শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে নতুন রোডম্যাপ

দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট, অনিয়মের অভিযোগ এবং ভালো কোম্পানির অনাগ্রহে দেশের শেয়ারবাজার যেন সম্ভাবনার তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে ছিল। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে এসেছে পরিবর্তন। দায়িত্ব নিয়েই নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান ঘোষণা দিয়েছেন একটি বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচির, যার লক্ষ্য শেয়ারবাজারকে আরও স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর বাজারে পরিণত করা।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিএসইসি ভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, কমিশনের ভিশন হলো খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর একটি ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী ইমার্জিং মার্কেটে রূপান্তর করা, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দেশি-বিদেশি মূলধন আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডিজিটাল রূপান্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান চেয়ারম্যান। আইপিও, রাইটস ইস্যু, বন্ড ও সুকুক আবেদন, লাইসেন্সিং, নিয়ন্ত্রক দাখিল, তথ্য প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারী সেবাসহ বাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রম ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হবে। তার ভাষায়, আধুনিক শেয়ারবাজার আর কাগজনির্ভর ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
মাসুদ খান বলেছেন, দুই দশকে দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হলেও শেয়ারবাজার সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। এর ফলে অনেক ভালো মানের কোম্পানি বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও সতর্কতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনে কমিশন ধারাবাহিক ও টেকসই সংস্কার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি বলেছেন, কমিশনের লক্ষ্য বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং তথ্যের সমান প্রাপ্য ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। ইনসাইডার ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প এবং ফ্রন্ট রানিংয়ের মতো অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও বাজারের সততা রক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন স্থগিতের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও স্মার্ট ও ঝুঁকিভিত্তিক করার অংশ হিসেবে অপ্রয়োজনীয় রিপোর্টিং, অনুমোদন ও কমপ্লায়েন্সের চাপ কমাতে বিদ্যমান বিধিমালা পুনর্মূল্যায়নের কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার সংস্কার করা হবে।
বাজারে ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় স্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর ও নীতিগত সুবিধা বৃদ্ধি, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে সুশাসন জোরদার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণও সংস্কার কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংস্কার পরিকল্পনার সফলতা বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেছেন, আস্থা কোনো বক্তৃতার মাধ্যমে তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে ন্যায়পরায়ণতা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিক নীতিমালা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে। সেই বিশ্বাস পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই নতুন কমিশনের যাত্রা শুরু হয়েছে।
গতকাল সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং কমিশনের চার সদস্য। পরে সরকার নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানকে নিয়োগ দেয়। একই সঙ্গে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের এমডি মো. নাফিজ আল তারিক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাহিদ মাহতাব এবং আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান।




