যন্ত্রাংশের আড়ালে গোটা গাড়ি আমদানি, ধরা সিআইআইডির জালে

৩-৪ বড় খণ্ডে কেটে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিনব কৌশল উদঘাটন করেছে সিআইআইডি। ছবি : সংগৃহীত
‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণার আড়ালে মাত্র তিন থেকে চারটি বড় খণ্ডে কেটে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির অভিনব কৌশল উদঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। মোংলা বন্দরে আসা একটি চালানে আলাদা আলাদা গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে পণ্য ঘোষণা করা হলেও পরীক্ষায় পাওয়া গেছে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অংশ জোড়া লাগালে সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলোর মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা সম্ভব।
চালানটিতে শনাক্ত হয়েছে রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট। চারটি গাড়ির বাংলাদেশি বাজারমূল্য আনুমানিক ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
সিআইআইডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছ, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পরে গত ১৯ জুলাই শতভাগ ব্যবহারিক পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষায় বিআরটিএ ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়। গাড়ির বিভিন্ন স্থানে থাকা স্টিকার, লেবেল, চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তায় গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
চালানটির বিল অব এন্ট্রি (বিই) নম্বর C-6904 তারিখ ২০ এপ্রিল ২০২৬। এতে ১৪টি আইটেমে মোট ১৬৪ প্যাকেজ পণ্য ছিল। ঘোষিত মোট ওজন প্রায় ১০ হাজার ২২০ কেজি। আমদানিকারক ঢাকার ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে পণ্যগুলো মোংলা বন্দরে আনা হয়।
ঘোষণায় ব্যবহৃত দরজা, ২ হাজার সিসির পেট্রোল ইঞ্জিনসহ গিয়ার অ্যাসেম্বলি, সাসপেনশন শক অ্যাবজর্বার, নোজ কাট, হেডলাইট, টেইল লাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং হুইল, বাম্পার, এয়ার ক্লিনার বক্স, রাবার চ্যানেল, ডিফারেনশিয়াল ও অ্যাক্সেল অ্যাসেম্বলিসহ বিভিন্ন ‘ইউজড কার পার্টস’ দেখানো হয়।
তবে ব্যবহারিক পরীক্ষায় এসব পণ্যের বিপরীতে ওয়্যারিং হারনেস, সেন্সরসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত ফ্রন্ট কাট, কমপ্লিট রিয়ার বা টেইল কাট, ফ্রন্ট ও রিয়ার বডি কাট এবং রুফ কাট প্যানেল অ্যাসেম্বলি পাওয়া যায়।
সিআইআইডির অনুসন্ধানে উঠে আসে, সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের পরিবর্তে গাড়িগুলোকে কয়েকটি বড় অংশে কেটে এসকেডি (সেমি নকড ডাউন) অবস্থায় আমদানি করা হয়েছে।
শনাক্ত চার গাড়ির মধ্যে ২০১৭ মডেলের রেঞ্জ রোভার ভোগের বাংলাদেশি বাজারমূল্য আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ২০১০ মডেলের বিএমডব্লিউ ৬৫০আইয়ের মূল্য প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা। ২০১৬ মডেলের লেক্সাস এলএক্স৫৭০-এর মূল্য ২ কোটি থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। আর টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।
অন্যদিকে পুরো চালানটির ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা। এ হিসাবে ঘোষিত শুল্ক-কর দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং অন্যান্য অর্থসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ প্রায় ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা।
সিআইআইডি বলছে, এসব পণ্যকে পৃথক ‘ইউজড কার পার্টস’ হিসেবে না দেখিয়ে জিআরআই রুল ২(এ) অনুযায়ী এসকেডি অবস্থায় সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করলে কত শুল্ক-কর প্রযোজ্য হতো? সংশ্লিষ্ট গাড়ির মূল্য, ইঞ্জিন ক্ষমতা, বয়স, অবচয়, ট্যারিফ ভ্যালু বা মিনিমাম ভ্যালু এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর নির্ধারণের পরই রাজস্ব ফাঁকির প্রকৃত অঙ্ক জানা যাবে।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের মতে, খণ্ডিত অবস্থায় আমদানি করা হলেও কোনো পণ্যে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান থাকে, তাহলে জিআরআই রুল ২(এ) অনুযায়ী সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্যের শ্রেণিবিন্যাসে বিবেচনা করা যায়।
এ ঘটনায় আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২৪, আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৫০ এবং কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান লঙ্ঘনের বিষয়ও পরিলক্ষিত হয়েছে বলে সিআইআইডি জানিয়েছে।
এ ছাড়া এনবিআরের ১৯৯৭ সালের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার শর্ত ভঙ্গের কারণে চালানটি এসকেডি মোটরযান হিসেবে শুল্কায়নের জন্য কাস্টম হাউস, মোংলাকে মতামতসহ প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে যথাযথ শুল্কায়ন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।







