দুই সিদ্ধান্তে সবজি রপ্তানি হবে দ্বিগুণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে উৎপাদিত তাজা শাকসবজি এবং ফলমূলের বাজার ক্রমশ প্রসারিত হলেও দেশের সম্ভাবনাময় এই খাতের পূর্ণ বিকাশ আটকে রয়েছে মূলত দুটি বড় প্রশাসনিক ও লজিস্টিক প্রতিবন্ধকতায়। একটি হলো অস্বাভাবিক বিমান ভাড়া এবং অন্যটি হলো প্রক্রিয়া কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় শীতলীকরণ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা। খাতসংশ্লিষ্ট ও শীর্ষ রপ্তানিকারকদের মতে, বিমান ভাড়া কমানো এবং শ্যামপুর সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউজের কুলিং সিস্টেমকে সার্বক্ষণিক কার্যকর করা— এই দুটি সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলেই বাংলাদেশের সবজি ও ফলমূল রপ্তানি অন্তত দ্বিগুণ করা সম্ভব।
ইউরোপের মূলধারার বাজারে বাংলাদেশি কৃষিপণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কার্গো পরিবহন ব্যয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোয় প্রতি কেজি সবজি ও ফল পাঠাতে আকাশপথে ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৪৯০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ প্রতিযোগী দেশ ভারতে এই ভাড়া কেজিতে মাত্র ২৬০ টাকা— অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক। বিশেষায়িত কার্গো বিমানের অভাব এবং যাত্রীবাহী বিমানের সীমিত জায়গায় তৈরি পোশাকশিল্পের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে এই পরিবহন ব্যয় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স লি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল হোসেন জানালেন, মাত্র এক দশক আগেও যখন বিমান ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে ছিল, তখন ভারতের চেয়েও বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে। শুধু বিমান ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে আনা গেলেই এই খাত থেকে রপ্তানি আয় রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
একইভাবে জেএন ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহমেদ জানালেন, বর্তমানে জার্মানি, ইতালি, সুইডেন বা লন্ডনে এক কেজি সবজি পাঠাতে ৪৯০ থেকে ৫১০ টাকা পর্যন্ত বিমান ভাড়া দিতে হচ্ছে, যা ভারতীয় ভাড়ার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এই খরচের ব্যবধানের কারণে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বিমান ভাড়ার পাশাপাশি শ্যামপুর সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউজের ভঙ্গুর কোল্ড চেইনব্যবস্থাও রপ্তানির পথে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীন এই প্যাকিং হাউজে সবজি ও ফল প্রসেসিং করা হলেও এর চারটি কুলিং চেম্বার একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে না। মাসের অর্ধেকের বেশি সময় শীতলীকরণ যন্ত্র বন্ধ থাকে বলে অভিযোগ করেছেন রপ্তানিকারকরা।
প্যাকিং হাউজের উপপরিচালক আমিনুর রশিদও এই সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। ফলে কৃষকপর্যায় থেকে প্রসেসিংয়ের জন্য আনা সবজি ও ফল ধোয়া এবং শোধনের পর আবার শীতলীকরণের জন্য পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে নিয়ে যেতে হয়। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবহন খরচ বাড়ে এবং বারবার ওঠানামার ফলে কোল্ড চেইন ভেঙে গিয়ে পচনশীল পণ্যের গুণগত মান মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়। পরিবহন ব্যয় ও লজিস্টিক সংকটের কারণে ফল এবং সবজি রপ্তানি খাতের আয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের কোনো প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। এক দশকে দেশে সবজির উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়লেও বিমান ভাড়া বৃদ্ধি ও লজিস্টিক দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাংলাদেশের অর্জন সংকুচিত হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ জানালেন, এ সংকট নিরসনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরে অবস্থিত গুদামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্যামপুর সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউজের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধান করে সবজি ও ফলমূল রপ্তানি বহু গুণে বৃদ্ধি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।



