ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনে সাফল্য দৃশ্যমান কাটেনি আবাসন সংকট
- নির্বাচিত ডাকসুর মেয়াদ শেষ আজ
- বরাদ্দ ৩৫ লাখ, উন্নয়ন ৪০ কোটি টাকার
- আবাসনে শৃঙ্খলা এলেও কাটেনি সংকট
- প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি)। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন-সংগ্রামের একপর্যায়ে অনুষ্ঠিত ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) চেয়ারে বসে নতুন কমিটি। ভিপি সাদিক কায়েম এবং জিএস এস এম ফরহাদ নেতৃত্বাধীন এই পর্ষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ সোমবার। এই পর্যায়ে চলছে তাদের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ৩৫ লাখ বরাদ্দ পেয়ে ৪০ কোটি টাকার উন্নয়ন করে যেমন আলোচনায় এই কমিটি, তেমনি রয়েছে আবাসন সংকট নিরসন, নিরাপদ ক্যাম্পাস নির্মাণসহ কিছু খাতে িনর্বাচনী ইশতেহার পূরণে ব্যর্থতা। এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্টতার জন্য একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সাদিক-ফরহাদদের।
বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায় সাদিক কায়েম-ফরহাদ নেতৃত্বাধীন এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর ডাকসুকে উন্নয়ন কাজের
জন্য ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যা তাদের ডাকসু পরিবহন ব্যবস্থায় সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি, সংগ্রহশালা তৈরিসহ কিছু কাজের উদ্বোধনেই শেষ হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের সংগ্রাম। শূন্যহাতে ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে পার করতে হয় নানা চড়াই উতরাই। অবশেষে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় হলের গেট নির্মাণ, কলাভবনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার তৈরি, মেয়েদের কমনরুমে এসি, মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা, ছাত্রী হলগুলোতে ১০ হাজারের বেশি স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, সান্ধ্যকালীন বাসসেবা চালুসহ নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে ডাকসু। এতে খরচ হয় ৪০ কোটি টাকার বেশি।
ক্যারিয়ারে নতুন সুযোগ: ক্যারিয়ার খাতে ডাকসুর ‘সিনো-বাংলা ডে’ ছিল আলোচিত উদ্যোগ। গত ১৭ আগস্ট টিএসসিতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ৩০ থেকে ৪০টি চীনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৪৩০টি চাকরির সুযোগ তৈরি হয়। এ ছাড়া সাতটি প্রসিদ্ধ জার্নালে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ফলে চাকরি ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে ডাকসুর কিছু উদ্যোগ সরাসরি শিক্ষার্থীদের কাজে লাগার সুযোগ তৈরি করেছে।
পরিবহনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য: ঢাবি শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অনাবাসিক। তাদের যাতায়াতের সেই ঝক্কিঝামেলা নিরসনে চালু হয়েছে সান্ধ্যকালীন বাস। শনিবারও দিচ্ছে ট্রিপ। সেবার আওতা বাড়িয়ে নতুন রুটের পাশাপাশি কুমিল্লা পর্যন্ত চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি। এমনকি বাসের অবস্থান জানার জন্য ‘লালবাস’ অ্যাপ চালু হলেও নানা সংকটে হয়ে পড়েছে অনিয়মিত। এই উন্নতির জন্য পরিবহন খাতেই সাড়ে ৪ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে বলে দাবি ডাকসুর। তবে ইশতেহার অনুযায়ী হয়নি বাস আধুনিকায়ন ও ক্যাম্পাসে নিবন্ধিত রিকশা চালুর মতো প্রতিশ্রুতিতে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি।
স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ, পূরণ হয়নি সব প্রতিশ্রুতি: স্বাস্থ্য খাতে ডাকসুর কর্মকাণ্ডের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। মেডিকেল সেন্টারের অবকাঠামো সংস্কারে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়। ফার্স্টএইড বুটক্যাম্পে খরচ আরও ৪০ লাখ টাকা। কয়েকটি মেডিকেল ক্যাম্পে ৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। হলভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মসূচিও পালিত হয়েছে। দুদিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল হেলথ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৭ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে চিকিৎসা। তুরস্কের সহযোগিতায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে অ্যাম্বুলেন্স, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র, এক্স-রে, ইসিজি মেশিন, অ্যানালাইজার, মাইক্রোস্কোপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম যুক্ত করার উদ্যোগও চলমান। তবে ইশতেহারের ‘ডিইউএমসি’ অ্যাপ চালু, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থা হয়নি।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু নতুন সুবিধা: নারী শিক্ষার্থীদের জন্যও কয়েকটি উদ্যোগ দৃশ্যমান। এর মধ্যে কলাভবনে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, মেয়েদের কমনরুমে এসি, মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা, ছাত্রী হলগুলোতে ১০ হাজারের বেশি স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, নারীদের জন্য জিম তৈরিতে অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া নারী হলগুলোতে নিরাপত্তা গেট স্থাপন ও বিভিন্ন হলে কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু অনাবাসিক ছাত্রীদের হলের নির্দিষ্ট সুবিধায় প্রবেশাধিকার, এক হলের শিক্ষার্থী আরেক হলে প্রবেশ, কমনরুমে নারী কর্মচারী নিয়োগসহ অনেক দাবি এখনো অপূর্ণ।
কাটেনি আবাসন সংকট: ডাকসুর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু এক বছর পরও এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সমাধান নেই। বিশেষ করে নারী হলগুলোতে আবাসন সংকট তীব্র। তবে আবাসন সংকট দূর করতে ডাকসুর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া এবং পাঁচটি হল নির্মাণের উদ্যোগ চলমান। এ ছাড়া চীনা সহযোগিতায় ১ হাজার ৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী খাবারের মান উন্নয়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অতৃপ্তি রয়ে গেছে। খাবারে পোকামাকড় ও বিভিন্ন অখাদ্য পাওয়ার অভিযোগও আসে মাঝেমধ্যে। এ ছাড়া ডাকসু নেতাদের জামায়াতের কর্মসূচিতে যোগদান, সংগ্রহশালায় বই অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সবার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চালানো উচ্ছেদ অভিযানের ধরন নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে নেতাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন বললেন, ডাকসুর ইশতেহার বিবেচনায় নিলে হয়তো এই কমিটিকে শতভাগ সফল বলা যাবে না। কারণ, ইশতেহারের অনেক কিছুই তারা পূরণ করতে পারেনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনবরত অসহযোগিতার অভিযোগও আমরা শুনেছি। এর মধ্যেও তারা যেটুকু করেছে, তাও আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া। আমরা যারা ২০১৯ সালের ডাকসুর পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি, আমাদের চোখের সামনেই বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে ডাকসু। তাই আগের ডাকসুর যে ইতিহাস শুনেছি, তার তুলনায় এই ডাকসু নিঃসন্দেহে সফল।
জাকিয়া জান্নাত নামে ছাত্রীর ভাষ্য, ডাকসুর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলগুলোতে পুরনো ধারার অপরাজনীতি ফিরে আসতে পারেনি। হলে গেস্টরুম-গণরুম ফেরাতে পারেনি কোনো রাজনৈতিক অপশক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সামগ্রিকভাবে অবকাঠামোগত অনেক পরিবর্তন এসেছে। যার পুরো কৃতিত্ব এই ডাকসুর। এ ছাড়া ক্যারিয়ার, স্পোর্টস ও মেডিকেল-সংক্রান্ত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। তবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী অনেক মৌলিক বিষয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন তারা আনতে পারেনি। বিশেষ করে খাবারের মান খুব একটা বাড়েনি, আবাসন সংকট, ক্যাম্পাসে ছিনতাইসহ নিরাপত্তা সংকট রয়েই গেছে।
ডাকসুর দাবি অনুযায়ী, উন্নয়নের স্বীকৃতি পাওয়া গেল ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এইচ এম মোশারফ হোসেনের বক্তব্যে। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ডাকসু যা বাজেট পায়, তা ছিল খুবই অপ্রতুল। মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। তবে তারা ৪০ কোটি টাকার সমপরিমাণ কাজ করেছে। এই অর্থ তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সর হিসেবে এনেছে। ডাকসু শুধু তদারকি করেছে, কিন্তু কাজ করে দিয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি।
তিনি জানালেন, ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে ভিপি, জিএস এবং এজিএসের জন্য বরাদ্দ ছিল, কিন্তু তারা সে অর্থ নেননি। বাকি সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী সদস্যরা তাদের বরাদ্দ করা অর্থ উত্তোলন করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করেছেন।
ভিপি সাদিক কায়েম বললেন, কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেটা অস্বীকার করছি না। তবে এসব সমস্যার বড় অংশই ডাকসুর একক সিদ্ধান্তে সমাধান করার সুযোগ নেই। খাবারের দাম কমিয়ে মান বাড়ানোর জন্য আমরা টিসিবির সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। আবাসন সংকট সমাধানে ২৮৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল এবং এর উদ্বোধনও হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। বিভিন্ন আবাসিক হলে এসি স্থাপনের প্রায় ৬ কোটি টাকার কাজ চলমান। তবে নতুন হল নির্মাণের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ডাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নির্বাচনের
ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় কেন— জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের ভাষ্য,
পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন করার জন্য এরই মধ্যে একটি পরিকল্পনা সভা হয়েছে। এ ছাড়া নানা
উদ্যোগ চলমান।



