বিদেশি সিনেমা এলেই কি হলগুলো বাঁচবে

বন্ধ ‘মধুমতি’, ‘শাপলা টকিজ’, ‘উল্কা’ সিনেমা হলের গেট
একসময় দেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল প্রেক্ষাগৃহ। অথচ দর্শক সংকট, লোকসান ও মানসম্পন্ন সিনেমার অভাবে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ। সংকট কাটাতে আধুনিকায়ন ও বিদেশি সিনেমা আমদানির উদ্যোগ নিয়ে চলছে আলোচনা। লিখেছেন মীর রাকিব হাসান
নব্বই দশকে দেশে যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪৩৫টি প্রেক্ষাগৃহ সচল ছিল, এখন সংখ্যাটি নেমে এসেছে প্রায় ৭০টিতে। দর্শক সংকট, মানসম্পন্ন সিনেমার অভাব, পরিচালন ব্যয় ও লোকসানের চাপে বন্ধ হচ্ছে একের পর এক ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গেল প্রেক্ষাগৃহ। ভৈরব, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জের পর এবার বন্ধ হওয়ার পথে গাজীপুরের ‘উল্কা’। প্রশ্ন উঠেছে, এভাবেই কি হারিয়ে যাবে দেশের প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র সংস্কৃতি?
দেশে প্রেক্ষাগৃহের সংকট যেন কাটছেই না। গত আগস্টে ভৈরবের ‘মধুমতি’ এবং রংপুরের ‘শাপলা টকিজ’ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে অবস্থিত ‘লাভলী’। এবার বন্ধ হওয়ার পথে গাজীপুর চৌরাস্তার ‘উল্কা’। আগামী মাস থেকে প্রেক্ষাগৃহটির কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা ও ঢাকার সাথী প্রেক্ষাগৃহের স্বত্বাধিকারী মিয়া আলাউদ্দিন বললেন, ‘দুই-তিন বছর আগেও প্রায় ২৫০টি প্রেক্ষাগৃহ চালু ছিল। এখন সেই সংখ্যা প্রায় ৭০টিতে নেমেছে। দেশের ২৫টি জেলায় বর্তমানে কোনো সচল প্রেক্ষাগৃহ নেই। ২০০০ সাল পর্যন্ত টাঙ্গাইলে ৪৭টি প্রেক্ষাগৃহ থাকলেও এখন চালু রয়েছে ১০টি। যশোরের ২১টির মধ্যে চারটি এবং সিরাজগঞ্জের ৩১টির মধ্যে মাত্র পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহ সচল।’
গত আগস্টে বন্ধ হয়ে যায় ভৈরবের ‘মধুমতি’ ও রংপুরের ‘শাপলা টকিজ’। ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করা শাপলা টকিজ ২০০৬ সাল থেকে ভাড়ায় পরিচালনা করছিলেন কামাল হোসেন। তার দাবি, ২০৩২ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আগেই এটি বন্ধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে লাভলী সিনেমা হলের জায়গায় গড়ে তোলা হবে বাণিজ্যিক ভবন। যদিও এতে একটি সিনেপ্লেক্স রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এবার সেই তালিকায় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা গাজীপুরের উল্কা সিনেমা হলের। প্রেক্ষাগৃহটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বর থেকে এটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তার ভাষ্য, সিনেমা চালিয়ে এখন বিদ্যুৎ বিলের টাকাও তোলা কঠিন। তিনি বললেন, ‘ভালো গল্প ও পরিচিত তারকার সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শক সমাগম হয়। বিশেষ করে ঈদে শাকিব খানের সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শকের চাপ বাড়ে। কিন্তু শুধু দুই ঈদের সিনেমা দিয়ে সারা বছর প্রেক্ষাগৃহ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ঈদের বাইরেও জনপ্রিয় তারকাদের সিনেমা নিয়মিত মুক্তি পাওয়া প্রয়োজন।’
উল্কা বন্ধ হয়ে গেলে গাজীপুরে চালু থাকবে শুধু বর্ষা ও ঝুমুর। এ দুটি প্রেক্ষাগৃহের ব্যবসাও ভালো যাচ্ছে না।
জয়ার প্রেমে পড়া বারণ
২৬ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বললেন, ‘প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হওয়ার পেছনে শুধু মালিকদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত দায়ী নয়। চলচ্চিত্র নির্মাণ ও দর্শকের আগ্রহের সংকটও এর সঙ্গে জড়িত। তিনি বললেন, ‘আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পকে বাঁচাতে হলে মানসম্পন্ন বাংলা সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। তাহলেই দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনা যাবে। ভালো সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শক উপস্থিতি বাড়বে, তখন ব্যবসাও ভালো হবে।’
সংকট কাটাতে বিদেশি সিনেমা আমদানির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহের মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বললেন, ‘ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ থেকে নির্বাচিত কিছু সিনেমা আমদানির সুযোগ থাকলে প্রদর্শন ব্যবসায় গতি ফিরতে পারে। তবে দেশীয় চলচ্চিত্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি বললেন, ‘সম্ভাব্য সহায়তা যেন শুধু সিনেপ্লেক্স নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রচলিত সিঙ্গেল প্রেক্ষাগৃহগুলোর আধুনিকায়নেও কাজে লাগে, সেই প্রস্তাব দিয়েছি আমরা। শুধু প্রেক্ষাগৃহ সংস্কার নয়, সরকার যেন প্রযোজকদের পাশে থাকে সেই বিষয়েও কথা বলেছি। প্রতিমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, শিগগিরই হয়তো আমরা ভালো কিছু খবর পাব।’
ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বললেন, ‘ঈদের পরে সারা বছরে আমরা কোনো ভালো সিনেমা পাচ্ছি না। উপায় না পেয়েই প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন মালিকরা। বড় বড় সিনেপ্লেক্স ফাঁকা পড়ে থাকছে। যাদের সিনেপ্লেক্স আছে, তারা হলিউডের সিনেমা চালিয়ে টিকে আছে।’
বিদেশি সিনেমা চললে দেশীয় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতির মুখে পড়বে না বলেই মনে করেন উজ্জ্বল। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দেশে যখন পর্যাপ্ত ভালো সিনেমা তৈরি হবে, তখন প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা বিদেশি সিনেমা চালাবেন না। দর্শকও দেশের ভালো সিনেমা রেখে বিদেশি সিনেমা দেখবে না। এমন উদাহরণ বাংলাদেশে আছে। বলিউডের বড় বাজেটের সিনেমা বাংলাদেশের সিনেমার সঙ্গে টেকেনি। আমাদের দাবি, যখন দেশের সিনেমা থাকবে না, তখন যেন আমরা হল চালু রাখতে, দর্শক ধরে রাখতে বিদেশি সিনেমা পাই।’
গত ১২ অক্টোবর প্রদর্শক সমিতির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী জানিয়েছেন, বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির অনুমতির বিষয়ে সরকার আন্তরিক। তবে দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সভায় প্রেক্ষাগৃহ আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব খতিয়ে দেখার কথাও জানালেন প্রতিমন্ত্রী। অর্থ ছাড়ের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনার কথা বললেন তিনি।





