এন্ড্রু কিশোর : গানে আছেন, মনে আছেন, স্মরণে কেন নেই

এন্ড্রু কিশোর (৪ নভেম্বর ১৯৫৫ - ৬ জুলাই ২০২০)
এন্ড্রু কিশোর গাইতেন চলচ্চিত্রে। আর সেসব গান সারা দুপুর, বিকেলজুড়ে রেডিওতে বেজে যেত। দুপুরে খেয়ে কিংবা খাওয়ার আগেই রেডিও সচল রাখতেন শ্রোতারা। বেজে চলত একের পর এক সংগীতমালা। একেকটি সংগীতমালায় তিনটি করে গান। যার বেশিরভাগই এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া। নব্বই দশকজুড়ে এমনটাই ছিল চিত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গান শোনার ধরন বদলেছে, কিন্তু এন্ড্রু কিশোরের গান শোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি।
চলচ্চিত্রের গানের জন্যই আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন। পেয়েছেন ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ তকমা। কিন্তু বলা হয়, বরাবরই এলিট শ্রেণি কিংবা মিডিয়া এন্ড্রু কিশোরকে না দেখার ভান করে গেছে। যখন রেডিও, টেলিভিশন কিংবা বড় পর্দায় এন্ড্রু কিশোরের সুর বেজে চলেছে, যখন রিকশাচালক, শ্রমিক, দোকানদার এক ব্যান্ডের রেডিও কানের কাছে এনে শুনছেন এন্ড্রু কিশোরের গান, তখন এলিট সোসাইটি তাদের ড্রয়িংরুমে অলিখিতভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে চলচ্চিত্রের গানে। তারা নিজেদের শ্রেণি বোঝাতে আধুনিক কিংবা উচ্চাঙ্গ নিয়ে মেতে থাকতেন।
আর মিডিয়াতেও যেভাবে আলো ছড়ানোর কথা ছিল, সেভাবে আলো ফেলতে পারেননি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়ক। এই যে আজ কিংবদন্তি গায়কের জন্মদিন, কিন্তু নেই কোনো আয়োজন, নেই কোনো অনুষ্ঠান। অথচ একজন বলিউডের নায়ক কিংবা গায়কের জন্মদিনে সামাজিক মাধ্যম ভরে যায় জন্মদিনের শুভেচ্ছায়। এতে মিডিয়ার দায়ও কিন্তু কম নয়। অনেকেরই আক্ষেপ, কিংবদন্তি গায়কের নামে হতে পারতো একটি স্থাপনার নাম, অডিটোরিয়ামের নাম, মেট্রো স্টেশনের নাম।
সাবিনা ইয়াসমিন বলছেন, ‘এন্ড্রু কিশোরের গান সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তার গানের আবেদন কখনো শেষ হবে না
তবে সাবিনা ইয়াসমিন বলছেন ভিন্ন কথা। এই সামাজিক মাধ্যমের আলোচনা-সমালোচনার অনেক ঊর্ধ্বে এন্ড্রু কিশোর। কিংবদন্তি এই গায়িকা বলছেন, ‘এন্ড্রু কিশোর ভীষণ জনপ্রিয় একজন গায়ক। ফলে তাকে সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীরা চেনেন। সারা বিশ্বের বাঙালিরা তার গান শোনেন। যদি কোনো গোষ্ঠী অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করে থাকে, সেটাও পাত্তা পায়নি। সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সেসব ভেসে গেছে। এন্ড্রু কিশোর যথেষ্ট সম্মান পেয়েছেন। তিনি পুরস্কারও পেয়েছেন। সব রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন কি না, আমি জানি। তার সম্মান ও জনপ্রিয়তা কখনো পুরস্কারে আটকে থাকেনি।’
এন্ড্রু কিশোরের সমস্ত গান আর্কাইভ করা উচিত বলে মনে করেন সাবিনা ইয়াসমিন। শুধু তাই নয়, তার গান নিয়ে গবেষণাও হতে পারে বলে মনে করছেন এই কিংবদন্তি গায়িকা। সাবিনা ইয়াসমিন বলছেন, ‘এন্ড্রু কিশোরের গান সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তার গানের আবেদন কখনো শেষ হবে না। আমিও তার সঙ্গে হাজারের বেশি গান গেয়েছি। তার সমস্ত গান আর্কাইভ করা উচিত। প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠ ও গান নিয়ে হতে পারে গবেষণা, আলোচনা ও সমালোচনা। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের সমালোচকদের।’
২০২০ সালের ৬ জুলাই না ফেরার দেশে চলে যান এই কিংবদন্তি শিল্পী। তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময়ে সহকর্মী ও সংগীতাঙ্গনের মানুষেরা তাকে স্মরণ করেছেন। কিন্তু স্মরণসভা কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজনের বাইরেও একজন শিল্পীর অবদান ধরে রাখার দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর।
এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া গানগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ, তার সংগীতজীবন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার গান নিয়ে গবেষণার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, গানের রেকর্ড, চিঠিপত্র, ছবি ও সংগীতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল নিয়ে একটি স্থায়ী সংগ্রহশালা গড়ে তোলা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন প্রজন্মের কাছে এন্ড্রু কিশোরকে পরিচিত করে তোলা। তারা শুধু ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ উপাধিটি না জানে, বরং বুঝতে পারে কীভাবে একজন শিল্পী কয়েক দশক ধরে একটি দেশের চলচ্চিত্রের গানকে সমৃদ্ধ করেছেন।
একজন শিল্পীর প্রকৃত সম্মান কেবল পুরস্কারের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার সৃষ্টিকে কতটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের কাছে কতটা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এবং তার কাজ নিয়ে কতটা চর্চা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পীর জন্মদিন, অথচ কোনো আয়োজন নেই। শিল্পীর জন্মদিন, মৃত্যুদিনে বড় আয়োজন চোখে পড়ে না। আমরা তাকে ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ বলি, কিন্তু বিএফডিসি, শিল্পকলা একাডেমি, সংগীতবিষয়ক সংগঠন, সিনেমার কোনো সংগঠন তার স্মরণে বড় আয়োজন এখন পর্যন্ত হতে দেখি না
এ বিষয়ে গীতিকার জাহিদ আকবর বলছেন, সিনেমার গানে অসামান্য একজন কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর। সিনেমার গানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার কণ্ঠের অনেক গান কালজয়ী হয়ে আছে শ্রোতাদের মধ্যে। কিন্তু একটা বিষয় মনে হয়, এন্ড্রু কিশোরের গানের জন্য যতটা সম্মান প্রাপ্য, ততখানি দেওয়া হয়নি। তার স্মরণে কোনো বড় গানের স্কুল, তার কণ্ঠের সব গান নিয়ে সরকারিভাবে সংগ্রহশালা করা হয়নি।
তিনি বলছেন, ‘আজ এই শিল্পীর জন্মদিন, অথচ কোনো আয়োজন নেই। শিল্পীর জন্মদিন, মৃত্যুদিনে বড় আয়োজন চোখে পড়ে না। আমরা তাকে ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ বলি, কিন্তু বিএফডিসি, শিল্পকলা একাডেমি, সংগীতবিষয়ক সংগঠন, সিনেমার কোনো সংগঠন তার স্মরণে বড় আয়োজন এখন পর্যন্ত হতে দেখি না। এগুলো নিয়ে অবহেলা মনে হয়েছে।’
এন্ড্রু কিশোরের সংগীতজীবনের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য তার গাওয়া কয়েকটি গানের দিকে তাকালেই হয়। ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘বেদের মেয়ে জোছনা আমায় কথা দিয়েছে’ কিংবা ‘ভালোবাসে গেলাম শুধু’ শুধু জনপ্রিয় গান নয়, বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতভান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
গানগুলোর দিকে একটু মনোযোগ দিলেই তার কণ্ঠের বৈচিত্র্য বোঝা যায়। কোথাও গভীর বিষাদ, কোথাও প্রেমের আকুলতা, কোথাও আধ্যাত্মিক আবেদন, আবার কোথাও জীবনের কঠিন বাস্তবতা। গানের কথার আবেগকে কণ্ঠে ধারণ করে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। এ কারণেই চলচ্চিত্রের পর্দায় অভিনয়শিল্পী বদলালেও তার কণ্ঠের আবেদন হারিয়ে যায়নি।
দীর্ঘদিন এন্ড্রু কিশোরের কাছাকাছি ছিলেন কণ্ঠশিল্পী মোমিন বিশ্বাস। মৃত্যুর শেষ সময়গুলোতেও কাছাকাছি ছিলেন তিনি। মোমিন বিশ্বাস মনে করেন, এন্ড্রু যে মাপের শিল্পী, সে অনুযায়ী তাকে নিয়ে কথা হয় না, আলোচনা হয় না।
গায়ক মোমিন বিশ্বাস বলছেন, ‘এন্ড্রু কিশোর তার গানের জন্য অনেক সম্মান পেয়েছেন, অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। শুধু অ্যাওয়ার্ড বা পুরস্কারই সব নয়। একজন এন্ড্রু কিশোর যে কী ছিলেন, তা আমাদের রাষ্ট্র হয়তো অনুমান করতে পারেনি। শুধু নিয়মিত সম্মাননা নয়, তাকে রাষ্ট্রের বিজ্ঞাপন বানানো যেত। এন্ড্রু কিশোর ভীষণ জনপ্রিয়। এখনো মানুষজনের কাছে তার গান ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। কিন্তু আমাদের সিভিল সোসাইটিতে আলোচনায় নেই। তাকে নিয়ে কথা বলা দরকার। তার গান, তার কণ্ঠ নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার; দরকার গবেষণার। রাষ্ট্রের এসব উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
মোমিন বিশ্বাস মনে করেন এন্ড্রু কিশোরের নামে সরকারি উদ্যোগে স্থাপনার নাম করা উচিত। হতে পারে সেটা অডিটোরিয়াম, মেট্রো স্টেশন কিংবা অন্য যে কিছু।
আমরা ছোটবেলা থেকেই এন্ড্রু কিশোরের গান শুনে বড় হয়েছি। আমরা বুঝি, চলচ্চিত্রের গান মানেই এন্ড্রু কিশোর
তবে যারা গানের জগতে রয়েছেন, তারা চলচ্চিত্রের গান মানেই এন্ড্রু কিশোরকে বোঝেন। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কনা বলছেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই এন্ড্রু কিশোরের গান শুনে বড় হয়েছি। আমরা বুঝি, চলচ্চিত্রের গান মানেই এন্ড্রু কিশোর। আমার আশপাশের যে পরিবেশটা রয়েছে, সেখানে এন্ড্রু কিশোর এভাবেই রয়েছেন। সকলের কাছে ভীষণ শ্রদ্ধার।’
১৯৭৭ সালে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক যাত্রা শুরু করেন এন্ড্রু কিশোর। পরবর্তী সময়ে প্রায় ১৫ হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি পেয়েছেন। ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘সারেন্ডার’, ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘কবুল’, ‘আজ গায়ে হলুদ’, ‘সাজঘর’ ও ‘কি জাদু করিলা’ চলচ্চিত্রের গানের জন্য এই পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর উত্তরের রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন এন্ড্রু কিশোর কুমার বাড়ৈ। তার পিতা ক্ষীতিশ চন্দ্র বাড়ৈ এবং মাতা মিনু বাড়ৈ রাজশাহীর হাসপাতালে চাকরি করতেন। তার মা ছিলেন সংগীতানুরাগী। ছিলেন কিংবদন্তি কিশোর কুমারের ভক্ত। তাই ছেলের নাম রাখেন ‘কিশোর’। মায়ের সেই সংগীতপ্রেম ও স্বপ্নই পরবর্তী সময়ে এন্ড্রু কিশোরকে সংগীতের পথে নিয়ে আসে।



