ইন্দো-বাংলা ফার্মার আইন লঙ্ঘন তদন্তে প্রমাণিত, কঠোর বিএসইসি

সংগৃহীত ছবি
নানা অনিয়ম এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসহ কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেয়ারবাজারে ওষুধ ও রসায়ন খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) থেকে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে অনুসন্ধান কমিটি। ইতিপূর্বে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত অনুসন্ধানেও উঠে এসেছিল অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ।
বিএসইসি সূত্র জানিয়েছে, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালসের আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অসঙ্গতি তদন্তের জন্য গত বছরের এপ্রিলে গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। ওই কমিটিতে ছিলেন- বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন, সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রুমান হোসেন ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সিনিয়র ম্যানেজার স্নেহাশিষ চক্রবর্তী।
অনুসন্ধান শেষে ইতোমধ্যে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করেছে তদন্ত কমিটি। ওই প্রতিবেদনে ২০২০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সমাপ্ত পাঁচ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, পরিশোধিত মূলধনের অবস্থা, আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সিকিউরিটিজ আইন ও বিধি-বিধানের একাধিক লঙ্ঘন পেয়েছে কমিশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির উদঘাটিত অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এনফোর্সমেন্ট বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।
এদিকে বিএসইসির অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে- বিএসইসির প্রণয়নাধীন ‘প্যানেল অব অডিটরস’-এ তালিকাভুক্তিসংক্রান্ত গাইডলাইনে নতুন কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা। ভবিষ্যতে নিরীক্ষকরা কোনো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার সময় আন্তর্জাতিক হিসাবমান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে কোন বিধান বা অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন হয়েছে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে প্রতিবেদনে।
একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো আইনের ধারা, রুলস বা রেগুলেশন ও নির্দেশনা বা নোটিফিকেশন লঙ্ঘন করে- সেটিও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট বিভাগ থেকে বিষয়টি আইন বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
এছাড়া ভবিষ্যতে তদন্ত বা অনুসন্ধান কার্যক্রমে তথ্য বিনিময় জোরদার করতে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
এদিকে ইন্দো-বাংলা ফার্মার আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে ‘গোয়িং কনসার্ন থ্রেট’ বা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে বিএসইসির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিষয়টি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে কমিশনের ইস্যুয়ার কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও আইপিও তহবিল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বিএসইসির এ পদক্ষেপ।
এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বিএসইসি। তদন্তে বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে কমিশন।
সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের ০.১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ০.৩২ টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ০.৩৫ টাকা। ওই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১২.৫৩ টাকা।
শেয়ার ধারণ পরিস্থিতি
ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০১৮ সালে। কোম্পানিটির শেয়ার বর্তমানে লেনদেন হচ্ছে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে। কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধন ১১৬ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সে হিসাবে এর মোট শেয়ারসংখ্যা ১১ কোটি ৬২ লাখ ৫ হাজার ১৭৮টি। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তাদের হাতে রয়েছে ২৪.৪৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৮.৭৬ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫৬.৮১ শতাংশ শেয়ার। আজ বুধবার কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ১৩.৩০ টাকা।
















