ভেনিসে আমরা হাঁটলে বাজবে ‘ঢাকা লাভ’ গানটি

রুবাইয়াত হোসেন
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ পরিচালনা করেছেন রুবাইয়াত হোসেন। আমেরিকা থেকে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জনি হক
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। খবরটা প্রথম জেনে কেমন লেগেছিল, এখন কেমন লাগছে?
গত এপ্রিল মাসে জানতে পারি, ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিসে নির্বাচিত হয়েছে। তখন থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত উৎসবের পরিচালক আলবের্তো বারবেরার সংবাদ সম্মেলন না করা পর্যন্ত খবরটি চেপে রাখা একটু কঠিনই ছিল! কারণ আমরা সিনেমাটির কলাকুশলীরা সবাই জানতাম, আমাদের নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে কথাবার্তা হতো। কিন্তু কাউকে জানাতে পারছিলাম না, এমনকি পরিবারকেও না! এখন সুখবরটি সবার সঙ্গে শেয়ার করতে পেরে মনে হচ্ছে যে, আমরা অনেক আনন্দিত। এটি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সিনেমার অর্জন।
সিনেমাটি অনেক ফান্ড পেয়েছে। কীভাবে পেলেন?
কো-প্রোডাকশন কৌশল প্রথম শিখেছি লোকার্নো ওপেন ডোরস থেকে। ২০১৬, ’১৭ ও ’১৮ সালে এটি হয়েছিল। বাংলাদেশের আরও অনেক ফিল্মমেকার এতে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানেই আমাদের সব শেখানো হয়েছিল— কীভাবে ও কোন কোন পর্যায়ে আবেদন করতে হয়, কীভাবে আবেদন তৈরি করতে হয়। পর্তুগাল প্রযোজকের মাধ্যমে পর্তুগাল ফিল্ম ইনস্টিটিউটে আবেদন করি, ফরাসি প্রযোজকের মাধ্যমে সিনেমা সিএনসিতে এবং জার্মানিতে ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফান্ডের জন্য আবেদন করি। একজন বাংলাদেশি ফিল্মমেকারের পক্ষে যা যা ওপেন, প্রতিটিতেই আমরা আবেদন করেছি। অনেক কিছুই পাইনি। সবচেয়ে চমক ছিল পর্তুগাল ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে আড়াই লাখ ইউরো পাওয়া।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নিয়ে আপনার ২০ বছরের পথচলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
গল্পটি আমার মাথায় ছিল অনেক ছোটবেলা থেকেই। তখন আমার বয়স সাত-আট বছর হবে। একটি বিউটি স্যালুনে রহস্যজনকভাবে হবু কনে মারা যাওয়ার গল্প শোনার সময়ই ভিজ্যুয়ালাইজ করছিলাম আমার কল্পনায়। পরে এ ঘটনা নিয়ে একটি ছোটগল্প লিখি। সেটি নিয়ে ২০০৬ সালে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানোর চেষ্টা করেছিলাম। সেই হিসাবে ২০ বছরের পথচলা বলা যায়। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেন প্রাচ্যনাটের ঋতু সাত্তার। কিন্তু সম্পাদনার পর কনটেন্টটি আমার ভালো লাগেনি। তাই সেটি আর শেষ করিনি।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার মূল চরিত্রে থাকা জাইনীন করিম চৌধুরী আপনার সহকারী পরিচালক ছিলেন শুনেছি...
জাইনীন আমার সহকারী পরিচালক ছিল। দুই বছর ধরে সে আমার সঙ্গে কাজ করেছে। মূলত স্ক্রিপ্ট সম্পাদনা ও পুনর্লিখনে সহায়তা করত সে। স্ক্রিপ্ট নিয়ে তার ধারণা বেশ ভালো। এক্ষেত্রে সে খুব ভালো অবদান রাখতে পারে। আমরা কলাকুশলীরা মিলে জুমে বারবার স্ক্রিপ্ট পড়তাম। একদিন জাইনীন স্ক্রিপ্ট পড়ার সময় তাকে পর্যবেক্ষণ করে মনে হলো, সে খুব নিবেদিত। তার স্ক্রিপ্ট পড়া দেখে মনে হচ্ছিল সে নিজেই চরিত্র। তখন আমার প্রোডাকশন ডিজাইনার ও স্ক্রিপ্ট সুপারভাইজারের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করলাম। তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম কী মনে করছে। তারা একমত হয়ে বলল, জাইনীনকে দিয়ে কাজটা হতে পারে। কিন্তু অপেশাদার অভিনেত্রীকে চূড়ান্ত করার ব্যাপারে সংশয়ে ছিলেন আমার প্রযোজক। কারণ ততদিনে অন্য একজনকে এ চরিত্রের জন্য ভেবে রেখেছিলাম। তিনিও অসাধারণ একজন অভিনেত্রী। তখন দুজনের অন্তত ১০-১৫ বার অডিশন নিয়েছি। শেষ পর্যন্ত একজনকে বেছে নেওয়া খুব কঠিন একটি সিদ্ধান্ত ছিল। সিনেমার জন্য যেটি সঠিক মনে হয়েছে সেটাই করেছি। আমি সিনেমাকেই প্রাধান্য দিয়েছি।
আজমেরী হক বাঁধন দারুণ একজন অভিনেত্রী। তিনি আমাদের দেশের অন্যতম একজন তারকা। তাকে একটি দৃশ্যের জন্য অতিথি চরিত্রে প্রস্তাব দিই। ভাবিনি তিনি রাজি হবেন। মহড়ার মাধ্যমে তার চরিত্রের ব্যাপ্তি কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এটি এখনো অতিথি চরিত্র, তবে সিনেমাটির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুটিংয়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন। রিকিতা নন্দিনী শিমুর কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। আমার আগের দুটি সিনেমায় সে অভিনয় করেছে। এর আগে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ক্যালকাটা’ সিনেমার সুবাদে সে ভেনিসে গিয়েছিল। জাইনীন, বাঁধন ও শিমুর পাশাপাশি সুনেরাহ বিনতে কামাল, মোহাম্মদ বারী, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম, দামের খানসহ সবাই প্রতিদিন শুটিংয়ের আগে ইম্প্রোভাইজ করতেন। তারা খুব ভালো ভালো সংলাপ আমাকে ইম্প্রোভাইজ করে দিয়েছেন।
যেহেতু বিয়ে ও ভৌতিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমা, গান নিশ্চয়ই আছে?
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এ বেশ কয়েকটি গান আছে। ‘সীমানা পেরিয়ে’ সিনেমার কালজয়ী গান ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ ব্যবহার করেছি আমরা। এ ছাড়া থাকছে ইসলামউদ্দিন পালাকারের ‘বাতাস লাগলো না’, তিশমার ‘মইরা ভূত’-এর রিমিক্স, অর্ণবের সংগীতায়োজনে শ্রাবন্তী নারমিন আলীর ‘শাট আপ অ্যান্ড ড্যান্স’। দামের খান তৈরি করেছেন ‘ঢাকা লাভ’ ও ‘বিলিভ’ শিরোনামের নতুন দুটি গান। এরমধ্যে ভেনিসের লালগালিচায় আমরা হাঁটার সময় ‘ঢাকা লাভ’ গানটি বাজানো হবে। আজ প্রকাশ পাচ্ছে এই গান। সব মিলিয়ে অনেক আকর্ষণীয় একটা সাউন্ডট্র্যাক দাঁড়িয়েছে।







