সাংবাদিকতায় এসে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, হৃদয় এখন জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়ে

হৃদয় আলম। ছবি : সংগৃহীত
দিনরাতে খবরের পেছনে দৌড়ানো কিংবা নিউজ রুমের চেনা ব্যস্ততা, জীবনটা আটকে থাকতে পারতো সেখানেই। কিন্তু হৃদয়ের চোখ জুড়ে ছিল আরও বড় এক ক্যানভাস, সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বকে ছোঁয়ার অদম্য তাড়না। সেই স্বপ্নে ভর করেই আজ জার্মানির মাটিতে নিজের নতুন পরিচয় লিখছেন হৃদয় আলম। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে পড়ালেখা করছেন দেশটির জেড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বাংলা সাহিত্যের আঙিনা থেকে সুদূর জার্মানির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্লাসরুম, এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার গল্পটা সহজ ছিল না। বাণিজ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে রাজধানীর অন্যতম সরকারি তিতুমীর কলেজে বাংলা সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন হৃদয়। কিন্তু শুধু পড়াশোনার গণ্ডিতে আটকে থাকেননি তিনি। যুক্ত হন সাংবাদিকতায়।
পড়াশোনা চলাকালীন সময়েই তিনি জাগো নিউজ, বিডি২৪ লাইভ, অর্থসূচক, বিডি জার্নাল, পূর্ব পশ্চিম বিডি, রাইজিংবিডিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। নিয়মিত যুক্ত ছিলেন লেখালেখি ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কাজে।
তিতুমীরে অনার্স শেষ হওয়ার পর হৃদয় যুক্ত হন বেসরকারি টেলিভিশন একাত্তরে। সেখানে তিনি কাজ করেছেন প্রায় সাড়ে চার বছর। এই দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেছেন, একাত্তরে অনেক কিছু শিখেছি। রাজনৈতিক নানান টানাপোড়েনের চিত্র দেখেছি। এখান থেকেই আমার জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তৈরি হয়। বরাবরই ইউরোপের অর্থনীতি আর বাংলাদেশের জনশক্তি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ ছিলো আমার।
একাত্তর টেলিভিশন ছেড়ে এরপর তিনি সময় টিভিতে যুক্ত হন। সেখান থেকেই জেড ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করেন। সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছেন, ইন্টারভিউতে আমার এই দীর্ঘদিন পর আবার কেন বাণিজ্যে দ্বিতীয় ব্যাচেলর করার ইচ্ছে হলো, তা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। চাওয়া হয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। পুরো বিষয়টি ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ, তবে স্মুথ।
এই দীর্ঘ ও অদম্য যাত্রার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ছোটবেলা থেকেই চারপাশে ঘুরে বেড়ানো, নতুন মানুষকে জানা এবং সমাজ ও সংস্কৃতির নানামুখী রূপ দেখার প্রবল আগ্রহ ছিল তার। শহরের স্থাপত্য, রাস্তাঘাটের কোলাহল এবং মানুষের জীবনসংগ্রাম তাকে খুব গভীরভাবে টেনেছিল। যা পরবর্তীতে তার পর্যবেক্ষণ বাড়াতে সাহায্য করেছে।
প্রতিটি মানুষের সাফল্যের পেছনের মূল শক্তি হলো তার পরিবার। জার্মানির মতো একটি দেশের উচ্চশিক্ষার প্রক্রিয়াকরণ এবং দীর্ঘ ভিসা অপেক্ষার সময়ে পরিবার ছিল তার সবচেয়ে বড় মানসিক শক্তির জায়গা। হৃদয়ের ভাষায়, ‘যখনই অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে, পরিবারের অবিচল বিশ্বাস আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।’
বাণিজ্য ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা সত্ত্বেও সরকারি তিতুমীর কলেজে বাংলা সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হওয়ার মূল কারণ ছিল ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা, সাহিত্য-চর্চা এবং সাংবাদিকতা ও লেখালেখির প্রতি ঝোঁক। তিনি জানতে চেয়েছিলেন মানুষ, সমাজ ও ভাষার ভেতরের মূল স্পন্দনকে।
আবার মানবিক থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শিফট করা নিশ্চিতভাবেই একটি বড় সিদ্ধান্ত ছিল। তবে এ বিষয়ে তার কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়নি।
তার ভাষ্য, ততদিনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সাহিত্যের জ্ঞান মানুষকে মনস্তত্ত্ব ও যোগাযোগ দক্ষতা শেখালেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কাজ করতে হলে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জ্ঞান অপরিহার্য।
ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসায় জার্মানির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট ম্যাচিং এবং প্রয়োজনীয় ইটিসিএস ক্রেডিট পূরণ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে ইংরেজিতে বি২ লেভেলের দক্ষতা, পূর্বের কাজের অভিজ্ঞতা, স্টেটমেন্ট অফ পারপাস এবং পূর্ববর্তী ডিগ্রির একাডেমিক যোগ্যতা সঠিকভাবে প্রদর্শন করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির শর্তগুলো পূরণ করেন।
সময় টেলিভিশন এবং একাত্তর টেলিভিশনে নিউজ রুম এডিটর ও ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে সাড়ে চার বছর কাজ করা ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা। আন্তর্জাতিক সংবাদ ও অর্থনীতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন, ইউরোপের অর্থনীতির যে ড্রাইভিং ফোর্স, তা নিয়ে আরও গভীরভাবে শেখা দরকার।
হৃদয় বলেছেন, সাড়ে চার বছর সফলভাবে প্রফেশনাল সাংবাদিকতায় থাকার পর হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে আবারও পুরোপুরি শিক্ষার্থীর খাতায় নাম লেখানো নিঃসন্দেহে একটি বড় রিস্ক ও চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে লক্ষ্যের প্রতি স্পষ্টতা থাকার কারণে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে তিনি দ্বিতীয়বার ভাবেননি।
তবে জার্মানি আসার প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। এই প্রায় সাড়ে তিন বছরের দীর্ঘ সময়ে অগণিত দিন কেটেছে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের মেইল চেকিং, আইইএলটিএস ও জার্মানির ভাষা শেখা এবং আইনি ও অর্থনৈতিক কাগজপত্র রেডি করার কাজে।
অনেক সময় অনিশ্চয়তা ও হতাশা ঘিরে ধরত। হতাশা কাটানোর অভিজ্ঞতা জানিয়ে হৃদয় বলছিলেন, নিজের ব্লগ, বই পড়া এবং কনটেন্ট ক্রিয়েশনের কাজে যুক্ত রেখে নিজেকে আমি ইতিবাচক রেখেছিলাম।
জার্মানির আইইএলটিএস, ব্লকড অ্যাকাউন্ট ফান্ড ম্যানেজ করা এবং জটিল ভিসা ডকুমেন্টেশনের প্রক্রিয়া বেশ ধৈর্য পরীক্ষা নেয়। দীর্ঘ সময় দেশে অপেক্ষা করার কারণে আশেপাশের মানুষ ও পরিচিতদের থেকে নানান ধরনের প্রশ্ন ও কটু কথাও শুনতে হয়েছে তাকে। অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এত বছর ধরে চেষ্টা করেও হচ্ছে না, কেন চাকরি ছেড়ে দিলে?’
হৃদয় বলছিলেন, ‘যাদের লক্ষ্য দূরবর্তী, তাদের ধৈর্যও বড় হতে হয়।’
বর্তমানে তিনি জার্মানির উইলহেমশাভেনে অবস্থিত জেড ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পড়ালেখা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকশন কমিটিতে প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং একই সাথে নিজের ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরি করে তার ব্যস্ত সময় কাটে। নতুন এই মাল্টিকালচারাল পরিবেশ তাকে প্রতিদিন নতুন কিছু শেখাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, ইউরোপের বর্তমান অর্থনৈতিক মডেল এবং দক্ষ জনশক্তি কাঠামোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে একটি সেতু তৈরি করতে চান তিনি।
হৃদয় বলেছেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ ও সম্ভাবনাময় দক্ষ জনশক্তিকে কীভাবে বিশ্বমানের উপযোগী করে ইউরোপের বাজার ও অর্থনীতিতে আরও বেশি যুক্ত করা যায়, তা নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
জার্মানিতে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, দেশ থেকেই অন্তত এ১ বা এ২ লেভেলের জার্মান ভাষা শিখে আসার চেষ্টা করবে। এখানে ইংরেজিতে কোর্স হলেও দৈনন্দিন জীবন ও পার্টটাইম জবের জন্য জার্মান ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জার্মানি ভিসা এবং অ্যাডমিশন প্রক্রিয়ায় কোনো শর্টকাট নেই উল্লেখ করে তিনি ধৈর্য ধারণ করতে, সকল কাগজপত্র নির্ভুলভাবে প্রস্তুত করতে এবং যেকোনো থার্ড-পার্টি বিভ্রান্তি এড়িয়ে অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সামাজিক চাপ প্রসঙ্গে তার স্পষ্ট বার্তা, এই জার্নিতে লোকজনের নানান কথা শুনতে হবে; কিন্তু কে কী বলল তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকলে সফলতা একদিন ঠিকই ধরা দেবে।






