কান উৎসবের সম্মানসূচক স্বর্ণ পাম পাচ্ছেন সেই ‘ফানি গার্ল’

বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড। ছবি : রাসেল জেমস
১৮ বছর বয়সে সাড়া ফেলেন ক্যাবারেতে। কুড়িতে জয় করেন ব্রডওয়ে। ২১-এ প্রকাশিত হয় প্রথম স্টুডিও অ্যালবাম। আর ২৬ বছর বয়সে উইলিয়াম ওয়াইলার পরিচালিত ‘ফানি গার্ল’-এর সুবাদে সেরা অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার জয়। এভাবেই শুরু হয় আমেরিকান স্বপ্নের জৌলুস, স্বকীয়তা ও মহিমার এক অনন্য প্রতীক বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডের বিস্ময়কর যাত্রা।
বিশ্ববিখ্যাত এই অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, গায়িকা ও গীতিকার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানসূচক স্বর্ণ পাম পাচ্ছেন ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে। আগামী ২৩ মে ফ্রান্সের দক্ষিণে সাগরপাড়ে পালে দে ফেস্টিভ্যাল ভবনের গ্রাঁ থিয়েটার লুমিয়েরের মঞ্চে সমাপনী অনুষ্ঠানে মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে তার হাতে।
৮৩ বছর বয়সী বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড নিজের অনুভূতিতে বলেছেন, ‘সম্মানসূচক স্বর্ণ পাম পাওয়া বিশিষ্টজনদের তালিকায় যুক্ত হতে পেরে আমি গর্বিত ও সম্মানিত। আমরা এমন এক কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন চলচ্চিত্রের গল্পই মুক্ত করতে পারে মানুষের হৃদয় ও মনকে। সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অভিন্ন মানবতা ও সহনশীলতার কথা। চলচ্চিত্রই সীমান্ত ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের দেখায় সহানুভূতিশীল পৃথিবী গড়ার পথ।’
কান চলচ্চিত্র উৎসবের সভাপতি ইরিস নোব্লক এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এবারের আসরে আমরা এমন একজন শিল্পীকে সম্মান জানাতে চেয়েছি, যিনি শৈল্পিক শক্তি ও স্বাধীনতার আপসহীন সাধনার মাধ্যমে রেখেছেন আপন ছাপ। একজন নারী হিসেবে তাকে সম্মান জানাতে পারা আমার জন্য বিশেষ আনন্দের। তার অসাধারণ সব কাজের দৃষ্টান্ত সময়কে ছাপিয়ে আজও অনুপ্রেরণা জোগায় সবাইকে।’
একই বিবৃতিতে কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো উল্লেখ করেছেন, “বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড কেবল একজন বিশ্বতারকা নন, তিনি সর্বোপরি একজন শিল্পী। তিনি দর্শক-শ্রোতাদের জন্য এমন কিছু কাজ করেছেন, যেগুলোতে প্রতিফলন ঘটেছে তার শক্তিশালী শিল্পীসত্তার। ব্রডওয়ে, হলিউড ও সংগীত মঞ্চকে একসুতায় গেঁথে দেওয়ার এক বিরল মেলবন্ধন বলা যায় তাকে। তার গান শোনা ও অভিনয় দেখা আমাদের ফেলে আসা সময়ের অন্যতম সেরা স্মৃতি। কিংবদন্তি ‘ফানি গার্ল’কে প্রথমবারের মতো সাগরপাড়ে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত আমরা।”
৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা উঠবে আগামী ১২ মে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল ১১টায় (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) এবারের আসরের অফিসিয়াল সিলেকশন ঘোষণা করবেন আয়োজকরা।
বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডের সাফল্যের পরিসংখ্যা
হলিউড, ব্রডওয়ে ও বিশ্বসংগীতের কিংবদন্তি এক নাম বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে অভিনয়, সংগীত, পরিচালনা, প্রযোজনা ও চিত্রনাট্যে তার অর্জনের তালিকা বিস্ময়কর। বড় পর্দায় ১৯টি চলচ্চিত্রে অভিনয়, ৩টি চলচ্চিত্র পরিচালনা, ২টি অস্কার জয় ও ১১টি গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডস আছে তার ঝুলিতে। তিনি সেরা মৌলিক গান বিভাগে অস্কারজয়ী এবং সেরা পরিচালক হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব পাওয়া প্রথম নারী। বিনোদন জগতে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন, তা প্রায় অতুলনীয়। তবে এসব অর্জনের চেয়েও বড় বিশ্ব সংস্কৃতি ও পপ কালচারে তার গভীর প্রভাব।
বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড নারীদের জন্য এক অনুসরণীয় উদাহরণ। কখনও কোনও বাধা দমাতে পারেনি তাকে। ১৯৮৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ইয়েন্টেল’ এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৬৩ সালে আমেরিকান কথাসাহিত্যিক আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গারের একটি ছোটগল্প পড়ে মুগ্ধ হয়ে এর স্বত্ব কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু ছবিটি মুক্তি পেতে লেগেছে দীর্ঘ ২০ বছর! দৃঢ় মনোবল ও সাহসের জোরে ছবিটি প্রযোজনা, রূপান্তর, পরিচালনা ও অভিনয় করেন নিজেই। এর মাধ্যমে ইতিহাস পাতায় লেখা হয়েছে তার নাম। হলিউডে কোনও নারী নির্মাতা এত বড় বাজেটে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। ছবিটিতে প্রধান নারী চরিত্রের মুক্তি, পরিচয়ের রূপান্তর ও সামাজিক নিয়ম ভেঙে নিজের পথ তৈরি করার গল্প যেন তার নিজের জীবনের পথচলারই রূপক।
‘ইয়েন্টেল’ হয়ে আছে বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ডের ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক। ছবিটির সুবাদে ১৯৮৪ সালে গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডসে প্রথম নারী হিসেবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতেছেন তিনি। এরপর আরও দুটি ছবি পরিচালনা করেন বারব্রা। এরমধ্যে ‘দ্য প্রিন্স অব টাইডস’ (১৯৯১) ৭টি মনোনয়ন পেয়েছে অস্কারে। এরমধ্যে সেরা চলচ্চিত্র প্রযোজকের তালিকায় ছিল তার নাম। ১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দ্য মিরর হ্যাজ টু ফেসেস’ অস্কারে মনোনীত হয় দুটি বিভাগে। এরমধ্যে ব্রায়ান অ্যাডামস ও তার গাওয়া ‘আই ফাইনালি ফাউন্ড সামওয়ান’ মনোনয়ন পেয়েছে সেরা মৌলিক গান হিসেবে।
মিউজিক্যাল থেকে কমেডি, রোমান্টিক ড্রামা থেকে সামাজিক গল্প– সব ধারাতেই তার উজ্জ্বল উপস্থিতি মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। মিউজিক্যাল ছবির মধ্যে ‘হ্যালো, ডলি!’ (১৯৬৯) ও ‘অ্যা স্টার ইজ বর্ন’ (১৯৭৬), কমেডি ঘরানার ‘দ্য আওল অ্যান্ড দ্য পুসিক্যাট’ (১৯৭০), “ফর পিট’স সেক” (১৯৭৪), ‘মিট দ্য ফকার্স’ (২০০৩), আইনি ড্রামা ‘নাটস’ (১৯৮৭) কিংবা যুদ্ধোত্তর হলিউডের অন্যতম সুন্দর প্রেমের গল্প ‘দ্য ওয়ে উই ওয়্যার’ (১৯৭৩) ছবিতে দর্শকদের আবেগাপ্লুত করেছেন তিনি। ‘দ্য ওয়ে উই ওয়্যার’ অস্কারের সেরা অভিনেত্রী বিভাগে দ্বিতীয়বার মনোনয়ন এনে দিয়েছে তাকে। ১৯৭৭ সালে ‘অ্যা স্টার ইজ বর্ন’ ছবির ‘এভারগ্রিন’-এর জন্য সেরা মৌলিক গান বিভাগে অস্কার জিতেছেন তিনি।
বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড একদিকে ঝলমলে অভিনেত্রী, অন্যদিকে অসাধারণ গায়িকা। প্রাণশক্তি, রসবোধ ও আকর্ষণের এক দুর্দান্ত মিশ্রণ। সবক্ষেত্রে পরিপূর্ণতা খোঁজার পেশাদারিত্ব যেমন নিখুঁত, তেমনই কাজের ভেতর আবেগ ও আন্তরিকতা অটুট থাকে তার। ব্যক্তিজীবনের মতো কর্মক্ষেত্রেও তিনি স্বাধীন, সাহসী, ব্যতিক্রম ও আপসহীন।
সংগীতেও বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড সমান উজ্জ্বল। শৈশব থেকেই অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও জীবিকার তাগিদে প্রথমে গানে মন দেন তিনি। সংগীতশিল্পী হিসেবে ৩৭টি স্টুডিও অ্যালবাম, ১৩টি সাউন্ডট্র্যাক ও ১০টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড আছে তার ঝুলিতে। তিনিই একমাত্র শিল্পী, টানা ছয় দশক ধরে অ্যালবাম বিক্রিতে হয়েছেন নাম্বার ওয়ান। ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সর্বকালের সবচেয়ে বেশি নাম্বার ওয়ান অ্যালবামের গায়িকা।
অপ্রতিরোধ্য সাফল্যের পাশাপাশি বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড সামাজিক ও মানবকল্যাণে রেখেছেন সক্রিয় ভূমিকা। নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত উইমেন’স হার্ট সেন্টারের মাধ্যমে নারীদের হৃদরোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত স্ট্রাইস্যান্ড ফাউন্ডেশন লিঙ্গ ও সংখ্যালঘু সমতা, এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের অধিকার, পরিবেশের সুরক্ষা, চিকিৎসা গবেষণা ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিল্পশিক্ষার প্রসারে কাজ করছে ১৯৮৬ সাল থেকে।
















