বিষয় চলচ্চিত্র
সোনালি জলাধারে জীবনের আভা

‘অন গোল্ডেন পন্ড’ মুভিতে ক্যাথরিন হেপবার্ন ও হেনরি ফন্ডাচলচ্চিত্রকার: মার্ক রাইডেল
সদ্যপ্রয়াত আমেরিকান চলচ্চিত্রকার মার্ক রাইডেলের বহুল প্রশংসিত চলচ্চিত্র ‘অন গোল্ডেন পন্ড’। এর নানা দিক নিয়ে লিখেছেন রুদ্র আরিফ
বিস্তীর্ণ হ্রদের পাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যঘেরা বাড়িতে গ্রীষ্মকাল কাটায় এক বয়স্ক দম্পতি। খিটখিটে মেজাজের স্বামী নরম্যান মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন। বিদ্রূপ ছড়িয়ে পড়ে তার কথা ও আচরণে। স্ত্রী ইথেল সবকিছু স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। তাদের কন্যা চেলসি থাকে দূরে; বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। তবু বাবার ৮০তম জন্মদিনে সেই বাড়িতে আসে কন্যাটি। সঙ্গে তার প্রেমিক বিল আর প্রেমিকের কিশোরপুত্র বিলি। মায়ের সঙ্গে চেলসির সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলেও বাবার প্রতি তার তীব্র অভিমান ও ক্ষোভ। ছুটি কাটিয়ে বিলিকে ওই দম্পতির কাছে কিছুদিনের জন্য রেখে যায় চেলসি ও বিল। শুরুতে অপছন্দ করলেও বিলির সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে নরম্যানের। তারা একসঙ্গে মাছ ধরতে যায়; করে সময় উপভোগ। একদিন চেলসি ফিরে এসে এমন মুহূর্ত দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কেননা, বাবাকে সে মনের মতো করে পায়নি কখনো। অবশেষে মায়ের পরামর্শ মেনে বাবার সঙ্গে দূরত্ব কমে কন্যার। বিলিকে নিয়ে চেলসি ফিরে গেলে, আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়ে নরম্যান। আপাতদৃষ্টিতে সেই যাত্রায় প্রাণ বাঁচে তার। সোনালি আভায় মোড়ানো হ্রদের সৌন্দর্য এই বুড়ো দম্পতির উপভোগ করার মধ্য দিয়ে শেষ হয় চলচ্চিত্রটি। মার্ক রাইডেলের ১৯৮১ সালের ‘অন গোল্ডেন পন্ড’-এর কাহিনিসংক্ষেপ এমনই। এখানে নরম্যান ও চেলসি চরিত্রে বাস্তবজীবনের বাবা ও কন্যা হেনরি ফন্ডা ও জেন ফন্ডার অভিনয় এতই দুর্দান্ত; তাতে চলচ্চিত্রের আস্তরণ ছাড়িয়ে শাশ্বত জীবনের এক দারুণ প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পেয়েছে।
চলচ্চিত্রের আস্তরণ ছাড়িয়ে শাশ্বত জীবনের এক দারুণ প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পেয়েছে
এই চলচ্চিত্রে নিরেট একটি পারিবারিক কাহিনির ভেতর দিয়ে মার্ক রাইডেল এমনসব বিষয় নিয়ে বোঝাপড়া করেছেন, যা মানবজীবনে চিরন্তন। নরম্যানের খিটখিটে আর বিদ্রূপধর্মী আচার-আচরণ প্রকৃত অর্থে তার মৃত্যুভয়, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং পৃথিবীতে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধমূলক ঢাল। কন্যার সঙ্গে তার তিক্ত ও সমালোচনামূলক সম্পর্কের বিপরীতে কিশোর বিলির সঙ্গে গড়ে ওঠে স্নেহশীল ঘনিষ্ঠতা। আর তা শেষ পর্যন্ত কন্যার প্রতিও তাকে নমনীয় করে তোলে এবং দূরত্ব মেটাতে ভূমিকা রাখে। এর পাশাপাশি হ্রদে সাঁতার কাটা জলচর পাখি লুনও এখানে জীবনের প্রতীক। এ পাখিগুলোর ডাকের ভেতর দিয়ে সময়ের প্রবাহমানতা, প্রকৃতিতে ঋতুবদল আর মানবজীবনের ক্ষণস্থায়ী ভঙ্গুর রূপের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ পেয়েছে। জীবনের সতেজ সময়গুলোতে না হলেও অন্তিমের আগমুহূর্তেও চাইলে ভাঙা সম্পর্কগুলো কীভাবে জোড়া লাগানো সম্ভব, ‘অন গোল্ডেন পন্ড’ তার দারুণ উদাহরণ।
‘ভেনিস ম্যাগাজিন’-এর আগস্ট ২০০১ সংখ্যায় এক সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্রটির নির্মাণকাহিনি নিয়ে মার্ক রাইডেল বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিজীবনে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক মধুর ছিল না জেন ফন্ডার। তিনি এ চলচ্চিত্রের উৎস-নাটকের স্বত্ব কিনে নিয়েছিলেন সেই সম্পর্ককে একটু ঠিকঠাক করে নিতে। বাবার পরামর্শেই নির্মাতা হিসেবে আমাকে বেছে নিয়েছিলেন। হেনরি ফন্ডার সঙ্গে আগে থেকে আলাপ ছিল না আমার। তবে জেনকে চিনতাম। আমরা দুজনই পঞ্চাশের দশকে অ্যাক্টর স্টুডিওর অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’
‘অন গোল্ডেন পন্ড’-এ শেষ পর্যন্ত নরম্যান ও চেলসির সম্পর্ক যেমন জোড়া লেগেছিল; এতে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে হেনরি ও জেনের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল তা। চলচ্চিত্রটিতে নরম্যানের মৃত্যু না দেখানো হলেও তা যে আসন্ন, সেটি স্পষ্ট। অন্যদিকে, বাস্তবে এর শুটিং চলাকালে হেনরি ফন্ডার স্বাস্থ্যহানি ঘটে এবং চলচ্চিত্রটি মুক্তির কয়েক মাস পরই তিনি মারা যান।
বাস্তব ও পর্দায় মৃত্যুর এমন ছায়া ঘিরে রাখা এ চলচ্চিত্রের আরেকটি কাকতাল হলো, শুরুর দিকে চার্লি নামের মেইলম্যানটি নরম্যানকে জানায়, তাদের পরিচিত এক নারী কিছুদিন আগে ৯৭ বছর বয়সে মারা গেছে। এ কথা শুনে রূঢ় রসিকতা করে নরম্যান। জীবনের পরিহাস হলো, এর নির্মাতা মার্ক রাইডেলও ঠিক ৯৭ বছর বয়সেই মারা গেলেন, গত ১৩ আগস্ট।






