২৩৬৭ কোটি টাকা লুট
- দেউলিয়ার পথে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের বীমা খাতের একসময়ের পরাশক্তি ‘ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স’ এখন প্রায় পুরোপুরি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির লাইফ ও সঞ্চয় তহবিল থেকে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা সরাসরি লোপাট করা হয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ তথ্যমতে, কোম্পানিটির বর্তমান স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পদ বিক্রি করা হলেও সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি সাধারণ গ্রাহক ও আমানতকারী কষ্টে অর্জিত সম্পূর্ণ পাওনা টাকা পুরোটা ফেরত পাবেন না।
দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত লুটপাটের ফলে প্রতিষ্ঠানটি বিশাল ধ্বংসস্তূপের মুখোমুখি। আইডিআরএর সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে কোম্পানিটির স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট সম্পদমূল্য ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে বকেয়া ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীমাদাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকায়, যা বিদ্যমান মোট সম্পদের তুলনায় অন্তত ১৬১ কোটি বেশি।
তবে খাতসংশ্লিষ্ট আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব চিত্র এর চেয়েও করুণ। ফারইস্টের দেখানো ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকার সম্পদের সিংহভাগই আটকে রয়েছে জমি, ভবন ও সহজে বিক্রি অযোগ্য রিয়েল এস্টেট খাতে। বর্তমান মন্দা বাজারে এসব স্থাবর সম্পদ দ্রুত বিক্রি করা অত্যন্ত কঠিন। তাড়াহুড়ো করে বিক্রি করতে গেলে প্রকৃত বাজারমূল্য অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ কমে যাবে। ফলে বাস্তবে মূল ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
আইডিআরএর নির্দেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম ‘শিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি’ পরিচালিত বিশেষ নিরীক্ষায় এ নজিরবিহীন প্রতারণার চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির লাইফ ও সঞ্চয় তহবিল থেকে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি সরাসরি লোপাট এবং ৪৩২ কোটি টাকার লেনদেনে মারাত্মক অনিয়ম হয়েছে। পর্ষদ কর্তারা তোপখানা রোড ও কাকরাইলসহ বিভিন্ন স্থানে বাজারদরের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পকেটস্থ করেছেন। এ ছাড়া ব্যাংকে গচ্ছিত কোম্পানির আমানত বন্ধক রেখে নিজেদের বেনামি প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা করা হয়েছে খেলাপি।
আইন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় নথি জমার ৯০ দিনের মধ্যে বীমাদাবি নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও ফারইস্ট গত এক বছরে মোট বকেয়া দাবির মাত্র ৬ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেছে। ফলে বাধ্য হয়ে গত এক বছরে অন্তত ১১ হাজার গ্রাহক তাদের চলমান পলিসি বাতিল করেছেন, যা কোম্পানির নগদ অর্থপ্রবাহকে শূন্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের ৩৬টি জীবনবীমা কোম্পানির পুঞ্জীভূত বকেয়া দাবির প্রায় ৭০ শতাংশই এককভাবে ফারইস্টের ঘাড়ে।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সামগ্রিক ধস ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মঈন উদ্দিন বলেছেন, ফারইস্টের এ পরিস্থিতি প্রমাণ করে আইডিআরএ এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বছরের পর বছর সাধারণ গ্রাহকের সঞ্চয় থেকে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হলেও তদারকি সংস্থার এমন নিষ্ক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত হতাশাজনক।
তিনি আরও উল্লেখ করলেন, ফারইস্টের সব স্থাবর সম্পদ বিক্রি করেও গ্রাহকদের বকেয়া দাবির শতভাগ মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে পুরো বীমা খাতের ওপর সাধারণ মানুষের ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতাও বিলুপ্তির পথে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সৃষ্টি করছে মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি হুমকি।
কোম্পানির বর্তমান দশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া জানালেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন মালিকপক্ষ ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছিল। বর্তমানে তাদের কাছে নগদ অর্থ বলতে প্রায় কিছুই নেই। এখন প্রিমিয়াম বাবদ আসা সামান্য অর্থ দিয়েই বীমাদাবি মেটানোর চেষ্টা চলছে।
তার ভাষ্য, কাগজ-কলমে থাকা স্থাবর সম্পদগুলো অনেক বেশি মূল্য দেখিয়ে কেনা হয়েছিল। আইডিআরএর পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা থাকায় চাইলেই এসব হুট করে বিক্রি সম্ভব নয়। তবে ৯ জুলাই আইডিআরএ চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পর বর্তমান পর্ষদ সম্পদ বিক্রি করে পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্পদ মূল্যায়নে এর মধ্যে তিনটি নিরপেক্ষ কোম্পানিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দ্রুতই এ সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধানের আশা করছে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
আইডিআরএ মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানালেন, প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বকেয়া দ্রুত মেটাতে ফারইস্টসহ সাতটি বীমা কোম্পানিকে নজরদারিতে আনা হয়েছে। বিধিবদ্ধ সঞ্চয় ছাড়া শেয়ার ও স্থাবর সম্পদ বিক্রি করে অবিলম্বে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য অর্থের পরিমাণ আগস্টেই জানাতে হবে, ব্যর্থ হলে নেওয়া হবে কঠোর আইনিব্যবস্থা।




