যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ প্রস্তুতিতে ঘাটতি
- অনুদান কমছে বাণিজ্য বাড়ছে নজর বিনিয়োগে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ৪১৭ কোটি ডলারের অনুদান, দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ৭১০ কোটি ডলার, আর বাংলাদেশে মার্কিন পুঞ্জীভূত বিনিয়োগ ছাড়িয়েছে ৪০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ অনুদান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ— তিন ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু এই সম্পর্ক এখন দাঁড়িয়ে আছে এক বড় রূপান্তরের মুখে। একই সময়ে শুল্ক-যুদ্ধের ধাক্কা সামলে নতুন শুল্কে বাণিজ্য কাঠামো তৈরি হলেও অশুল্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনা যাচাইয়ে আসছেন ২৫ শীর্ষস্থানীয় মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৫ প্রতিনিধি। জ্বালানি, অফশোর গ্যাস, ব্যাংকিং-বীমা, প্রযুক্তি, ফিনটেক ও ডিজিটাল খাতে তাদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে পাঁচ দশকের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন নতুন সমীকরণে— অনুদানের অংশীদার থেকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার পথে ঢাকা-ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন বড় বাণিজ্য সম্ভাবনা, অন্যদিকে দেশের ভেতর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তৈরি হয়েছে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ। তৈরি পোশাকের প্রায় ২১ শতাংশের গন্তব্য মার্কিন বাজারে। একই সঙ্গে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিল্প অবকাঠামোতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু সম্ভাবনার বিপরীতে সক্ষমতার ঘাটতিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শুল্ক সুবিধা ও বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে উৎপাদন দক্ষতা, অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, নীতি সহায়তা ও ব্যবসার পরিবেশে দ্রুত উন্নতি আনতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন আগামীর সময়কে বললেন, বিনিয়োগের জন্য অনেক বছর ধরেই চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে এলে কোথায় করা হবে, তার একটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জ্বালানি অবকাঠামো খাতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে— যোগ করেন তিনি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় কোম্পানি রয়েছে, যারা বাংলাদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসহ জ্বালানি খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারী শুধু এলেই হবে না উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বললেন, বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ লাভজনক হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
সূত্রমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১১৮০ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৯৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানি ৮২০ কোটি ডলার। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ২৩০ কোটি ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১০ কোটি ডলারের। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে মার্কিন পোশাক বাজারে কিছুটা চাপ দেখা দিয়েছে। জানুয়ারি-জুন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি ৮.০৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমে ৪০১ কোটি ডলারে নেমেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৭৫ শতাংশ কম।
তারপরও প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান পুরোপুরি খারাপ নয়। আমদানি কমলেও চীনকে পেছনে ফেলে মার্কিন পোশাক বাজারে বাংলাদেশ এখন এককভাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি এই অবস্থানকে শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু পোশাক রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের দিকে নিতে হবে।
এদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত বাণিজ্য চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। চুক্তিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারকদের জন্য স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গত ২৩ জুলাই ‘জোরপূর্বক শ্রম’ ইস্যু সামনে এনে সেকশন-৩০১-এর আওতায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে ওয়াশিংটন। তবে মূল শুল্কের সঙ্গে নতুন এই শুল্ক যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের ওপর কার্যকর শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।
তবে বাণিজ্য চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা বা ফাইবার আমদানি করে বাংলাদেশে পোশাক উৎপাদন করলে শূন্য বা বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ। মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহারকারী কারখানাগুলোর জন্য এটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আগামীর সময়কে বলেছেন, বিদেশি ক্রেতারা কম খরচে এবং দ্রুত পণ্য তাদের শেলফে পৌঁছাতে চান। যে দেশ যত সহজে এ কাজটি করতে পারবে, সে দেশই রপ্তানি বাণিজ্যে এগিয়ে যাবে।
তিনি বললেন, বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধা পেলেও সক্ষমতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। তাই উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা ও প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা বাড়ানোর দিকে এখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।




