দেশি মুরগি গরুর সমান!
- কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ১০০ টাকার বেশি
- দেশি মুরগি ৭২০-৭৫০ টাকা কেজি, গরুর মাংসও মিলছে ৭৫০ টাকায়
- জ্বালানি সংকটে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়
- বাজারে গিয়ে বাজেটে কাটছাঁট

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
এক মাসের বেশি সময় ধরে আকাশছোঁয়া মুরগির দাম। ঈদের পর থেকেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি ও দেশি মুরগি। বাজারের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রতি কেজি সোনালি মুরগির দাম ১৪০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৫০ টাকা কেজি। আর দেশি মুরগি ৮০-১০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭২০-৭৫০ টাকা কেজি; যা হাড়সহ ১ কেজি গরুর মাংসের দামের সমান।
মুরগির দামের এই উল্লম্ফনের কারণে গরুর মাংস কেনার সাধ্য কম, এমন ক্রেতারা পড়েছেন বিপাকে। আবার ধর্মীয় বা স্বাস্থ্যগত কারণে যারা গরুর মাংস খান না, তাদের মধ্যে অনেকের বাড়িতে মাংস রান্না হচ্ছে না দীর্ঘদিন।
গত শনিবার রাজধানীর কয়েকটি বাজারে দেখা গেল, ব্রয়লার এবং সোনালি মুরগির জোগান যথেষ্ট থাকলেও, দেশি মুরগি নেই বললেই চলে। কারওয়ান বাজারে মুরগি কিনতে আসা রুবেল (২৫) নামের এক ক্রেতার আক্ষেপ, ‘দেশি মুরগি সব সময় খাই না। আমার ছোট ভাই দেশি মুরগি খাবে বইলা মহাখালী থেকে আসছি এই বাজারে। কিন্তু একটা দেশি মুরগির যে দাম, তা দিয়ে সোনালি মুরগি কিনতে পারতাম তিনটা। পাওয়া যেত ১ কেজি গরুর মাংসও। যে মুরগি এইখান থিকা ৯০০ টাকায় কিনলাম, সেটা আমাদের গ্রামে অনায়াসেই ৬০০ টেকায় পাইতাম’, যোগ করলেন রুবেল।
নিজের পুরো পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাজীব কুণ্ডু (ছদ্মনাম) শোনালেন আরেক জটিলতার গল্প। তিনি জানালেন, ধর্মীয় কারণে তার বাড়িতে গরুর মাংস খাওয়া হয় না। যেকোনো অনুষ্ঠান বা আয়োজনে দেশি মুরগিই তাদের ভরসা। তিনি ১০টি দেশি মুরগি কিনতে এসেছেন বাজারে। কিন্তু দাম ছাড়িয়েছে সাধ্যের সীমা। বাধ্য হয়েই তাকে কাটছাঁট করতে হচ্ছে বাজেটে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ঢাকায় দেশি মুরগি আসে শুধু গ্রামাঞ্চল থেকে। গ্রামের নারীরাই মূলত পোষেন দেশি মুরগি। তবে শীতের পর কলেরা, রানীক্ষেতসহ বার্ড-ফ্লুর প্রকোপে খামার ও বাড়ির পোষা মুরগি মরেছে ব্যাপক হারে। বাজারে কমেছে সরবরাহ। পাশাপাশি জ্বালানি সংকটে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়ও। তবে চাহিদা আছে আগের মতোই। ফলে বেড়েছে দাম।
কারওয়ান বাজারের মুরগি বিক্রেতা বিল্লাল হোসেন আগামীর সময়কে দিলেন মুরগির দরের চিত্র। তিনি জানালেন, দেশি মুরগির ক্রেতা আছে আগের মতোই; কিন্তু কমেছে সরবরাহ। পাইকাররাও আগের মতো দিতে পারছেন না দেশি মুরগি।
বিল্লালের দাবি, ‘আগে যেখানে প্রতিদিন ৬০-৭০টি দেশি মুরগি কিনতাম, এখন কিনতেছি ৪০টা। মুরগি কম আসার কারণে ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়াইয়া দিতাছে। তারা দেশি মুরগি বাজারে আনার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি কইরা দিতে পারতাসে। তহন দামও বাড়াইয়া দিতেছে।’
আরেক ব্যবসায়ী মামুন জানালেন, মুরগির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারাও। মামুন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যারা দেশি মুরগি খায় সেসব কাস্টমার কমে নাই, কমছে মুরগির সংখ্যা। আমরা দাম বেশি দিয়ে কিনলেও লাভের টেকা বাড়ে নাই। অনেক সময় লসেই বিক্রি করা লাগে।’
‘ভিন্ন ব্যবসায়ীদের থেকে কেনার কারণে দামে তফাত থাকে, কিন্তু বিক্রি করার সময় ঠিক একই দামে বিক্রি করা লাগে। তহন যে ব্যবসায়ীর কাছে থেকে বেশি দামে কিনি, তাদেরটাও একই দামে বিক্রি করা লাগে।’
অবশ্য ক্রেতাদের কেউ কেউ দুষছেন পাইকার-খুচরা উভয় বিক্রেতাকেই। তারা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেন সব সময়। রেডি থাকে তাদের নানা অজুহাত।
বিষয়টি যাচাই করতে যোগাযোগ করা হয় মানিকগঞ্জের এক গৃহিণীর সঙ্গে। হোসনে আরা নামের ওই গৃহিণী বাণিজ্যিকভাবে পালন করেন দেশি মুরগি। মুরগির মড়ক লাগার তথ্য দিলেন তিনিও। আগামীর সময়কে জানালেন, শীত শেষ হওয়ার পরপরই তার খামারে দেখা দেয় কলেরার প্রাদুর্ভাব। এরপর মারা যায় তার ৫০টি মুরগি। তারপর নতুন করে আর তোলেননি মুরগির ছানা।
অবশ্য দেশি মুরগি পালনের আগ্রহ কমার পেছনে আরেকটি বিষয় সামনে আনলেন হোসনে আরা। তার দাবি, ব্রয়লার মুরগির জোগান বেশি থাকায় দেশি মুরগি পালনে আগ্রহ হারাচ্ছেন তার মতো গৃহিণীরা।
দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা আছে সরকারের তদারকির অভাবও। সরকার যদি এখনই কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে গরুর মাংসের দাম ছাড়িয়ে খাসির মাংসের দাম ছোঁবে দেশি মুরগি।
তখন দেশি মুরগি হয়তো পরিণত হবে বিত্তশালীদের বিলাসী খাবারে।

