অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে খুশি, বাড়তি কর আরোপের প্রতিবাদ রিহ্যাবের

ছবি: আগামীর সময়
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিনাশর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। তবে এই ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর এবং জমির মালিকদের ওপর অতিরিক্ত দ্বৈত কর চাপানোর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি।
রিহ্যাব মনে করে, বর্তমান সংকটের সময়ে নতুন এই করের বোঝা ফ্ল্যাটের দামকে আকাশচুম্বী করবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই শিল্পকে ঠেলে দেবে আরও গভীর স্থবিরতার দিকে।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয় এই প্রতিক্রিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ. এফ. এম. ওবায়দুল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম রিজিয়ন) মোহাম্মদ মোরশেদুল হাসান।
লিখিত বক্তব্যে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বাইরে রয়েছে। নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে এই অর্থ আবাসনসহ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পেলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানান।
তবে বাজেটের এই একটি ইতিবাচক দিক ছাড়া অন্য সব নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত আবাসন খাতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। বিশেষ করে জমির মালিকদের থার্ড অ্যাগ্রিমেন্টের ওপর নতুন ট্যাক্স আরোপের তীব্র সমালোচনা করেছে রিহ্যাব।
আগে জমির মালিককে শুধু সাইনিং মানির ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হতো। তবে নতুন নিয়মে ডেভলপারের তৈরি করে দেওয়া ফ্ল্যাটের ওপরও জমির মালিকদের নতুন করে ১৫ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২৪টি ফ্ল্যাটের একটি প্রকল্পে জমির মালিক যদি ১২ কোটি টাকা মূল্যের ১২টি ফ্ল্যাট পান। তবে তাকে কর বাবদই দিতে হবে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। যা প্রায় ২টি ফ্ল্যাটের মূল্যের সমান। এই সিদ্ধান্তের ফলে জমির মালিক সেই টাকা ডেভলপারের কাছ থেকে আদায় করতে চাইবেন এবং সব মিলিয়ে ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাবে।
এর পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর ওপর নতুন কর ও শুল্ক আরোপের ফলে নির্মাণ ব্যয় আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রডের ওপর কর বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রডের দাম ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে।
এছাড়া পিভিসি রেজিন ও পেট রেজিনের কর দ্বিগুণ করা, কোল্ড-রোল্ড কয়েলের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক এবং কপার তার ও কপার টিউবের ওপর কর বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার কারণে সামগ্রিক আবাসন শিল্প আরও বড় সংকটে পড়বে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষের আয়ের এই খাতটি এর ফলে আরও খারাপের দিকে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, বর্তমানে ফ্ল্যাট ও জমি কেনাবেচায় নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ব্যয় ১৩ শতাংশের ওপরে থাকায় লেনদেন ভয়াবহভাবে কমে গেছে।
রিহ্যাব এই ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার এবং সেকেন্ডারি মার্কেট সৃষ্টির প্রস্তাব করলেও বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা। গত আড়াই বছরে ৩টি সরকার পরিবর্তনের ফলে নীতিনির্ধারণী ধারাবাহিকতার অভাব এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য ও অর্থপাচার সংক্রান্ত চাপের কারণে আবাসন খাতে বড় ক্রেতা সংকট তৈরি হয়েছে।
সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ না থাকায় মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নির্মিত ফ্ল্যাট বিক্রি না হওয়ায় ডেভলপারদের মূলধন আটকে যাচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে।
রিহ্যাব নেতৃবৃন্দ স্মরণ করিয়ে দেন, দেশের জিডিপিতে পুরো নির্মাণ খাতের অবদান প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ এবং এই খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিকসহ প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই দেশের আবাসন শিল্পকে রক্ষা করতে এবং প্রস্তাবিত বাজেটের সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিশ্চিত করতে নতুন আরোপিত অতিরিক্ত কর ও শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।


