পান-শুঁটকিতে মিলল মারাত্মক কীটনাশক, খেলে হতে পারে ক্যানসার

সংগৃহীত ছবি
দেশে তদারকি সংস্থার প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতায় অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি ‘হাইলি হ্যাজার্ডাস পেস্টিসাইড’ বা অতি বিপজ্জনক বালাইনাশক। নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের সবজির প্রায় ১০ শতাংশ এবং ফলের ৪ শতাংশ নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক বিষের অবশিষ্টাংশ রয়ে গেছে। এমনকি পান এবং শুঁটকির নমুনায়ও ধরা পড়েছে মারাত্মক কীটনাশক।
বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি বা পিটাকের ৯০তম বিশেষ সভায় দেশের কৃষি খাতের এই উদ্বেগজনক চিত্রটি সামনে এসেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত ১৭টি মূল রাসায়নিক উপাদান বা মলিকিউল বাংলাদেশে এখনো সম্পূর্ণ বৈধভাবে বিক্রি ও ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, এই ১৭টি ক্ষতিকর উপাদানের অধীনে দেশে ১ হাজার ৭৪১টি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ড নিবন্ধিত রয়েছে এবং সাধারণ কৃষকরা প্রতিনিয়ত তা মাঠপর্যায়ে জমিতে ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।
এ ধরনের রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে দেশে অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপ অনুযায়ী, দেশের দরিদ্র পরিবারগুলোর মাসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের এক বড় অংশ চলে যাচ্ছে এসব রোগের চিকিৎসায়, যা গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ৪৯৪ টাকা বা তাদের মোট পারিবারিক ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশের সমান। খাবারে বিষক্রিয়া ও বালাইনাশকের অবাধ প্রবেশ প্রতি বছর অসংখ্য মানুষকে ক্যানসার, মারাত্মক কিডনি রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত করছে এবং দেশে আশঙ্কাজনক হারে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কৃষি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ৩২৭টি বালাইনাশক মলিকিউল নিবন্ধিত থাকলেও সরকারি ল্যাবরেটরিতে মাত্র ৭০টি কেমিক্যাল মলিকিউল পরীক্ষা করার সক্ষমতা রয়েছে। ফলে বাকি ২৫৭টি মলিকিউলের কার্যকারিতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিরূপণের আধুনিক সুযোগ ও আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন দেশের ল্যাবগুলোর নেই।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আমদানিকৃত বালাইনাশক দেশে প্রবেশের আগে বন্দরে সেগুলোর গুণগত মান কিংবা তাতে ক্ষতিকারক সিসা, ক্যাডমিয়াম বা আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু রয়েছে কি না, তা যাচাই করার কোনো ল্যাব বাংলাদেশে নেই। এমনকি জব্দকৃত ভেজাল বালাইনাশক ও রাসায়নিক বর্জ্য পরিবেশসম্মত উপায়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করার জন্য কোনো ইনসিনারেশন অবকাঠামো আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।
বিগত পাঁচ বছরের সরকারি ল্যাবরেটরির নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের সবজির প্রায় ১০ শতাংশ এবং ফলের ৪ শতাংশ নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক বিষের অবশিষ্টাংশ রয়ে গেছে। এমনকি পান এবং শুঁটকির নমুনায়ও মারাত্মক কীটনাশক ধরা পড়েছে।
বর্তমান বালাইনাশক আইন কার্যকর থাকলেও কোনো পরিদর্শক মাঠপর্যায়ে নকল বা নিষিদ্ধ কীটনাশক হাতেনাতে জব্দ করলেও অপরাধীকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আর্থিক জরিমানা করতে পারেন না। এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন এবং নিরাপদ খাদ্যের আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা দিতে না পারায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি সম্ভাবনা কৃষি খাত বিশ্ববাজারে বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ড. মুশতাক হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ার বিষয়টি সমাধানে আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে কিছু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষই এই সমন্বয়ের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সংস্থা। তাদের শক্তিশালী করতে হবে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, রাতারাতি পুরো পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে কাজ এখনই শুরু করতে হবে। আমরা যদি এখনই পদক্ষেপ না নিই, তবে সামনে আমাদের জন্য আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।




