ইয়াশের চার মাসের ম্যাজিকাল জার্নি
- চরিত্রনির্ভর পারফরম্যান্স দিয়ে ওটিটি কনটেন্টে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন অভিনেতা ইয়াশ রোহান। সামনে ‘অ্যানি’ যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। তরুণ এই অভিনেতার ওটিটি অধ্যায় নিয়ে লিখেছেন মীর রাকিব হাসান

বাংলাদেশি ওটিটি কনটেন্টে নিজের অভিনয়গুণ ও চরিত্রনির্ভর পারফরম্যান্স দিয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন ইয়াশ রোহান। কখনো ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’র নিঃসঙ্গ বাস্তবতায়, কখনো ‘সাবরিনা’ বা ‘বুকের মধ্যে আগুন’-এর আবেগঘন জগতে— প্রতিটি কাজেই তিনি ভেঙেছেন প্রচলিত বাণিজ্যিক ধারার ছক। এবার সেই অভিনয়যাত্রায় যুক্ত হলো নতুন আন্তর্জাতিক মাইলফলক— নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের সিরিজ ‘অ্যানি’, যা এরই মধ্যে ইউরোপের প্রভাবশালী সিরিজভিত্তিক উৎসব সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যালে ‘উইমেন ইন সিরিজ’ বিভাগে বিশ্ব প্রিমিয়ারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। ৯ জুন জার্মানির কোলন শহরে অনুষ্ঠিতব্য উৎসবে এর প্রদর্শনী হবে।
একটি ফোনকল থেকে শুরু
‘অ্যানি’র সঙ্গে ইয়াশের যুক্ত হওয়ার গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। ইয়াশ জানান, একদিন নির্মাতা সাদের কাস্টিং ডিরেক্টর ইয়াসির আল হক তাকে ফোন করেন। একটি ছোট্ট সিনোপসিস পাঠিয়ে জানতে চান, গল্পটি তার কাছে কেমন লেগেছে। গল্পটি পড়ে প্রথমেই তিনি রাজি হয়ে যান। তিনি জানতেন না, কে নির্মাণ করবেন। ইয়াশ বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, এটি খুবই ইন্টারেস্টিং। এরপর যখন জানতে পারলাম কাজটি সাদ ভাই নির্মাণ করবেন, তখন আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।’
প্রথম দেখাতেই ভেঙে গেল ধারণা
নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের কাজের দীর্ঘদিনের ভক্ত ছিলেন ইয়াশ। তবে এর আগে তাদের কখনো সরাসরি দেখা হয়নি। তাই প্রথম সাক্ষাতের আগে তিনি কিছুটা আনুষ্ঠানিক পরিবেশের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
ইয়াশ বলেন, “আমি ভেবেছিলাম, উনি আসবেন, আমি উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেব। কিন্তু উনি এসে নিজেই বললেন, ‘হাই, আমি আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। আমি আপনার সঙ্গে একটা কাজ করতে চাই, চলুন বসি।’ আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। প্রথম দেখাতেই বুঝেছিলাম, উনি কতটা বিনয়ী ও আন্তরিক মানুষ।” সেই সাক্ষাতের পরই শুরু হয় দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রক্রিয়া।
চরিত্রের ভেতরে চার মাস
ইয়াশের মতে, সাদের চরিত্রগুলো প্রচলিত অর্থে তৈরি করা যায় না। প্রতিটি চরিত্রের নিজস্ব মানসিক জগৎ, ইতিহাস এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকে। সেই জগতে প্রবেশ করতে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে। ইয়াশ বলেন, ‘সাদ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে গেলে প্রতিদিন গল্পের ভেতরে আরও গভীরে যেতে হয়। চরিত্রকে শুধু অভিনয় করলেই হয় না, তাকে বুঝতে হয়, তার মতো ভাবতে হয়।’ এই প্রকল্পে কাজ করার জন্য ইয়াশ টানা চার মাস নিজের সব ধরনের ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। অন্য কোনো কাজ, শুটিং কিংবা পরিকল্পনা নয়; পুরো সময়ে তিনি ছিলেন শুধুই ‘অ্যানি’র জগতে। ইয়াশ বলেন, ‘আমার জীবনে এ রকম অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। পুরো যাত্রাটা আমার কাছে একধরনের ম্যাজিক্যাল জার্নি ছিল।’
যে গল্পে আছে ঘৃণার মহামারী
‘অ্যানি’ মূলত একটি ডিস্টোপিয়ান চেম্বার ড্রামা। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ছোট একটি শহরের নার্স অ্যানি। মা-বাবা হারানোর পর পাঁচ ভাইবোনকে মানুষ করার দায়িত্ব তার কাঁধে। এর মধ্যেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত রোগ। এই রোগে আক্রান্ত পুরুষরা নারীদের প্রতি অস্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণহীন ঘৃণায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এই ‘হেইট প্যান্ডেমিক’-এর অন্ধকার সময়েই এক রাতে মুখোশধারীর নৃশংস হামলার শিকার হয় অ্যানি। সেই ঘটনার পর তার জীবন বদলে যায় চিরতরে। নিজের ভেতরের ক্ষত, চারপাশের সহিংসতা এবং সমাজ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঘৃণার বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে একসময় প্রতিশোধই হয়ে ওঠে তার একমাত্র লক্ষ্য। সাদের অন্যান্য কাজের মতো ‘অ্যানি’ও নারী-পুরুষ সম্পর্ক, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, অবিশ্বাস এবং সহিংসতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।
মানুষ হিসেবেও বদলে গেছেন
ইয়াশ রোহানের মতে, ‘অ্যানি’র সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়; বরং নিজের ভেতরের পরিবর্তন। তার দাবি, এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অনেক ভয়, সংকোচ এবং নিরাপত্তাহীনতাকে অতিক্রম করতে পেরেছেন। ইয়াশ বলেন, ‘কাজটি শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে আমাকে সমৃদ্ধ করেনি; একজন মানুষ হিসেবেও বদলে দিয়েছে। আমার অনেক ধরনের ভয় আর ইনসিকিউরিটি ছিল। সেগুলোর অনেকটাই এই কাজের মাধ্যমে ভেঙে গেছে।’ তার ভাষায়, ‘আমি কাজটি শুরু করার আগে যে মানুষ ছিলাম, শেষ করার পর আমি আর সেই মানুষটি ছিলাম না।’
পরিচালকের সঙ্গে সম্পর্ক
শুধু কাজের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ইয়াশ ও সাদ; দীর্ঘ প্রস্তুতির সময়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বও। সংগীত, সিনেমা, সিরিজ, বই— বিভিন্ন বিষয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা ও আলোচনা হতো তাদের। ইয়াশ বলেন, ‘কাজের বাইরে আমরা অনেক গল্প করেছি। আমাদের অনেক পছন্দের জায়গা মিলেছে। সেই জায়গা থেকে আমি আমার পরিচালকের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পেরেছি। আর সেটাই পুরো যাত্রাটাকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।’
নতুন দিগন্ত
‘অ্যানি’র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখছেন না ইয়াশ। তার বিশ্বাস, এটি বাংলাদেশের সিরিজ শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক উৎসবে একটি বাংলাদেশি সিরিজের উপস্থিতি ভবিষ্যতে আরও নির্মাতাকে বৈশ্বিক দর্শকের সামনে নিজেদের গল্প তুলে ধরার সুযোগ করে দেবে।




