আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে অবরুদ্ধ প্রভোস্টকে বের করে নিল ছাত্রদল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরুদ্ধ প্রভোস্টকে উদ্ধার ঘিরে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে অবরুদ্ধ প্রভোস্টকে কার্যালয় থেকে বের করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
রবিবার রাত ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসানসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রভোস্টের কক্ষে তাদের এক সহপাঠীকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগে হলটির হল প্রভোস্টের পদত্যাগ এবং ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি জানান। তারা প্রায় আট ঘণ্টা প্রভোস্টকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে আন্দোলন করেন। তাদের সঙ্গে শিবির, ছাত্রশক্তিসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন সংহতি জানায়। বিভিন্ন হলের ছাত্র সংসদের নেতারাও আন্দোলনে অংশ নেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাত ১১টার দিকে প্রভোস্টের কার্যালয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল প্রাং। আন্দোলনকারীরা শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখানোর দাবি জানান। তবে প্রক্টরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সব শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে নয়, প্রতিনিধিদলের সামনে ফুটেজ দেখা হবে। এ সময় কোনো গণমাধ্যমকর্মী থাকতে পারবেন না বলেও জানানো হয়।
শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাত দেড়টার দিকে সেখানে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আল মোজাদ্দেদী আলফেসানী ও প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাদেরও অবরুদ্ধ করে রাখেন।
পরে প্রো-ভিসি আব্দুস সালাম জানান, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, হল সংসদের ভিপি আবু নাঈম এবং দুই প্রো-ভিসির উপস্থিতিতে সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হবে। শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেন। এরপর ভিপি আবু নাঈম ও ডাকসু নেতারা কার্যালয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এ সময় ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবিদ হাসনাত ও শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব জুনায়েদ আবরারের নেতৃত্বে একদল ছাত্রদল নেতা হট্টগোল শুরু করেন। এতে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রায় এক ঘণ্টা পর দুই প্রো-ভিসি সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
এরপর রাত পৌনে ৩টার দিকে ছাত্রদলের একটি দল শিবিরবিরোধী স্লোগান দিয়ে মিছিল নিয়ে প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ের দিকে আসে।
এরপর আবিদ হাসনাত ও জুনায়েদ আবরারের নেতৃত্বে একদল ছাত্রদল নেতাকর্মী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন। পরে হামলা সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে ফজলুল হক মুসলিম হলের ভিপি আবু নাঈম, জিএস ইমামুল হাসানসহ অন্তত ছয়জন আহত হন।
আহতদের মধ্যে আরও আছেন অমর একুশে হলের এজিএস ওবায়দুর রহমান হাসিব, মুজিব হলের জিএস আহমেদ আল সাবাহ, ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের পাঠক সম্পাদক তারেক ভূঁইয়া এবং হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তানভীরসহ কয়েকজন।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলায় ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবিদ হাসনাত, শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব জুনায়েদ আবরার, সদস্য কামরুজ্জামান অনিক, শহীদুল্লাহ হল সংসদের ভিপি প্রার্থী ও ছাত্রদল নেতা আশিকুর রহমান, সদস্য সিফাত খান, সদস্য তানভীর হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুসাদ্দিক জিহাদ, যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম নাহিদ, সদস্য নূর মোহাম্মদ ও সদস্য তানজিল ছিলেন।
সংঘর্ষের পর হল সংসদের জিএস ইমামুল হাসানকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভিপি আবু নাঈমের গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যায়। পরে আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর ছাত্রদলের একদল নেতাকর্মী প্রভোস্টের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। পরে তাকে কার্যালয় থেকে গার্ড দিয়ে বের করে নিয়ে যান। এ সময় ঢাবি ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক নূর আলম ভূঁইয়া ইমনকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়। ঘটনাটি ভিডিও ধারণের সময় সাংবাদিকদের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বাধা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি তামি দাবি করেছেন, গণমাধ্যমকর্মীদের ভিডিও ধারণে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন হল থেকে শিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে এসেছিলেন। পরে বিভিন্ন হল সংসদের ভিপি-জিএসদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে যান।
ছাত্রদলের নেতৃত্বে প্রাধ্যক্ষকে বের করে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মল্লিক ওয়াসি তামি জানিয়েছেন, তারা ভেতরে যাননি। হল ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়েছিলেন।
এদিকে প্রভোস্টের হেনস্তার শিকার শিক্ষার্থী ইব্রাহিম অভিযোগ করেছেন, ঘটনাটি পরে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। উভয় পক্ষই অন্যান্য হল থেকে নিজেদের লোকজন নিয়ে আসে। এতে তিনি নিজেই বিচারবঞ্চিত হচ্ছেন।
ইব্রাহিম বলেছেন, ‘ছাত্রদল আমার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এফএইচ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবিদ হাসনাতের নেতৃত্বে কমিটির আরও কয়েকজন মিলে অভিযুক্ত প্রভোস্টকে গার্ড দিয়ে বের করে নিয়ে গেছে। আমি বিচার চেয়েছিলাম, সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চেয়েছিলাম। অথচ এখনো বিচার পাচ্ছি না।’
হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ ওঠা ছাত্রদল নেতা আবিদ হাসনাত ও জুনায়েদ আবরারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফজলুল হক মুসলিম হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর দাবি, জুনায়েদ আবরার এর আগেও কয়েকটি ঘটনায় হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল প্রাং। তিনি জানিয়েছেন, উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম তাকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছেন। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







