মাইকেল: বড় পর্দায় একজন কিংবদন্তি, আর আমাদের স্মৃতির পরীক্ষা

‘মাইকেল’-এর দৃশ্যে জাফার জ্যাকসন (ছবি: লায়ন্সগেট ফিল্মস)
মাইকেল জ্যাকসন এমন একজন শিল্পী ছিলেন, যাকে বোঝার জন্য ইংরেজি জানা লাগে না! তাকে বুঝতে পশ্চিমা সংগীতের ইতিহাস না জানলেও চলে। এমনকি তার সব গান না শুনে থাকলেও সমস্যা নেই। তার শরীরের ভঙ্গি, নাচের ছন্দ, মঞ্চে হাঁটার ধরন, কণ্ঠের আবেগ এবং ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই তাকে এমন এক ভাষায় পরিণত করেছিল; যা দেশ, ভাষা, ধর্ম, বয়স ও শ্রেণির সীমানা অতিক্রম করেছে।
প্রয়াত পপসম্রাটের বায়োপিক ‘মাইকেল’ গত ২৪ এপ্রিল আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি পায়। একই দিন থেকে বাংলাদেশের দর্শক স্টার সিনেপ্লেক্সে এই সিনেমা দেখেছে। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন অ্যান্টোয়ান ফুকুয়া। এতে মাইকেল জ্যাকসনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তারই ভাতিজা জাফর জ্যাকসন। সিনেমাটির সবচেয়ে বড় আবেগের জায়গা এই তরুণের অভিনয়। মাইকেল জ্যাকসন হয়ে অভিনয় করা কোনো সাধারণ কাজ নয়। কারণ শুধু একজন গায়ক নয়, তিনি এক ধরনের দৃশ্যমান স্মৃতি। তার প্রতিটি ভঙ্গি, চোখের চাহনি, টুপি ধরার ধরন, পায়ের গতি, কাঁধের ঝাঁকুনি, এমনকি মঞ্চে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার অবয়বও দর্শক-শ্রোতার স্মৃতিতে গেঁথে আছে। ফলে তার চরিত্রে অভিনয় করার অর্থ শুধু একজন মানুষকে নয়, কোটি মানুষের স্মৃতিকে অভিনয় করে দেখানো। জাফর জ্যাকসনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ তিনি পরিবারেরই সদস্য। তার অভিনয়ে তাই অনুকরণ আছে,। শুধু তাই নয়; আছে উত্তরাধিকার, আত্মীয়তার চাপ এবং একজন কিংবদন্তিকে মানবিক করে দেখানোর চেষ্টা।
চলচ্চিত্রটিতে মাইকেলের শৈশব থেকে শুরু করে তার বিশ্বজয়ের পথচলা তুলে ধরা হয়েছে। জ্যাকসন ফাইভ-এর ছোট্ট কিন্তু তুমুল প্রতিভাবান শিশু কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিনোদনশিল্পী হয়ে উঠলো, এই সিনেমা সেই যাত্রাই যেন বয়ে চলে। বাবা জো জ্যাকসনের কঠোরতা, মা ক্যাথরিন জ্যাকসনের মমতা, ভাইবোনদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা, বিশ্বসংগীতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা, মঞ্চজীবনের অনুশাসন এবং খ্যাতির চাপ– সব মিলিয়ে এখানে একজন শিল্পীর গড়ে ওঠার জটিল ইতিহাস দেখা যায়। জো জ্যাকসনের ভূমিকায় কোলম্যান ডোমিঙ্গো এবং ক্যাথরিন জ্যাকসনের ভূমিকায় নিয়া লং অভিনয় করেছেন। মাইলস টেলার আছেন জন ব্রাঙ্কার চরিত্রে। বেরি গর্ডি, সুজান দে পাসে, ডায়ানা রসসহ সংগীতজগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও দেখানো হয়েছে চলচ্চিত্রে, যারা মাইকেলের উত্থানের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশি দর্শক-শ্রোতাদের কাছে মাইকেল জ্যাকসনের আকর্ষণ একটু আলাদা। আমাদের অনেকের কাছে মাইকেল এসেছেন টেলিভিশনের পর্দা, ভিডিও ক্যাসেট, স্যাটেলাইট চ্যানেলের ভাঙা-ভাঙা সম্প্রচার, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুনওয়াক অনুকরণ কিংবা পাড়ার কোনো তরুণের মাথায় কালো টুপি পরে ‘বিলি জিন’ নাচার চেষ্টার মাধ্যমে। আমরা হয়তো তার গানগুলোর সব কথার অর্থ বুঝিনি, কিন্তু তার শরীরী ভাষা বুঝেছি। তার সংগীতের বিট বুঝেছি। মঞ্চে তার একা দাঁড়িয়ে হাজার মানুষের দৃষ্টি আটকে রাখার ক্ষমতা বুঝেছি। এক্ষেত্রে ‘মাইকেল’ আমাদের জন্য শুধুই হলিউডের আরেকটি বায়োপিক নয়। সিনেমাটি দেখিয়েছে, কীভাবে একজন শিল্পী স্থানীয় সংস্কৃতির বাইরেও মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারেন।
মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন আমেরিকান শিল্পী, কিন্তু তার প্রভাব ছিল বৈশ্বিক। বাংলাদেশের ছোট শহর, জেলা, উপজেলা, গ্রাম কিংবা রাজধানীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার ছায়া দেখা গেছে বহুবার। তার নাচ অনুকরণ করেছে এমন অনেক তরুণ হয়তো কোনোদিন আমেরিকা যায়নি, ইংরেজিও ভালো জানে না, কিন্তু মাইকেলের দেহভাষা তরুণদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। এটাই একজন বড় শিল্পীর শক্তি।
তবে এই সিনেমাকে শুধু আবেগ দিয়ে দেখা ঠিক হবে না। মাইকেল জ্যাকসনকে ঘিরে যে বিপুল ভক্তি আছে, এর পাশাপাশি আছে তার জীবন নিয়ে জটিলতা, বিতর্ক, অভিযোগ আর অস্বস্তিকর প্রশ্ন। একটি জীবনীচিত্র শুধু আলো দেখিয়ে যদি ছায়া এড়িয়ে যায়, তাহলে শিল্পীর প্রতি ন্যায় হয় না। আবার যদি শুধু বিতর্কের ভেতর একজন শিল্পীকে বন্দি করা হয়, তাহলেও সত্যের প্রতি ন্যায় হয় না। মাইকেল জ্যাকসনের জীবন এই দুই সহজ পথের মাঝামাঝি এক কঠিন অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আছে। তাই তাকে বিচার করতে হলে দরকার সততা, সংবেদনশীলতা ও ঐতিহাসিক দূরত্ব। ঠিক এখানেই এই সিনেমা নিয়ে ইতিবাচক সমালোচনা প্রয়োজন।
চলচ্চিত্রটি মাইকেলের প্রতিভা, শ্রম, মঞ্চনৈপুণ্য ও সংগীতজীবনের বিস্ময়কর উত্থানকে শক্তিশালীভাবে সামনে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু দর্শক হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে, মহান শিল্পীর জীবনীকে কখনোই পূজার মন্দির বানানো উচিত নয়। জীবনীচিত্রের কাজ শুধু ভক্তদের আনন্দ দেওয়া নয়; মানুষের জটিলতাকে বুঝতেও সাহায্য করা। মাইকেল ছিলেন একদিকে বিস্ময়কর স্রষ্টা, অন্যদিকে খ্যাতির নির্মম যন্ত্রের ভেতরে আটকে পড়া মানুষ। তার জীবনে সাফল্য যেমন অবিশ্বাস্য, নিঃসঙ্গতাও তেমনই গভীর।
বাংলাদেশের সমাজে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিপূজায় অভ্যস্ত। রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, ক্রীড়া, সিনেমাসহ সব জায়গায় আমরা দ্রুত কাউকে দেবতার আসনে বসাই, আবার দ্রুত তাকেই মাটিতে নামিয়ে আনি। মাঝামাঝি অবস্থান আমাদের কাছে অস্বস্তিকর! অথচ মানুষকে বুঝতে হলে এই মাঝামাঝি জায়গাতেই দাঁড়াতে হয়। মাইকেল জ্যাকসনের মতো ব্যক্তিত্ব আমাদের শিখিয়েছে– প্রতিভা মানুষকে মহান করতে পারে, কিন্তু প্রতিভা মানুষকে নির্ভুল করে না। জনপ্রিয়তা মানুষের প্রভাব বাড়ায়, কিন্তু নৈতিক প্রশ্নের উত্তর দেয় না। করতালি একজন শিল্পীকে উঁচুতে তোলে, কিন্তু তার ব্যক্তিজীবনের অন্ধকার দূর করে না।
বুধবার (২৭ মে) পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সে ‘মাইকেল’ উপভোগ করা শুধু একটি সিনেমা দেখা ছিল না; বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভেতর দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা ছিল। চলচ্চিত্রটির পারিবারিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সঙ্গে বসে ‘মাইকেল’ দেখার অভিজ্ঞতা আমাকে ভাবিয়েছে, প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক স্মৃতি কীভাবে বদলায়। যারা মাইকেল জ্যাকসনকে তার জীবদ্দশায় দেখেছেন, তাদের কাছে তিনি এক স্মৃতির মানুষ। আর নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি ইউটিউব, রিলস, পুরোনো ভিডিও, কিংবদন্তির গল্প এবং এখন এই সিনেমার চরিত্র। দুই প্রজন্ম একসঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে বসে পর্দায় তাকিয়ে শুধুই একটি সিনেমা দেখেনি, সময়ের ব্যবধানও দেখেছে তারা। এক প্রজন্ম বলে, ‘আমরা তাকে দেখেছি।’ আরেক প্রজন্ম বলে, ‘আমরা তাকে নতুন করে চিনছি।’
চলচ্চিত্রটিতে দারুণভাবে মূর্ত হয়েছে– শিল্পী শুধু প্রতিভা দিয়ে তৈরি হয় না। পরিবার, বাজার, শৃঙ্খলা, চাপ, সুযোগ, শোষণ, ব্যবস্থাপনা, প্রচার, প্রযুক্তি, দর্শকসহ সব মিলিয়ে একজন তারকা তৈরি হয়। মাইকেল জ্যাকসনের মঞ্চজীবন ছিল অপরিসীম সৃজনশীলতার ফল, কিন্তু একইসঙ্গে বিনোদনশিল্পের কঠিন কাঠামোর ফলও। শিশুশিল্পী থেকে বৈশ্বিক আইকন হয়ে ওঠার পথে তার ভেতরে আনন্দ যেমন ছিল, তেমনই ছিল নিয়ন্ত্রণ, ক্লান্তি, চাপ ও একাকিত্ব। এদিক থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মিডিয়া জগতের জন্য কিছু শিক্ষণীয় বিষয় আছে।
আমরা শিল্পীদের ভালোবাসি; কিন্তু তাদের শ্রম, মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীল স্বাধীনতা, আর্থিক অধিকার এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্নে খুব কম মনোযোগ দিই। আমরা জনপ্রিয়তা চাই, কিন্তু মানুষ হিসেবে শিল্পীর বেঁচে থাকার জায়গা কতটা দিই; সেটি ভাবি না। মাইকেল জ্যাকসনের জীবন দেখায়, অতিরিক্ত খ্যাতিও এক ধরনের বন্দিত্ব তৈরি করতে পারে। তাই কোনো শিল্পীকে ভালোবাসা মানে শুধুই তার গান বাজানো নয়, তার মানবিক অবস্থানটিও বোঝা।
‘মাইকেল’ নিখুঁত ছবি কি না, এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কোনো বায়োপিকই সম্পূর্ণ জীবন ধারণ করতে পারে না। দুই বা আড়াই ঘণ্টায় একজন শিল্পীর শৈশব, পরিবার, সাফল্য, সংকট, শিল্পচর্চা, খ্যাতি, বিতর্ক ও উত্তরাধিকার তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব। ফলে কিছু বিষয় থাকবে, কিছু বাদ পড়বে, কিছু দৃশ্য আবেগঘন হবে; এসবই স্বাভাবিক। এটা ঠিক যে, কিছু জায়গা হয়তো আরও কঠিনভাবে বলা যেত। কিন্তু চলচ্চিত্রের মূল্য এখানেই যে, এটি মাইকেল জ্যাকসনকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে। সেটি শুধু গানের তালিকায় নয়, মানবিক প্রশ্নের জায়গায়ও।
শেষ পর্যন্ত ‘মাইকেল’ আমাদের সামনে তিনটি প্রশ্ন রেখে যায়। আমরা কি একজন শিল্পীকে তার জীবনকে প্রশ্নমুক্ত ঘোষণা না করে শুধুই শিল্পের জন্য ভালোবাসতে পারি? আমরা একজন কিংবদন্তিকে সম্মান করার পাশাপাশি তার চারপাশের শিল্পব্যবস্থা, পরিবার, বাজার ও খ্যাতির নির্মম কাঠামো নিয়েও কি ভাবতে পারি? আমরা কি আমাদের সন্তানদের বলতে পারি– মাইকেল জ্যাকসন শুধু নাচের নাম নয় এবং শুধু পপসংগীতের নাম নয়; তিনি প্রতিভা, শ্রম, সাফল্য, নিঃসঙ্গতা, আলো ও ছায়ার এক জটিল মানবিক ইতিহাস?
আলোচিত বায়োপিকটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সম্ভবত এখানেই। এটি আমাদের আবার মাইকেলের গান শুনতে ও নাচ দেখতে বাধ্য করে, কিন্তু একইসঙ্গে তার জীবনের ভেতরের চাপ, কষ্ট আর প্রশ্নও মনে করিয়ে দেয়। মাইকেল জ্যাকসনকে বুঝতে হলে শুধু করতালি যথেষ্ট নয়; দরকার শ্রদ্ধা, সমালোচনামূলক দৃষ্টি আর মানবিকতা।
তাই ‘মাইকেল’ দেখা মানে শুধু একজন পপ-তারকার জীবনী দেখা নয়। এটি একজ বৈশ্বিক শিল্পীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেও দেখা। আমরা কাকে ভালোবাসি? কেন ভালোবাসি? ভালোবাসার কারণে কী ভুলে যাই? আর স্মৃতির আলোয় দাঁড়িয়ে কতটা সত্য দেখার সাহস রাখি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কিন্তু ভালো সিনেমা সবসময় সহজ উত্তর দেয় না; ভালো সিনেমা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। ‘মাইকেল’ সেই অর্থে একটি প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা।
লেখক: ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়ন নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর












