নাটকে-সিনেমায় তৃতীয় লিঙ্গের জীবন সংগ্রাম

‘কমন জেন্ডার’ সিনেমার দৃশ্য-নোমান রবিন
তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্র নিয়ে দেশীয় চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকের সংখ্যা হাতেগোনা। অথচ এগুলো একদিকে যেমন আলোচিত হয়েছে তেমনই দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। লিখেছেন জনি হক
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পরিচয়, মানবিকতা এবং অধিকারকে বৈচিত্র্যময় গল্পে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরে প্রশংসিত হয়েছে ছোট পর্দা ও বড় পর্দার কয়েকটি ফিকশন। এগুলোর মাধ্যমে উঠে এসেছে তাদের সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন। সৃজনশীল স্বাধীনতায় হিজড়াদের বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্দা কিংবা মঞ্চে নিয়ে এসেছেন নির্মাতারা। এর মাধ্যমে সামনে এসেছে তাদের জীবনযাপন নিয়ে সামাজিক আলোচনা।
আলোচিত ‘কমন জেন্ডার’
দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে নির্মিত উল্লেখযোগ্য একটি চলচ্চিত্র নোমান রবিন পরিচালিত ‘কমন জেন্ডার’। এটি মুক্তি পায় ২০১২ সালে। এর আগে ‘কমন্ড জেন্ডার’ নামে আলোচিত একটি নাটক বানিয়েছেন তিনি। বড় পর্দায় সেটি নিয়ে কাজ করে দেশীয় বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে ব্যতিক্রমী এক গল্প দেখিয়েছেন তিনি। একটি বিপণিবিতানে টয়লেট ব্যবহার নিয়ে এক হিজড়ার মারধরের শিকার হওয়ার ঘটনা চলচ্চিত্রটি নির্মাণে অনুপ্রাণিত করে তাকে। হিজড়া চরিত্রকে শুধু পার্শ্বচরিত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত সংকটকে কাহিনির কেন্দ্রে আনেন তিনি। সিনেমাটি দেখিয়েছে প্রচলিত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের উপাদান রেখেই কার্যকরভাবে প্রান্তিক মানুষের জীবন তুলে ধরা যায়। পরিবারের প্রত্যাখ্যান, সামাজিক বৈষম্য আর ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষাসহ হিজড়াদের ব্যক্তিজীবন তুলে ধরা হয়েছে এতে।
এ প্রসঙ্গে নোমান রবিন আগামীর সময়কে বলেছেন, “হিজড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে দায়বদ্ধতা থেকে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সিনেমাটি নির্মাণ করেছিলাম। তখন গবেষণা করতে গিয়ে দেখি তারা এতটাই কোণঠাসা হয়ে গেছে, নেতিবাচক কাজকর্ম ছাড়া তাদের জন্য সমাজ কোনো জায়গা রাখেনি। সেই চিত্র কিছুতে বদলাতে মা, বিধাতা ও জন্মসূত্রের বিষয়গুলো যুক্ত করেছি গল্পে। তাতে সুফল এসেছে। ‘কমন জেন্ডার’ হিজড়াদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা হলেও বদলে দিয়েছে। এনজিওর মতো বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ যুগ যুগ ধরে যা পারেনি, একটি সিনেমা সেটি পেরেছে।”
ইতিবাচক মনোবৃত্তি
হিজড়াদের নিয়ে নাটক থেকে নির্মিত আরেকটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মহম্মদ হান্নান পরিচালিত ‘শিখণ্ডী কথা’। তবে মঞ্চনাটক অবলম্বনে তৈরি হয়েছে এটি। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় রতন নামে এক ব্যক্তির জীবন তুলে ধরা হয়েছে, যিনি কৈশোরে নিজের জেন্ডার-পরিচয় ও অনুভূতির ভিন্নতা উপলব্ধি করেন। পরিবার তাকে গ্রহণ করতে না পারায় হিজড়া সম্প্রদায়ের আশ্রয়ে রত্না নামে নতুন জীবন শুরু হয় তার। একজন ব্যক্তির পরিচয় সংকটের মধ্য দিয়ে পরিবার, ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে প্রান্তিক মানুষের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এতে।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও তাদের জীবনভিত্তিক আলোচিত একটি মঞ্চনাটক মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ‘শিখণ্ডী কথা’। মহাকাল নাট্যসম্প্রদায় ২০০২ সালে মঞ্চে আনে এটি। এখন পর্যন্ত এর ২০০টি প্রদর্শনী হয়েছে। হিজড়াদের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা ও মানবিক দিক নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলায় ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে এটি। জন্মের পর থেকে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পরিবার ও সমাজে কীভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত হয়, সেই মানবিক আখ্যান এই নাটকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সমাজ যাতে তাদের স্বাভাবিক মানুষের মতো সম্মান দেয়, সেই বার্তা দিয়েছে এটি।
‘শিখণ্ডী কথা’ লিখেছেন ও নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যকার আনন জামান। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘১৯৯৯ সালে হিজড়া জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে লক্ষ করি বাংলা সিনেমা, নাটক, কবিতা, উপন্যাস, সংগীত বা চারুবিদ্যা কোথাও হিজড়াদের সহজাত জীবনের কথা নেই। তারপর দীর্ঘ গবেষণার পর ‘শিখণ্ডী কথা’ রচনা করি। নাটকটি সারা দেশে এই প্রান্তিক জনমানুষ নিয়ে ইতিবাচক মনোবৃত্তি ও সচেতনতা তৈরি করেছে। সামাজিক জীবনের মূলস্রোতে হিজড়াদের অংশগ্রহণ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রবন্ধ রচনা করি। এরপর সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ স্বীকৃতি ও ভোটাধিকার দিয়েছে এবং ভাতার ব্যবস্থা করেছে।
সত্যি বলতে, হিজড়াদের বর্ণাঢ্যযাপনের আড়ালে থাকে আকাশবিস্তারী কান্না। তবে এখনো সামাজিক জীবনের প্রাত্যহিক যাপনে হিজড়াদের স্বাভাবিক অংশগ্রহণ নেই বলে মনে করি।’
মঞ্চনাটকে তৃতীয় লিঙ্গ
‘শিখণ্ডী কথা’ ছাড়াও তৃতীয় লিঙ্গের কথা নিয়ে মঞ্চে আরও দুটি নাটক রয়েছে। এর মধ্যে নাট্যদল প্রাচ্যনাটের ৪১তম প্রযোজনা ‘আগুনযাত্রা’ মঞ্চে আসে ২০২২ সালে। ভারতীয় নাট্যকার মহেশ দাত্তানির বিখ্যাত নাটক ‘সেভেন স্টেপস অ্যারাউন্ড দ্য ফায়ার’ থেকে এটি অনুবাদ করেছেন শহীদুল মামুন। রূপান্তর ও নির্দেশনায় অভিনেতা ও নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম। এতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সামাজিক বৈষম্য, অপরাধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদী গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নৃত্য ও নাট্যদল নবরস মঞ্চে আনে তাদের প্রথম প্রযোজনা ‘উনপুরুষ’। অপু মেহেদীর রচনা ও সৈয়দা শামছি আরা সায়েকার নির্দেশনায় এটি একজন আত্মনির্ণয় বিপন্ন মানুষের গল্প। মূল চরিত্র পরিমল মহন্ত ছোটবেলা থেকেই নারীর মতো বাঁচতে চান। কিন্তু সমাজ ও পরিবার তাকে মেনে নেয় না। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট ও লড়াই নাটকটির মূল উপজীব্য।
ছোট পর্দার চিত্র
প্রশ্ন তোলা যায়, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর গল্প পর্দায় তুলে ধরার পরিসর কি বেড়েছে, নাকি তাদের পরিচয় এখনো বিতর্কের বিষয় হয়েই রয়ে গেছে? কারণ সাম্প্রতিক সময়ে তাদের নিয়ে কাজের অপ্রতুলতা স্পষ্ট। এ প্রসঙ্গে নির্মাতা রাফাত মজুমদার রিংকু মনে করেন, সবশ্রেণির মানুষের গল্প নিয়ে কাজ হতে পারে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘দর্শক যেটি দেখবেন সেটি বানানোতে আমি বিশ্বাস করি না। নির্মাতা হিসেবে যা বানাব, সেটি ভালো হলে দর্শক অবশ্যই গ্রহণ করবেন।’




