ফেঁসে যাচ্ছে দুই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি লাভেলো আইসক্রিমের বিগত পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষায় অসংগতি এবং গরমিল পরিলক্ষিত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দেশের স্বনামধন্য দুটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সংশ্লিষ্ট পার্টনাররা এ ধরনের আর্থিক অনিয়মে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের শাস্তিমূলক বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা জরুরি ভিত্তিতে জানতে চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
সম্প্রতি দেশের দুই প্রধান নিয়ন্ত্রক ও পেশাজীবী সংস্থার কাছে এ বিষয়ে বিএসইসি আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নিরীক্ষা কার্যক্রমে এমন অসাধু উপায় অবলম্বন এবং নয়ছয়ের বিষয়টি এরই মধ্যে জানানো হয়েছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এবং দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশকে (আইসিএবি)।
তথ্য অনুযায়ী, লাভেলো আইসক্রিমের ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত ছিল ‘ইসলাম কাজী শফিক অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’ এবং তাদের পার্টনার কাজী শফিকুল ইসলাম। এর পাশাপাশি ‘কাজী জহির খান অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’ এবং তাদের পার্টনার নুরুল হোসেন খানও এ কার্যক্রমে ছিলেন যুক্ত।
অভিযোগ রয়েছে, এই পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক অডিট কার্যক্রমে তারা চরম পেশাগত অসদাচরণের আশ্রয় নিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন অথবা কোম্পানির উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সম্পূর্ণ কৃত্রিম আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করেছেন। বিষয়টি বিএসইসির নজরে এলে তারা এতে অসংগতি ও গরমিল খুঁজে পায়, যার ফলে এই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে কমিশনের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয় এবং তারা এফআরসি ও আইসিএবিকে পুরো বিষয়টি অবহিত করে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, লাভেলো আইসক্রিমের নিরীক্ষকদের বিষয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা এফআরসি ও আইসিএবির কাছে জানতে চেয়েছে কমিশন। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএসইসি তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং তাদের সংবিধিবদ্ধ নিরীক্ষকদের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানের অংশ হিসেবেই এ তথ্যগুলো প্রয়োজন। অভিযুক্ত অডিট ফার্ম এবং তাদের পার্টনারদের নিরীক্ষা কার্যক্রম, পেশাগত মানদণ্ড অনুসরণের ঘাটতি এবং আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি এখন কার্যত নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির আওতায় চলে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক, প্রয়োগমূলক অথবা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকলে তা কমিশনকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সিকিউরিটিজ আইনের অনুবর্তিতা নিশ্চিতকরণ, নিয়ন্ত্রক সমন্বয়, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আইন প্রয়োগের বৃহত্তর স্বার্থেই এ তথ্যগুলো অত্যন্ত জরুরি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গাটি অনেকাংশেই নির্ভর করে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে নিরীক্ষকদের যোগসাজশে কৃত্রিম বা অতিরঞ্জিত মুনাফা প্রদর্শন করে। আর যখন সেই নিরীক্ষা প্রক্রিয়ার মধ্যেই অনিয়ম, গাফিলতি বা পেশাগত ব্যর্থতার গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন স্বভাবতই পুরো শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির বিষয়টি বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তবে এ বিষয়ে জানতে এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।




