শীর্ষ ২০ খেলাপিকে জালে আটকাতে নতুন কৌশল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শীর্ষ ২০ খেলাপিকে জালে আটকাতে ‘স্বতন্ত্র ঋণ উদ্ধার কৌশল’ তৈরি করতে রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কারণ ব্যাংকগুলোর মূল সংকটের পেছনে রয়েছে খেলাপিদের দৌরাত্ম্য। অধিকাংশ ব্যাংকের ঋণের সিংহভাগ আটকে রয়েছে বড় ঋণগ্রহীতার কাছে। পাশাপাশি খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা অাদায়ে ‘নগদ আদায় টিম’ গঠন এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ওপর কঠোর নজরদারি করা হবে। মূলত ভঙ্গুর ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে, যা বাস্তবায়নের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে ১৪-১৮ মাস। সাম্প্রতিক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এফআইডির সচিব নাজমা মোবারেক। সেখানে তিনি বলছেন, ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে হলে খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমাতে হবে। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদ এবং নির্বাহীরা খেলাপি ঋণ আদায় ও কমিয়ে আনতে পারবেন।
জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, খেলাপি ঋণের বেড়াজালে আটকে রয়েছে দেশের পুরো ব্যাংক খাত। এর বড় অংশই সৃষ্টি হয়েছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের কারণে, যে টাকা আর দেশে নেই। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ১৮ মাসের রোডম্যাপ এবং খেলাপি ঋণ আদায় টিম গঠন করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত দুরূহ। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের এই চক্কর থেকে বের হতে না পারলে ব্যাংকের চড়া সুদের হারও কমানো সম্ভব নয়।
স্বতন্ত্র পরিকল্পনা: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ের কার্যক্রম খুব বেশি কার্যকর হচ্ছে না। এ সংকট কাটাতে প্রতিটি ঋণের বিপরীতে ‘ব্যাংক হিসাবভিত্তিক রেজল্যুশন কৌশল’ চালুর নির্দেশ দিয়েছে অর্থ বিভাগ। সেখানে প্রতিটি বড় গ্রাহকের বকেয়া ঋণ, জামানত, আইনি অবস্থা এবং আদায়ের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হবে। একই সঙ্গে আদায় কার্যক্রমের জন্য সুনির্দিষ্ট টিম দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবে।
এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এতদিন সবাইকে এক পাল্লায় মেপে ঋণ আদায়ের চেষ্টা হতো, যা কার্যকর ছিল না। এখন থেকে শীর্ষ ২০ খেলাপির প্রত্যেকের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত ফাইল ধরে কৌশল বানাতে হবে ব্যাংকগুলোকে। কার কাছে কত টাকা পাওনা, জামানত কী আছে এবং মামলা বা আইনি অবস্থা কোথায় দাঁড়িয়েছে— তা খতিয়ে দেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী উদ্ধার করা হবে সে টাকা। এর জন্য নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
খেলাপি ঋণ আদায় টিম গঠন: বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে ব্যাংক খাতের মুনাফা, মূলধন ও আর্থিক সক্ষমতা ধ্বংসের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো পাহাড়সমান খেলাপি ঋণ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুরনো খেলাপি ঋণ থেকে প্রকৃত ‘নগদ আদায়’ এবং নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টি রোধ— উভয় কাজই একসঙ্গে চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর জন্য প্রতিটি ব্যাংকে ‘খেলাপি ঋণ আদায় টিম’ গঠন করতে হবে। যাদের মাসিক নগদ আদায়ের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকবে এবং শাখাভিত্তিক কাজের মূল্যায়ন করা হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক কর্মমূল্যায়নে নগদ আদায় ও খেলাপি ঋণ রোধের বিষয়টি যুক্ত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ নিয়মিত এই রিকভারি টিম ও শাখাগুলোর কাজের অগ্রগতি তদারকি করবে।
নগদ আদায়: খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কৃত্রিম হিসাব বাদ দিয়ে প্রকৃত ‘নগদ আদায়’-এর ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে আরও বলা হয়, ঋণ আদায় বলতে শুধু খাতা-কলমে সমন্বয়, পুনঃতফসিলীকরণ, পুনর্গঠন বা নিয়মিতকরণ বোঝায় না। যদিও এসব পদ্ধতির নিজস্ব আইনি ও প্রক্রিয়াগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট মোচন, আয় বৃদ্ধি এবং মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে নগদ আদায়ের কোনো বিকল্প নেই।
বৈঠকে অালোচনায় উঠে আসে খেলাপিদের ‘এক্সিট পদ্ধতি’ নিয়ে। সেখানে বলা হয়, ব্যাংক খাতে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ, পুনর্গঠন এবং এক্সিট সুবিধা চালু রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সংকটে পড়েছে; কিন্তু ভালো ব্যবসা করার সক্ষমতা আছে, এমন গ্রাহকদের কিস্তি পরিশোধের সুযোগ দেওয়া। এ ছাড়া ব্যাংকের টাকা উদ্ধার বাড়ানো। তবে অতীতে দেখা গেছে, এ সুবিধার অপব্যবহার করে খারাপ ঋণ লুকিয়ে রাখা বা বারবার সময় বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা চলেছে। এমনকি ভুয়া বা কৃত্রিম উপায়ে হিসাব সুন্দর দেখিয়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর মাধ্যম হিসেবেও এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। এ পরিস্থিতি রোধে যিনি সত্যি সত্যিই সংকটে আছেন; কিন্তু শোধ করার সামর্থ্য আছে, শুধু তাকেই পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া উপযুক্ত গ্রাহক আছেন, তাদের ক্ষেত্রে এককালীন এক্সিট (বের হওয়া) সুবিধা দিয়ে দ্রুত বকেয়া টাকা তুলে নিতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ শোধ করছে না, টাকা পাচার করেছে বা সহযোগিতা করছে না— সেক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না, সরাসরি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, ব্যাংক পর্ষদকে নিশ্চিত করতে হবে, এ সুবিধাগুলো যেন কোনোভাবেই খেলাপি ঋণ লুকানোর ফাঁকফোকর হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। এক্সিট সুবিধা দেওয়ার আগে মামলার খরচ বা জামানত বিক্রি করে কত টাকা উঠবে, তা যাচাই করে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রোডম্যাপে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় একটি পরিবর্তন আনা হচ্ছে পরিচালনা পর্ষদের। এতদিন পর্ষদের সদস্যরা প্রায়ই ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেন। এখন পর্ষদের মূল কাজ হবে কৌশলগত নীতি প্রণয়ন, ঝুঁকি নির্ধারণ, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, খেলাপি ঋণ এবং প্রভিশন ঘাটতির কারণে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক বর্তমানে তীব্র মূলধন সংকটে ভুগছে। এ ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব আয় থেকে ‘অর্গানিক ক্যাপিটাল জেনারেশন’-এর ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। বিশেষ করে উন্নত গ্রাহকসেবা, প্রবাসী আয় সংগ্রহ, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি-ভিত্তিক আয় বাড়িয়ে মুনাফা অর্জন করে মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর তহবিল খরচ কমাতে ব্যয়বহুল আমানত কমিয়ে কম সুদের স্থিতিশীল আমানত বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
শুধু ঋণ বিতরণ বা সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে ঋণের গুণগত মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রোডম্যাপে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সচল রাখতে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, নারী উদ্যোক্তা এবং উৎপাদনমুখী খাতে মানসম্পন্ন ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বলা হয়েছে। প্রতিটি শাখাকে প্রতি মাসে কমপক্ষে দুটি যোগ্য সিএমএসএমই ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। তবে তা যেন সঠিক খাতে ব্যবহার হয়। পাশাপািশ ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাও থাকে, তা বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।



