অনিয়মই নিয়ম কপারটেকের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০১৯ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা উত্তোলনের পর থেকেই কোম্পানিটির ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স ধারাবাহিক অবনতির পথে। আয়, মুনাফা ও লভ্যাংশ কমার পাশাপাশি ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি; উল্টো তাদের ঋণের বোঝা হয়েছে আরও ভারী।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ব্যক্তি নাফিজ সরাফতের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আইপিওর অনুমোদন নেয় কপারটেক। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) অনুমোদন দিলেও, আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়মের অভিযোগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রথমে তালিকাভুক্তি আটকে দেয়। বিষয়টি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) হয়ে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) তদন্ত পর্যন্ত গড়ায়। তদন্তে অসহযোগিতার কারণে কপারটেকের তৎকালীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আহমেদ অ্যান্ড আক্তার লাইসেন্স হারায়। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপে কোম্পানিটিকে লেনদেনের সুযোগ দিতে বাধ্য হয় ডিএসই।
সম্প্রতি বিএসইসি কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও-পূর্ব তিন বা ততোধিক বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব নতুন করে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত আইপিওতে আসার আগের চার বছরে কোম্পানিটির বিক্রি ও মুনাফায় অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখানো হয়েছিল। এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আগামীর সময়কে বলেছেন, কোম্পানিটির আইপিও দেওয়া নিয়ে ওই সময় বিতর্ক তৈরি হয়। অযোগ্যতার কারণে ডিএসই কোম্পানিটিকে লিস্টিং না করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী সরকারের ক্ষমতাধর নাফিজ সরাফাতের কারণে তা আটকাতে ব্যর্থ হয়।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে যেখানে তাদের পণ্য বিক্রি ছিল মাত্র ৪১ লাখ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ কোটি ৬৭ লাখ টাকায়। অথচ বাজারে আসার পরই চিত্র পাল্টে যায়। আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী উত্তোলিত ২০ কোটি টাকার মধ্যে সাড়ে ৬ কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। ২০১৮ সালের জুনে কোম্পানিটির মোট ঋণ ছিল ৬১ কোটি ৭ লাখ টাকা, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উল্টো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ২২ লাখ টাকায়। ফলে তাদের সুদজনিত ব্যয় ৬ কোটি ৫ লাখ থেকে বেড়ে ১১ কোটি ২২ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
ঋণের পাশাপাশি কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয়েও (ইপিএস) ধস নেমেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ দশমিক ৬০ টাকা ইপিএস থাকলেও, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে মাত্র শূন্য দশমিক ৭১ টাকায় নেমে এসেছে। এর প্রভাবে ২০২৫ সালে লভ্যাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ১৫ শতাংশে।
আর্থিক এসব অবনতির পাশাপাশি কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনেরও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা এখনো কোনো গ্র্যাচুইটি ফান্ড বা প্রভিডেন্ট ফান্ড স্কিম চালু করেনি এবং এনবিআরের প্রয়োজনীয় অনুমোদনও নেয়নি। নিরীক্ষকদের মতে, এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার কারণে কোম্পানিটিকে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের জরিমানা ও শ্রমিক অসন্তোষের মুখে পড়তে হতে পারে।
এসব গুরুতর অভিযোগ ও অনিয়মের বিষয়ে কোম্পানিটির সচিব এস কে মিরাজ আলী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে এই কোম্পানিটিরই শেয়ারবাজারে আসার আগের চতুর্থ অর্থবছরে টানা পণ্য বিক্রি ও মুনাফা বেড়েছিল। দেখা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ৪১ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছিল ৫২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর ওপর ভিত্তি করে শেয়ারপ্রতি ১ দশমিক ৩১ বা ৩৩ লাখ টাকার লোকসান কাটিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ২ দশমিক ৬০ টাকা করে ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল। ওইসময় চার বছরের ব্যবধানে ইপিএস বেড়েছিল ৩ দশমিক ৯১ টাকা বা ২৯৮ শতাংশ।




