সংগীত নিয়ে আমার দুই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাই : কুমার বিশ্বজিৎ

কুমার বিশ্বজিৎ বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের একজন। একাধারে তিনি গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত শিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক। বিশ্বজিৎ যদিও চট্টগ্রামে বেড়ে উঠেছেন, কর্মজীবনের জন্য তিনি বিভিন্ন সময় ঢাকা আসা যাওয়া করতেন। গানের প্রতি তার আলাদা টান ছিল। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’—এই গানটি দিয়ে সঙ্গীত ভুবনে আলোড়ন ফেলে দেন। তখন থেকেই তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেন। সঙ্গীত জীবনে তিনি অনেক জনপ্রিয় গান গেয়েছেন।
বাংলাদেশের নামকরা প্রায় সব সঙ্গীত পরিচালকের সাথে তিনি কাজ করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে—‘তুমি রোজ বিকেলে আমার বাগানে ফুল নিতে আসতে’, ‘ভিটা নাই রে’, ‘আমি সাম্পানে বাঁধিব ঘর’, ‘মানুষ বুড়ো হয় মন বুড়ো হয় না’, ‘মাতাল হাওয়া কেন বুকের মাঝে মিশে’, ’সেই কথা সেই স্মৃতি ছিলাম খেলার সাথি’ প্রভৃতি।
২০০৯ ও ২০১১ তে দুটি চলচ্চিত্রের জন্য সুরকার ও শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান কুমার বিশ্বজিৎ। ২০০৯ সালে বেস্ট মিউজিক কম্পোজার ও প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে ‘স্বামী-স্ত্রীর ওয়াদা’র জন্য এবং প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে ২০১১ সালে ‘প্রজাপ্রতি’র জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। এই দুটি চলচ্চিত্রের মিউজিক ডিরেকশনও তাঁর দেওয়া। সংগীত ব্যক্তিত্ব হিসেবে এছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে মেরিল-প্রথম আলো অ্যাওয়ার্ড, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, বাচসাস অ্যাওয়ার্ড, বিনোদন বিচিত্রাসহ অসংখ্য পুরস্কার। সুরকার হিসেবে অসংখ্য গান রয়েছে যেগুলো তাঁর করা।
তবে তাঁর কিছু স্বপ্ন রয়েছে, যেগুলো নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সংগীত তারকা কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘মানুষের অনেক স্বপ্ন থাকে, যার মধ্যে কিছু কিছু স্বপ্ন পূরণের জন্য মন বড্ড ব্যাকুল থাকে। সঙ্গীত জীবনে আমার বিচরণ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে। এতদিন যা কিছু সামান্য অর্জন করতে পেরেছি, তা থেকে মনে হয় নতুন প্রজন্মকে কিছু দিয়ে যাই। আমার খুব ইচ্ছা, আমরা সচরাচর যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীত শিক্ষা নেই, সেখানে হয়তো ব্যাকরণগত বিষয়গুলো থাকে। ওস্তাদরা গান শেখান, গান তুলে দেন। কিন্তু আমি যখন ক্যারিয়ার শুরু করি, তখন থেকে অনেক নামী সঙ্গীত পরিচালক এবং বড় বড় শিল্পীদের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। স্টুডিওতে তাঁদের গায়কী খুব কাছ থেকে দেখেছি। তখন মনে হয়েছে তফাৎটা কোথায়? একজন শিল্পী হয়তো খুব নিখুঁত গাইছেন, কিন্তু গানটা প্রাণে লাগছে না। কিন্তু কেন?’
‘‘মাইক্রোফোন ফেস করতে করতে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে বুঝেছি 'থ্রোয়িং' (Throwing) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গানের একটি থিম থাকে—কখনও বিরহ, কখনও বিচ্ছেদ, কখনও দেশপ্রেম আবার কখনও বা বিদ্রূপ। একজন শিল্পীর মূল কাজ হলো কথা ও সুরের সাথে 'অভিনয়' করা। আর এই লিরিক্যালি অভিনয় করতে গেলে প্রয়োজন বাতাসের সঠিক ব্যবহার বা 'বায়ু প্রক্ষেপণ'। কখনও পেট থেকে, কখনও বুক থেকে, কখনও কণ্ঠ, তালু কিংবা নাসিকা ব্যবহার করে আবেগ ফুটিয়ে তুলতে হয়। এটি ভীষণ কঠিন একটি শিল্প। যেমন আমার গাওয়া মা, প্রেম তো পরের জমি নয়, ছোট ছোট আশা, জন্মিলে মরিতে হবে-একটু ডিফরেন্ট ভয়েজ টোনের কাজ।’’ যোগ করেন তিনি।
নিজের স্বপ্নকে বিশ্লেষণ করা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রসঙ্গে দেশের এই অন্যতম জনপ্রিয় সংগীত শিল্পীর ভাষ্য, ‘‘সবমিলিয়ে আমার বহুদিনের স্বপ্ন, নতুন প্রজন্মের জন্য ভয়েজ থ্রোয়িং শেখানোর একটি প্রতিষ্ঠান বা স্কুলিং করা। সেটি অনলাইন বা নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রভিত্তিক হতে পারে। আমি যদি আমার এই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাটুকু তাদের মাঝে বিলিয়ে দিতে পারি, তবেই নিজেকে সার্থক মনে করব। এর পাশাপাশি আমার আরেকটি স্বপ্ন আছে। সঙ্গীত অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাধ্যম, যা মানুষের অনুভূতি ও উপলব্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মিউজিক মানুষের অন্তরের জ্বালা বা কষ্ট অনেকটা লাঘব করে দেয়। তাই আমার ইচ্ছা, একটি 'মিউজিক্যাল হিলিং সেন্টার' করা। যাকে বলে মিউজিক থেরাপি, যেটি মেডিকেল সায়েন্সে একটি খুব এপ্রোভ থিউরি। তবে এটি কোনো প্রথাগত মেডিকেল ট্রিটমেন্ট নয়, বরং একটি নন-মেডিকেল সাপোর্ট সেন্টার। যেখানে মানসিক অবসাদে থাকা মানুষ কিংবা বিশেষভাবে সক্ষম (disabled) ব্যক্তিরা আসবে। মিউজিকের মাধ্যমে তাদের মনে আনন্দ জোগানো, স্মৃতি ফিরিয়ে আনা এবং হারানো উচ্ছ্বাস জাগিয়ে তোলাই হবে এর লক্ষ্য। সারা বিশ্বে এখন মিউজিক থেরাপি জনপ্রিয় হলেও আমাদের দেশে এমন সেন্টার খুব কম।’’
বললেন, ‘সঙ্গীত নিয়ে এই দুটি বিশেষ পরিকল্পনা আমি অতিসত্বর বাস্তবায়ণ করতে চাই। এটি করতে পারলে আমি পরম আত্মতৃপ্তি পাব। অন্যদিকে আমি সামনে আমার সংগীত ক্যারিয়ারে চার দশক উদযাপনের পরিকল্পনা করছি, একটু বড় পরিসরে। ভিন্ন আঙ্গিকে করার চিন্তা রয়েছে। এসব নিয়ে কাজ চলছে এখন।’




