ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় শেয়ারবাজার সংস্কার

দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট, বাজার কারসাজি, দুর্বল সুশাসন, আর্থিক প্রতিবেদনে অসংগতি এবং কোম্পানিগুলোর জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। এসব সংকট দূর করে বাজারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে বেশ কিছু আইনি সংস্কার এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তবে ভুল ব্যাখ্যা, আর্থিক শিক্ষার অভাব, সচেতনতার অভাব ও গুজবে প্রভাবিত হওয়ার ফলে সংস্কারগুলোর সুফল ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারের জটিল আর্থিক পরিভাষা ও নিয়মকানুন বোঝার পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। সঠিক ধারণা না থাকার কারণে বিনিয়োগকারীরা বিধিবিধানগুলোকে ভুল বুঝছেন এবং বিভিন্ন মহলের ভুল ব্যাখ্যায় প্রভাবিত হচ্ছেন। এ ছাড়া যাচাই-বাছাই না করে গুজবে কান দিয়ে উৎপাদনহীন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করছেন। ফলে, সুশাসন ও পুঁজি রক্ষার কঠোর পদক্ষেপগুলো সচেতনতার অভাবে ভেস্তে যেতে পারে।
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার মেয়াদ ২১ মাসের বেশি। এ সময়ের মধ্যে বিএসইসি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিধিমালা সংশোধন, আধুনিকায়ন ও নতুন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। শেয়ারবাজারকে একটি শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ। তবে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে আইনি বিধিবিধানগুলোকে ভুল ব্যাখ্যায় বিনিয়োগকারীরা প্রভাবিত হচ্ছেন। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আর্থিক পরিভাষা বোঝার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা, সচেতনতার অভাব এবং গুজবে কান দেওয়ায়— বিধিবিধান সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে।
শেয়ারবাজার টাস্কফোর্সের সদস্য অধ্যাপক আল-আমিন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক সংস্কারগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে ভুল ব্যাখ্যা, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষার অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে এই সংস্কারগুলোর প্রকৃত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই জেনে-বুঝে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত।
কমিশন বলছে, এ কাজটির উদ্দেশ্যে শুধু বিধিবিধান সংস্কার করা নয়; বরং শেয়ারবাজারকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় রূপ দেওয়া। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত হবে এবং কারসাজি ও অনিয়মের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হবে।
জানা গেছে, শেয়ারবাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিএসইসি ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খসড়া বিধিমালা জনমত ও অংশীজনদের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে করপোরেট গভর্নেন্স বিধিমালা-২০২৬ সবচেয়ে বেশি আলোচিত, যা স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ, বোর্ডের কার্যকারিতা, নিরীক্ষা কমিটির জবাবদিহি এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্ব দেবে। অডিট গাইডলাইন-২০২৬ আর্থিক প্রতিবেদনের মানোন্নয়ন, নিরীক্ষকদের জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং আর্থিক তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। করপোরেট পুনর্গঠন বিধিমালা-২০২৬ সংকটাপন্ন কোম্পানিগুলোর একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবনের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
এদিকে মার্জিন রুলস, ২০২৫; মিউচুয়াল ফান্ড রুলস, ২০২৫; পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫; কমোডিটি ডেরিভিটিভ রেগুলেশন, ২০২৫; সেটেলমেন্ট অব ডিসপিউট রেগুলেশন, ২০২৬ এবং ডেবট সিকিউরিটিজ রুলসের সংশোধনী চূড়ান্ত করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি তথ্য প্রকাশ ও হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা রুলস, ২০২৬ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ২০২৫ এবং ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড (সিএমএসএফ) আইন, ২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার বিধিমালা এবং স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি বিধিমালার সংস্কার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, কমিশন শেয়ারবাজারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, বাজারের স্বচ্ছতা, করপোরেট সুশাসন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বিএসইসির মূল লক্ষ্য। আশা করা যায়, এসব সংস্কার কার্যক্রম শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে হবে।






