ অক্টোবরের একটি বিবৃতি পাওয়া যায়। বিবৃতিতে নোয়াখালী মিডিয়া সেলের বরাতে নাজমুন নাহার হত্যাকাণ্ডের পুরনো ঘটনাকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে প্রচার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির বিষয়ে সতর্ক করা হয়। সেখানে আরও বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোয়াখালী সদর উপজেলায় যুব মহিলা লীগের এক নারী সদস্যকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে মর্মে একটি তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টি নোয়াখালী জেলা পুলিশের নজরে এলে এর সত্যতা যাচাই করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও স্থানীয় জনসাধারণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় এ ধরনের কোনো ঘটনা সম্প্রতি ঘটেনি এবং এটি একটি বিভ্রান্তিকর মিথ্যা তথ্য।
বিবৃতিতে নোয়াখালী জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। কোনো অপরাধের ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের সহায়তা নিন। গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবেন না।
রিভার্স ইমেজ সার্চে, ‘Arab Times’ নামক একটি সংবাদমাধ্যমে গত ২৪ আগস্ট ‘বাংলাদেশের ভয়াবহতা: দুটি লোমহর্ষক হত্যা মামলায় পাঁচজন নিহত, পুলিশ সন্দেহভাজনদের আটক করেছে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে সংযুক্ত ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে প্রচারিত ছবি দুটির হুবহু মিল পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদারীপুরের শম্পা খাতুন নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এর পাঁচ দিন পরে তার সন্তানের মরদেহ আরিয়াল খাঁ নদীর পাশে পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে ‘মাদারীপুর সমাচার’ নামক ফেসবুক পেজে গত ১৯ আগস্ট ওই ঘটনার বিবরণীসহ একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওর ক্যাপশানে লেখা হয়, মাদারীপুরে অজ্ঞাত এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে শিবচর উপজেলার মাদবরচর ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের বাখরেরকান্দি গ্রামের জঙ্গলের ভেতর থেকে অজ্ঞাত মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। জানা যায়, শিবচরের দারুসুন্নাহ ইসলামিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন জঙ্গলের ভেতর এক নারীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে শিবচর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে মরদেহটি উদ্ধার করে। নিহতের বয়স ২০ থেকে ২৩ বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং পরিচয় শনাক্তে পুলিশ কাজ করছে। মাদারীপুরের শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল হোসেন জানান, নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও অধিকতর অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৩ অক্টোবরের ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ ফ্ল্যাট থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুব মহিলা লীগ নেত্রী ডালিয়া আক্তার সুমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, যা নাজমুন নাহার নামের কেউ নন।
এছাড়া অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই ‘ঢাকা মেইলে’প্রকাশিত নাজমুন নাহার নামের একজনের মৃত্যুর একটি মানববন্ধনের প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লক্ষ্মীপুরে ডাকাতি করতে বাসায় ঢুকে সৌদি প্রবাসীর স্ত্রী নাজমুন নাহারকে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন করা হয়েছে। ওই হত্যাকাণ্ডে মোহন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ৯ জুলাই দুপুরে সদর মডেল থানার পুলিশ উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম চরমনসা গ্রামের নূরউজ্জামানের ঘর থেকে তার স্ত্রী নাজমুন নাহারের (৫০) হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল। ধারণা করা হয়েছিল, ভোররাতে ডাকাত দলের সদস্যরা প্রবাসীর ঘরের ভেন্টিলেটর ভেঙে প্রবেশ করে লুটপাট শেষে তাকে হত্যা করে।
অর্থাৎ, নোয়াখালী সদর উপজেলার যুব মহিলা লীগের সদস্য নাজমুন নাহারকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে দাবিতে প্রচারিত স্ট্যাটাস, ছবি ও ভিডিওগুলো গত আগস্ট মাসে মাদারীপুরে শম্পা খাতুন নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার। পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে বর্তমান সময়ের বলে এই বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।






