‘প্রশ্ন তোলা ফ্যাসিস্টদের আচরণ’— হাসনাত কি বলেছেন?

ছবি: আগামীর সময়
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর নামে একটি চাঞ্চল্যকর মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফটোকার্ড আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই ফটোকার্ডে দাবি করা হচ্ছে, হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন‘আমি হয়তো ১০ কোটি টাকা গোপনে নিয়েছি, কিন্তু তা জনগণের উন্নয়নই ব্যয় করেছি; এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা ফ্যাসিস্টদের আচরণ।’ তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবির কোনো সত্যতা বা ভিত্তি নেই। মূলত একটি স্যাটায়ার (ব্যঙ্গাত্মক) পেজের তৈরি করা মনগড়া বক্তব্যকে বাস্তব ভেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুলভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রেক্ষাপট ও ভাইরাল দাবি
গত ৩১ মে ‘Bengali Steam’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রথম এই ফটোকার্ডটি প্রকাশ করা হয়। এরপর সেটি দ্রুত বিভিন্ন পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়ে। ‘Sanzana Choity Popy’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকেও ফটোকার্ডটি শেয়ার করে কটাক্ষপূর্ণ ক্যাপশন দেওয়া হয়। ছড়ানো পোস্টগুলোর মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনেক সাধারণ ব্যবহারকারী তথ্যটির সত্যতা যাচাই না করেই এটিকে আসল মন্তব্য ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তবে ছড়িয়ে পড়া ওই ফটোকার্ডে এই কথিত বক্তব্যের কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস, সময় বা কোনো প্রেক্ষাপটের উল্লেখ ছিল না।
অনুসন্ধান ও আসল ঘটনা
বক্তব্যটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমত হাসনাত আবদুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ এবং দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে অনুসন্ধান চালানো হয়। কিন্তু কোথাও তাঁর এমন কোনো মন্তব্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ৩১ মে জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কুমিল্লা জেলা পরিষদের বাজেট বরাদ্দ নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া প্রথমে একটি অভিযোগের সুরে বলেছিলেন, এনসিপির নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ১৫ কোটি এবং হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা জেলা পরিষদ থেকে নিয়েছেন।
টাকা নেওয়ার প্রকৃত ব্যাখ্যা
তবে ওই প্রতিবেদনেই মোস্তাক মিয়া পরবর্তীতে স্পষ্ট করেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কারও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেননি। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল—উপজেলার বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দের নামে এই বড় অঙ্কের অর্থগুলো নেওয়া হয়েছে, যার ফলে অন্য উপজেলাগুলো কাঙ্ক্ষিত বাজেট থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এই বিষয়ে হাসনাত আবদুল্লাহও গণমাধ্যমের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, এই অর্থ কোনো ব্যক্তিবিশেষকে দেওয়া হয়নি; বরং সংশ্লিষ্ট উপজেলার রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বাজেট হিসেবে সরকারি নিয়মে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা পরিষদ প্রশাসকের বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ নেওয়ার একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়। একই ইস্যুতে ‘ডেইলি স্টার’ ও ‘বিবিসি বাংলা’ প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও কোথাও হাসনাত আবদুল্লাহর ফটোকার্ডে উল্লিখিত বিতর্কিত মন্তব্যটির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গুজবের মূল উৎস ‘স্যাটায়ার পেজ’
অনুসন্ধানে ফটোকার্ডটির মূল উৎস ‘Bengali Steam’ পেজটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তারা প্রায়শই তথ্য-প্রমাণ ছাড়া বিভিন্ন রসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট প্রকাশ করে। খোদ পেজটির ‘বায়ো’ (Bio) বা পরিচিতি অংশে এটি যে একটি ‘Satire/Parody’ (ব্যঙ্গাত্মক/প্যারোডি) পেজ, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক সূত্র বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে, হাসনাত আবদুল্লাহ নামে প্রচারিত মন্তব্যটি করেননি। একটি ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজের মনগড়া ও কাল্পনিক বক্তব্যকে সত্য মনে করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।








