জিইডির মূল্যায়ন
শিক্ষায় মুখস্থ বিদ্যার কারণে কমছে উৎপাদনশীলতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজ করছে বড় ধরনের গলদ। শ্রেণিকক্ষে মুখস্থ বিদ্যার প্রাধান্য কমাচ্ছে শিক্ষার্থীদের উৎপাদনশীলতা। সেই সঙ্গে রাজনীতিকীকরণ, দুর্বল জবাবদিহি বাড়াচ্ছে দুর্নীতির ঝুঁকি। এ ছাড়া হুমকির মুখে ফেলেছে অন্তর্ভুক্তিমূলক জিডিপি প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ অর্জনের প্রচেষ্টাকে। পাশাপাশি শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগের অপচয়, স্বল্প-দক্ষ শ্রম, দারিদ্র্যের বিস্তার এবং বৈষম্য তো রয়েছেই।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) মূল্যায়নে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্রাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক’-এ শিক্ষার ক্ষেত্রে এসব সমস্যা তুলে ধরে সমাধানের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বলেছেন, ফ্রেমওয়ার্কটি চলতি অর্থবছর থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এটি চলবে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে কোন কোন মন্ত্রণালয় কী কী কাজ বাস্তবায়ন করবে সেসব বিস্তারিতভাবে ভাগ করে দেওয়া আছে ফ্রেমওয়ার্কে। এটি বাস্তবায়নে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকছে।
‘শিক্ষা ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো সমাধান করা হবে। যাতে শিক্ষা হয় কর্মমুখী, বাস্তবনির্ভর এবং সত্যিকার অর্থে জীবন বদলে দেওয়ার মতো’, যোগ করেন পরিকল্পনা সচিব।
স্ট্রাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রধানত বিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ উন্নত করার ওপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই পর্যায়টি বর্ধিত ভর্তি, লিঙ্গ সমতা, বিদ্যালয় নির্মাণ সহায়তা কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন হয়েছে।
তবে, পরবর্তী প্রজন্মের চ্যালেঞ্জটি মৌলিকভাবে ভিন্ন। দেশ এখন আরও জটিল একটি সমস্যার সম্মুখীন। শিক্ষার্থীদের অর্থবহ জ্ঞান, জ্ঞানের দক্ষতা, কারিগরি যোগ্যতা এবং কর্মসংস্থানযোগ্য গুণাবলী অর্জন করতে হবে।
আরও বলা হয়েছে, ব্যাপক সংস্কার ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়। শিক্ষা খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো— শিখন সংকট ও নিম্নমান। উচ্চ ভর্তি হার সত্ত্বেও শেখার ফলাফল দুর্বল রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী তাদের গ্রেড স্তর অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। উচ্চতর স্তরেও পঠন বোধগম্যতা, বিশ্লেষণাত্মক যুক্তি, সমস্যা সমাধান, ধারণার প্রয়োগ এবং লিখিত যোগাযোগ কম রয়েছে।
এ ছাড়া লিখিত অভিব্যক্তিতে মুখস্থবিদ্যা শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষায় প্রাধান্য পায়। ফলে আত্মবিশ্বাস কম, দুর্বল অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্স, ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেশি এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা কম হচ্ছে। অনেক প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পড়া, অক্ষর ও শব্দ শনাক্ত করতে না পারা, পাঠ্য বুঝতে এবং সাধারণ গণিতের সমস্যা সমাধান করতে হিমশিম খায়।
জিইডি বলেছে, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নে দুর্বলতা রয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার নিজস্ব ও শিল্পোন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি প্রধান দুর্বলতাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো দুর্বল শিল্প সংযোগ, অতুলনীয় কর্মপরিধি, অপর্যাপ্ত সরঞ্জাম, অনুৎপাদনশীল শিক্ষা, দুর্বল ডিজিটাল দক্ষতা, দুর্বল সফট স্কিল এবং নেতিবাচক সামাজিক ধারণা। আরও আছে, অপর্যাপ্ত ব্যবহারিক দক্ষতা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) দক্ষতায় দুর্বলতা, সমস্যা সমাধানে দুর্বলতা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে মাঝারি-দুর্বলতা।
অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র পরিবার, গ্রামীণ গোষ্ঠী, পরিবেশগত দুর্বলতা, বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা মেয়ে এবং কর্মজীবী শিশুরা। দক্ষতার অমিল এবং শিক্ষিত বেকারত্ব একটি অন্যতম সমস্যা।
দেশের শিক্ষার ফলাফল প্রায়শই শ্রম বাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। স্নাতকরা হয় বেকার অথবা আংশিক বেকার থাকছেন। এ ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা, তত্ত্বনির্ভর পাঠ্যক্রম, দুর্বল ব্যবহারিক দক্ষতা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে অদক্ষতা, শিল্প বিশ্লেষণ দক্ষতায় ঘাটতি এবং সীমিত সফটওয়্যারের ব্যবস্থা রয়েছে। এই অবস্থা শিল্পোন্নয়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক খাতগুলোকে হুমকির মুখে ফেলে।
জিইডি আরও বলেছে, দেশে স্নাতক বেকারত্ব ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং নারী স্নাতক বেকারত্ব ৩৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। দুর্বল শিক্ষকের গুণমান এবং শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষক কার্যকারিতা গুণমান কম থাকা শিক্ষার অন্যতম একটি সমস্যা। প্রধান সমস্যাগুলো হলো মুখস্থবিদ্যা পদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষে দুর্বল পাঠদান, অসম্পূর্ণ যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির দুর্বল সমন্বয় এবং অসম কর্মসংস্থান।
প্রধান উদ্বেগগুলো হলো রাজনীতিকীকরণ, দুর্বল জবাবদিহি, দুর্নীতির ঝুঁকি, প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্বল পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বয়ের অভাব। সম্পদের অপবণ্টন, দুর্বল সংস্কার বাস্তবায়ন, আস্থার হ্রাস এবং স্বল্প ব্যয়ের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যায়। শিক্ষায় ডিজিটাল বিভাজন এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
জানতে চাইলে জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, এ কৌশলগত পরিকল্পনায় ২০২৬-৩১ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তরের জন্য একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে, বিশেষ করে মানসম্মত শিক্ষাবিষয়ক এসডিজি ৪-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘বিপুল যুব জনসংখ্যা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত বাংলাদেশের জনতাত্ত্বিক গঠন প্রচুর সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। যদিও জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ থেকে লাভবান হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা তখনই বাস্তবায়িত হবে যদি শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের প্রাসঙ্গিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে’, যোগ করেন ড. মঞ্জুর।






